জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্টের তথ্যের গরমিলে নানা ধরনের জটিলতায় পড়ছেন হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশি। বিশেষ করে বিদেশে যাওয়ার সময় ভুল বা ভিন্ন তথ্য দিয়ে তৈরি করা পাসপোর্টের কারণে পরবর্তীতে দেশে এসে সরকারি বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে অনেক প্রবাসীকে।
হবিগঞ্জের মশিউর রহমান মুমিন এরই একটি উদাহরণ। তার জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী জন্ম ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে। কিন্তু বিদেশ যাওয়ার সময় এক দালালের মাধ্যমে তার নামে তৈরি করা হয় একটি পাসপোর্ট। সেখানে নাম দেওয়া হয় ‘মশিউর মিয়া’ এবং জন্মসাল উল্লেখ করা হয় ১৯৯৯।
ওই পাসপোর্ট ব্যবহার করেই বিভিন্ন পথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপের দেশ গ্রিসে আসেন মশিউর। পরে গ্রিসে তার রেসিডেন্স পারমিটসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ওই পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী তৈরি হয়। ফলে বিদেশে বসবাসের ক্ষেত্রে তার এনআইডির তথ্যের প্রয়োজন হয়নি।
সম্প্রতি দেশে ফিরে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে গিয়ে নতুন করে সমস্যায় পড়েন তিনি। ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য এনআইডি প্রয়োজন হওয়ায় আবেদন করতে গিয়ে দেখা যায়, তার এনআইডির নাম ও জন্মসালের সঙ্গে বিদেশে ব্যবহৃত পাসপোর্ট এবং অন্যান্য নথির তথ্যের মিল নেই। ফলে তিনি ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে পারেননি।
পরে বিদেশে ব্যবহৃত পাসপোর্ট ও অন্যান্য নথির তথ্য অনুযায়ী এনআইডি সংশোধনের জন্য আবেদন করেন মশিউর। কিন্তু মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে জানান তিনি।
মশিউর রহমান মুমিনের মতো এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন আরও অনেক প্রবাসী।
ভুক্তভোগী মশিউর বলেন, ‘বিদেশ যাওয়ার সময় দালালের মাধ্যমে আমার পাসপোর্টে নাম ও জন্মসালের তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছিল। ওই পাসপোর্ট দিয়েই গ্রিসে রেসিডেন্স পারমিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র করেছি। এখন দেশে এসে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে গিয়েও সমস্যায় পড়েছি। এনআইডি সংশোধনের জন্য আবেদন করেছি, কিন্তু দীর্ঘদিনেও সমাধান হয়নি। আমার মতো যারা এমন সমস্যায় পড়েছেন, তাদের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছি।’
শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্স নয়, দেশে ফিরে ই-পাসপোর্ট নবায়ন করতেও একই ধরনের জটিলতায় পড়ছেন অনেক প্রবাসী। বিদেশে ব্যবহৃত পাসপোর্টে থাকা নাম, জন্মতারিখ বা অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে এনআইডির তথ্য না মেলায় নবায়নের আবেদন আটকে যাচ্ছে।
ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলাম। বিদেশে থাকা অবস্থায় যে পাসপোর্ট ব্যবহার করেছি, সেটির তথ্য অনুযায়ী আমার অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি হয়েছে। দেশে ফিরে পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়ে দেখি এনআইডির তথ্যের সঙ্গে পাসপোর্টের তথ্যের মিল নেই। ফলে নবায়ন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। তাই বিদেশে বৈধভাবে ব্যবহৃত নথিপত্র যাচাই করে এ ধরনের সমস্যার দ্রুত সমাধান করার আহ্বান জানাই। যেহেতু বিদেশে আমাদের ডকুমেন্ট তৈরি হয়েছে তাই ওই তথ্য দিয়েই দেশে এনআইডি সংশোধনের অন্তত একবার সুযোগ দেওয়া দরকার।’
আরও পড়ুন
মালয়েশিয়ায় গাড়ির ধাক্কায় বাংলাদেশি নিহত, চালককে খুঁজছে পুলিশ
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিদেশে যাওয়ার সময় দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে কিংবা নিজেদের অসচেতনতনায় ভুল তথ্য, ভিন্ন নাম কিংবা বয়স দিয়ে পাসপোর্ট তৈরি হওয়ার কারণে পরবর্তীতে এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিদেশের রেসিডেন্স পারমিট, ব্যাংক হিসাব, চাকরির কাগজপত্রসহ বিভিন্ন নথি তৈরি হয়ে যায়। দীর্ঘদিন পর দেশে এসে এনআইডির সঙ্গে এসব তথ্যের গরমিল দেখা দিলে তৈরি হয় জটিলতা।
কমিউনিটি নেতা জাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিদেশে যাওয়ার সময় অনেক প্রবাসী দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের হস্তক্ষেপে ভুল নাম, বয়স কিংবা জন্মতারিখের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে চলে যান। পরবর্তীতে ওই তথ্যের ভিত্তিতে রেসিডেন্স পারমিট, ব্যাংক হিসাব, চাকরির কাগজপত্রসহ বিভিন্ন বৈধ নথি তৈরি হয়ে যায়। দেশে ফিরে এনআইডির তথ্যের সঙ্গে গরমিল দেখা দিলে তারা বড় ধরনের সমস্যায় পড়েন। প্রকৃত পরিচয় ও বিদেশের বৈধ নথিপত্র যাচাই করে প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনের জন্য বিশেষ ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’
প্রবাসীদের ভাষ্য, বিদেশে থাকার সময় এনআইডির প্রয়োজন না হলেও দেশে ফিরে ড্রাইভিং লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব খোলা, জমি ক্রয়-বিক্রয়, কর সংক্রান্ত কাজসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা নিতে এনআইডি প্রয়োজন হয়। তখনই তথ্যের গরমিলের কারণে অনেককে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
প্রবাসীরা বলছেন, বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের বৈধ পাসপোর্ট, রেসিডেন্স পারমিট ও অন্যান্য সরকারি নথিপত্র যাচাই করে বিশেষ ব্যবস্থায় এনআইডির তথ্য সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হলে এ সমস্যার সমাধান হতে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃত পরিচয় যাচাই করে সংশোধনের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ব্যবস্থা চালুরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রবাসীদের মতে, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা প্রবাসীদের জন্য এনআইডি সংশোধন প্রক্রিয়া আরও সহজ, স্বচ্ছ ও দ্রুত করা প্রয়োজন। বিদেশের বৈধ নথিপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এনআইডি সংশোধনের সুযোগ দিতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ চান তারা।
এমআরএম