বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে লিওনেল মেসি একজন ফুটবল কিংবদন্তি। মাঠে তার পায়ের জাদু, অসংখ্য রেকর্ড আর বিশ্বকাপ জয়ের গল্প সবারই জানা। কিন্তু তিন সন্তানের কাছে তিনি সবার আগে একজন বাবা।
সেই বাবার জীবনের উত্থান-পতন, আনন্দ-বেদনা, ব্যর্থতা আর সাফল্য খুব কাছ থেকে দেখেই বড় হয়েছে মেসির সন্তানরা। স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জোর আবেগঘন কথায় উঠে এসেছে সেই সম্পর্কেরই এক অন্য ছবি।
মেসিকে নিয়ে আন্তোনেলা লিখেছেন, এত বছরের পথচলায় তিনি তাকে কষ্ট পেতে, পড়ে যেতে এবং আবার উঠে দাঁড়াতে দেখেছেন। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলেও মেসি চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। নিজের স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস হারাননি।
আর সবচেয়ে আবেগের বিষয় হলো, তাদের সন্তানরাও বাবার এই পুরো যাত্রা কাছ থেকে দেখেছে। এখানেই মেসির গল্পটি শুধু ফুটবলের গল্প না থেকে হয়ে ওঠে পরিবার ও জীবনের গল্প।
বিশ্বের কাছে মেসি যত বড় তারকাই হোন না কেন, সন্তানদের কাছে তার পরিচয় অন্যরকম। বাবাকে তারা দেখেছে ঘরের মানুষ হিসেবে, আবার দেখেছে নিজের স্বপ্নের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে।
আন্তোনেলার কথায়, হয়তো একদিন তাদের সন্তানরা বুঝবে, বাবার গল্পটি কতটা বড়। কিন্তু এখন তারা শুধু তাদের বাবাকে নিয়ে গর্বিত। এই কথাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে সন্তান ও বাবার সম্পর্কের গভীরতা। একটি শিশুর কাছে বাবার ট্রফি বা খ্যাতির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তার ব্যক্তিত্ব, আচরণ ও জীবনযাপন।
মেসির ক্যারিয়ারে সাফল্যের পাশাপাশি ছিল কঠিন সময়ও। সবকিছু সবসময় নিজের মতো করে পাননি তিনি। কিন্তু ব্যর্থতা বা হতাশা তাকে থামিয়ে দেয়নি। সন্তানদের সামনে এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তৈরি করতে পারে-জীবনে সবসময় সাফল্য আসবে না। কখনো পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে, কখনো নিজের চেষ্টার ফল পাওয়া যাবে না।
কিন্তু তাই বলে থেমে যাওয়া যাবে না। পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর মানসিকতাই মানুষকে সামনে এগিয়ে নেয়।
মেসির জীবনের আরেকটি বড় শিক্ষা হলো স্বপ্নকে শুধু কল্পনায় রেখে দিলে হয় না। তার জন্য নিয়মিত পরিশ্রম করতে হয়। বিশ্বকাপ জয় তার ক্যারিয়ারের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত অর্জন। কিন্তু সেই ট্রফির পেছনে ছিল বহু বছরের অনুশীলন, ম্যাচ, চাপ, সমালোচনা এবং অপেক্ষা।
সন্তানরা বাবার এই যাত্রা সামনে থেকে দেখে বুঝতে পারে, বড় কোনো অর্জনের পেছনে এক দিনের পরিশ্রম থাকে না। সময়, ধৈর্য ও ধারাবাহিক চেষ্টা প্রয়োজন।
অভিভাবকেরা অনেক সময় সন্তানের সামনে নিজেদের দুর্বলতা বা ব্যর্থতা প্রকাশ করতে চান না। কিন্তু মেসির গল্প দেখায়, ব্যর্থতার গল্পও সন্তানের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। শিশু যদি দেখে তার বাবা ভুল করছে, কষ্ট পাচ্ছে, আবার চেষ্টা করছে এবং শেষ পর্যন্ত সফল হচ্ছে, তাহলে তার মধ্যেও ব্যর্থতার ভয় কিছুটা কমতে পারে।
মেসির দীর্ঘ যাত্রায় পরিবারের উপস্থিতিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আন্তোনেলার বার্তায় সেই পারিবারিক বন্ধনের বিষয়টি স্পষ্ট। মেসির স্বপ্নপূরণের মুহূর্তে তার সন্তানরাও পাশে ছিল।
জীবনের কঠিন সময়ে পরিবারের সমর্থন একজন মানুষকে মানসিকভাবে শক্তি দিতে পারে। সন্তানদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। তাদের শুধু সাফল্যের সময় পাশে থাকা নয়, ব্যর্থতার সময়ও সাহস দেওয়া প্রয়োজন।
একজন বাবা সন্তানকে যতই বলুন, ‘পরিশ্রম করো’, ‘হাল ছেড়ো না’-সন্তান বাস্তবে সেটি দেখলে শিক্ষাটা আরও গভীর হয়।
মেসির সন্তানরা বাবার জীবনে সেই উদাহরণই দেখেছে। তাকে চেষ্টা করতে দেখেছে, কঠিন সময় পার করতে দেখেছে এবং শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন পূরণ করতেও দেখেছে। অর্থাৎ সন্তানের জন্য একজন অভিভাবকের নিজের জীবনযাপনই হতে পারে সবচেয়ে বড় শিক্ষার মাধ্যম।
মেসির হাতে বিশ্বকাপ ওঠার দৃশ্য কোটি মানুষ দেখেছে। কিন্তু একজন বাবার স্বপ্নপূরণের সেই মুহূর্ত তার সন্তানদের কাছে ছিল আরও ব্যক্তিগত।
তারা দেখেছে, যাকে প্রতিদিন বাবা হিসেবে চেনে, তিনিই কীভাবে নিজের স্বপ্নের জন্য বছরের পর বছর লড়াই করেছেন। তাই বিশ্বকাপ তাদের কাছে শুধু একটি ট্রফি নয়; এটি বাবার অধ্যবসায় ও স্বপ্নপূরণের প্রতীক।
আন্তোনেলার কথাগুলো তাই শুধু স্বামীকে নিয়ে আবেগ প্রকাশ নয়। এর মধ্যে রয়েছে সন্তানদের সামনে একজন অভিভাবকের জীবন থেকে শেখার মতো একটি বড় বার্তাও।
জীবনে যত বড় স্বপ্নই থাকুক, পথে বাধা আসবেই। কখনো পড়ে যেতে হবে, কখনো অপেক্ষা করতে হবে, কখনো ব্যর্থতাও আসবে। কিন্তু চেষ্টা থামিয়ে দেওয়া যাবে না।
মেসির সন্তানরা হয়তো আজ বাবাকে নিয়ে শুধু গর্বিত। সময়ের সঙ্গে তারা যখন বাবার পুরো পথচলা আরও গভীরভাবে বুঝবে, তখন হয়তো উপলব্ধি করবে।
সূত্র: ওলা, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও অন্যান্য
এসএকেওয়াই