শেরপুর সদর উপজেলার চরশেরপুর ইউনিয়নের চার থেকে পাঁচটি গ্রামের পানি নিষ্কাশনের অন্যতম পথ ছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে খনন করা একটি খাল। দখল ও ভরাটে সেই খাল এখন অস্তিত্ব সংকটে। ফলে বর্ষার পানি নামতে না পেরে তৈরি হয়েছে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা। এতে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ একর কৃষিজমি পানির নিচে থাকায় এবার ধান চাষ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সদর উপজেলার চরশেরপুরের নাগপাড়া, কান্দাপাড়ার আংশিক, তালুকপাড়া ও চরশেরপুরের কমপক্ষে ৫০০ থেকে ৬০০ একর জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে তিন ফসলি জমি এখন এক ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে। কোনোমতে মৌসুমে একবার ধান উৎপাদন করতে পারলেও অন্য মৌসুমে বিশাল এলাকাজুড়ে পানি আর শেওলা, কচুরিপানায় ভরে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আশি ঊর্ধ্ব মোহাম্মদ ছামেদ আলী মুন্সি বলেন, জিয়াউর রহমান আমাদের সঙ্গে নিয়ে এখানে একটি খাল খনন করেছিলেন। তখন আমাদের মাথায় টুপড়ি (মাটি নেওয়ার ঝুড়ি) তুলে দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান নিজেই। তিনিও টুপড়ি নিয়ে মাটি ফেলেছিলেন। কোদাল হাতে মাটি কেটেছেন। আমাদের বয়সি ও কাছাকাছি বয়সের সবাই সেই খাল খননে কাজ করেছি। কিন্তু খালটি এখন দখল করতে করতে প্রায় ভরাট করে ফেলেছে। তাই সেখান দিয়ে পানি আর যেতে পারে না। ফলে আমাদের এখানে কোমড় পরিমাণ পানি। আমরা এর সমাধান চাই।
স্থানীয় কৃষক শাহজাহান মিয়া বলেন, স্কুল থেকে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমার মুরুব্বিদের সঙ্গে গিয়েছিলাম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে দেখতে। গিয়ে মাটি কেটেছি খালটিতে। জিয়াউর রহমান নিজের হাতে আমার মাথায় টুপড়ি তুলে দিয়েছিলেন। আর খালটি খননের পর হতে আমাদের এ অঞ্চলে পানি আটকে থাকার কোনো সমস্যা ছিল না। ফলে আমরা চার-পাঁচ গ্রামের মানুষ নিশ্চিন্তে ধান আবাদ করেছি। বছরে তিনবারও ধান আবাদ করেছি। কিন্তু গেল ১০-১২ বছর ধরে কয়েকজন প্রভাবশালী মাছ ধরার জন্য প্রথমে বাঁধ দেয়, এরপর হতে আস্তে আস্তে দখলে নিয়ে নেয়। এখন ভরাট হয়ে আর খাল দিয়ে পানি যেতে পারে না। আমরা সরকারের সহযোগিতা চাই।
নাগপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আসমত আলী মাস্টার বলেন, কৃষক বাঁচলে দেশ খাদ্যে ভরপুর হবে। কৃষি স্বনির্ভর এ জেলায় একটি ইউনিয়নেই ৫০০ থেকে ৬০০ একর জমির ধান আবাদ ব্যাহত হচ্ছে এবার। খালটি দ্রুত দখলমুক্ত করতে পারলে, এ মৌসুমেই ধানের চারা রোপণ করা সম্ভব। তা না হলে কয়েকটি গ্রামের কৃষক ব্যপক ক্ষতির মুখে পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দা সিঙ্গাপুর প্রবাসী সেলিম মিয়া বলেন, আমরা পরিবার পরিজন ছেড়ে বিদেশে এসে কাজ করছি দেশের জন্য। রাষ্ট্রের রেমিট্যান্স যোদ্ধা আমরা, কিন্তু আমাদের গ্রামের জমিতে যদি ধান চাষ না করতে পারি তাহলে বিদেশ থেকে টাকা রুজি করে জমি কিনে লাভ কী। আমাদের অনেক কষ্টের টাকা, আমাদের সেই টাকায় কেনা জমিতে জলাবদ্ধতা কিভাবে নিরসন করা যায় তা স্থানীয় প্রশাসনকেই করতে হবে। নতুবা কৃষিবান্ধব এই সরকার আমাদের জলাবদ্ধতায় আটকে রাখবে। আশা করছি, পানি নিষ্কাশনের দ্রুত একটি সমাধান করে এবার ধান রোপণের ব্যবস্থা করে দিবে প্রশাসন।
আরও পড়ুন
দুয়ার খুললো সুন্দরবন: তীরে ঋণের ভার, বনে দস্যুর ভয়
শেরপুর সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ব্রিজের গোড়ায় ও আশেপাশে যেখানে পানি আটকিয়ে গেছে সেখানে আমি গিয়েছিলাম। মাটিতে ভরাট হয়ে উঁচু হয়ে যাওয়ায় খালটি দিয়ে জলাবদ্ধতা জমিগুলোর পানি নামতে পারছে না। এজন্য খালটির কিছু অংশ পুনঃখনন করলে দ্রুত পানি নেমে যাবে।
জেলা কৃষি বিভাগের উপপরিচালক সাখওয়াত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, শেরপুরে এবার ৯৩ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে চরশেরপুর ইউনিয়নের তথ্যটি আমাদের কাছে এসেছে। উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আমরা পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে আবাদের উপযুক্ত করবো।
জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন জাগো নিউজকে বলেন, ইতোমধ্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি) চরশেরপুরের জলাবদ্ধতা জায়গাটি পরিদর্শন করেছে। কৃষি সমৃদ্ধ এ অঞ্চলের জন্য সেখানে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মো. নাঈম ইসলাম/এনএইচআর/এএসএম