বগুড়ায় চোর সন্দেহে শামিম হোসেন (৩৫) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর দোষীদের গ্রেফতারের দাবিতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সামনে সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে বিক্ষোভ প্রকাশ করেন নিহতের স্বজনেরা।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ভোরে সদর উপজেলার নিশিন্দারা ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত শামিম হোসেন বগুড়া সদর উপজেলার নামুজা ইউনিয়নের চৌমুহনী এলাকার আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে। তিনি পেশায় ভাঙারি ব্যবসায়ী ছিলেন।
নিহতের স্বজনদের দাবি, ঘটনায় সময় শামিমের পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহের রগ কাটার বিষয়টি স্পষ্ট নয়, শরীরে একাধিক মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এছাড়া ঘটনাস্থলের পাশে একটি ডিপ টিউবওয়েলের বৈদ্যুতিক তার কাটা অবস্থায় পাওয়া গেছে।
নিহতের পরিবার ও স্বজনদের দাবি, পারিবারিক এক দাফন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শশুর বাড়ি গিয়েছিলেন শামিম। নিহতের স্ত্রী রুমানা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার স্বামীকে যে মারছে, তাদের ফাঁসি চাই আমি। আমার দুই বাচ্চা এতিম হইছে, তাদের বাপ ছাড়া কেউ নাই। যারা আমার স্বামীকে বিনা দোষে মারছে, তাদের আমি মৃত্যুদণ্ড চাই।
নিহতের শ্যালক শামিম জানান, আমার বোন জামাই কোমরের সমস্যার কারণে রাতে চৌকিতে শুতে না পেরে বাড়ির বাইরে হাঁটছিলেন। এ সময় শাফি মেম্বারের লোকজন চোর সন্দেহে ধরে তাকে বেধড়ক মারধর করে ও পায়ের রগ কেটে দেয়। আমরা ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয়দের কাছে নাম জানতে চাইলে ভয়ে কেউ বলছে না, খালি ফোনে ব্যস্ত থাকছে। আমরা সরকারের কাছে এর সুষ্ঠু বিচার চাই।
একই অভিযোগ করেন নিহতের খালা শাশুড়ি বুলবুলি। তিনি বলেন, আমার জামাই মারা যাওয়ায় কাল মাটি দিতে আসছিল শামিম। সকালে আমরা ফজরের নামাজ পড়ব, তার আগেই তাকে মেরে শেষ করে দিছে। শাফি মেম্বারের ছেলেদের সাথে আরও লোকজন মিলে ওকে মারছে। আমার বোনের বাড়িত আগেও দুইবার আগুন লাগায় দিছিল, আজ জামাইকে সুযোগ পেয়ে মেরে ফেলছে।
নিহতের শাশুড়ি ছোবেদা বেগম অভিযোগ করে জানান, রাতে শামিমকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আমরা পায়ে ধরে মিনতি করেছি। শাফি মেম্বার নিজে বসে থেকে ওকে মেরে ফেলছে। পরে ওখান থেকে রক্তঝরা অবস্থায় সিএনজিতে করে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই ওর মৃত্যু হয়।
এদিকে নিহতের পরিবার সরাসরি নিশিন্দারা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য এ বি এম শফিকুর রহমান শফি ও তার ছেলেদের নাম বললেও সরেজমিনে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় কোমর ও হাড় ভেঙে সাবেক এই ইউপি সদস্য গত এক সপ্তাহ ধরে নিজ বাসায় শয্যাশায়ী।
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক ইউপি সদস্য শফিকুর রহমান শফি বলেন, ‘আমি দুর্ঘটনায় মারাত্মক অসুস্থ হয়ে বেডরেস্টে আছি। রাত প্রায় তিনটার দিকে এলাকার ছেলেরা ফোন দিয়ে জানায় ডিপ টিউবওয়েলের তার চুরি করার সময় একজনকে ধরা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি তখন তাদের মারধর না করে পরিষদে নিয়ে যেতে বলি এবং গ্রাম পুলিশ গোবিন্দকে ফোন দিয়ে চোরকে হেফাজতে নিতে বলি। যেহেতু ডিউটিতে একা গ্রাম পুলিশ ছিল, তাই আমার ছেলেদেরও পাঠিয়েছিলাম যেন তাকে নিরাপদে পরিষদে সোপর্দ করা হয়। আমার দুই ছেলে গোবিন্দের হাতে শামিমকে তুলে দিয়ে চলে আসে। রাজনৈতিক আক্রোশ ও গ্রাম্য রাজনীতির কারণে আমাকে বা আমার ছেলেদের এ ঘটনায় ফাসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’
ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের কথা জানিয়ে বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম আলী বলেন, চোর সন্দেহে এক যুবককে পিটিয়ে আহত করার পর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের শরীরে অনেক আঘাতের দাগ থাকলেও সুরতহাল অনুযায়ী রগ কাটার বিষয়টি নিশ্চিত নয়। বর্তমানে নিহতের মরদেহ শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে আছে।
ইব্রাহীম আলী আরও বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের ধরতে গ্রাম পুলিশ ও স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ এবং সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করা হচ্ছে।
কেজে/এএসএম