হুমকি ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির মুখে থাকা সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সময়মতো সহায়তা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় ‘বাংলাদেশে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের জন্য রেফারেল ব্যবস্থা’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে এ দাবি জানানো হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নেতৃত্বে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) বাস্তবায়িত ‘স্বাধীনতা: ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন ফর ডিজিটাল ডেমোক্রেসি (ফ্রিডম)’ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত গবেষণার ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত না করে একটি প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এ জন্য সরকার, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে আরও শক্তিশালী সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত পৃথিবীকে বদলে দিচ্ছে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে তরুণদের দায়িত্বশীলভাবে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ইতিবাচক পরিবর্তনে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে তাদের সক্ষম করে তুলতে হবে।
গবেষণায় দেখা যায়, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের জন্য আইনি ও মনোসামাজিক সহায়তা, জরুরি সাড়া এবং ডিজিটাল নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সেবা দেশে রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করায় এসব সেবার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষায়িত সেবায় প্রবেশাধিকারও সারাদেশে সমান নয়, বিশেষ করে জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত এলাকায় এ ঘাটতি বেশি।
দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগে পরিচালিত গবেষণায় আইনি ও বিচারিক হয়রানি, ডিজিটাল হুমকি ও অনলাইন সহিংসতা, শারীরিক ভয়ভীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মনোসামাজিক চাপকে পরস্পর-সম্পর্কিত ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষণায় সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের সহায়তায় তিনটি সম্ভাব্য মডেল প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো হলো- কেন্দ্রীয় জাতীয় রেফারেল হাব, বিকেন্দ্রীভূত কমিউনিটিভিত্তিক নেটওয়ার্ক এবং জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ে বহুপক্ষীয় সমন্বয় ব্যবস্থা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেপুটি হেড অব ডেলিগেশন এবং পলিটিক্যাল, ইকোনমিক, ট্রেড, প্রেস অ্যান্ড ইনফরমেশন সেকশনের প্রধান বাইবা জারিনা বলেন, কোনো সাংবাদিক বা মানবাধিকারকর্মী হুমকির মুখে পড়লে সহায়তার জন্য কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, তা নিয়ে যেন তাদের দ্বিধায় থাকতে না হয়। কে, কোথায় এবং কী ধরনের সহায়তা দিতে পারবেন- সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদার এবং একটি কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এ আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে প্রয়োজনের সময় দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগ বাড়ালেও অপতথ্য, ঘৃণা, অনলাইন হয়রানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে গণমাধ্যম সাক্ষরতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, ডিজিটাল ডেমোক্রেসি শুধু মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মানুষ প্রযুক্তি কতটা নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে পারছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, শুধু প্ল্যাটফর্ম, নীতিমালা বা কর্মপরিকল্পনা থাকলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। অভিযোগের ক্ষেত্রে সময়োপযোগী আইনি ব্যবস্থা এবং দ্রুত সাড়া নিশ্চিত করতে হবে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, আইন ও নীতিমালা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। অপতথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার ও ডিজিটাল হয়রানি বাড়ছে। তাই নাগরিকদের সচেতন করার পাশাপাশি তরুণদেরও এ পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
এসইউজে/এমএএইচ/