আজ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর একটি ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এদিন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠা ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম নয়; বরং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, জনগণের অংশগ্রহণ এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক রূপায়ণ।
প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পরও বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জনগণের আস্থা ও সমর্থন ধরে রেখেছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ঐতিহাসিক বিজয় দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংগঠনিক শক্তি এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। সাধারণ ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৯টি আসনে বিজয় এবং সংরক্ষিত নারী আসনসহ সংসদে ২৪৫ সদস্যের প্রতিনিধিত্ব বিএনপিকে পুনরায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়ে এসেছে। এটি শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়; বরং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ধারার প্রতি জনগণের নতুন করে আস্থার বহিঃপ্রকাশ।
বিএনপির প্রতিষ্ঠার তাৎপর্য বুঝতে হলে বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতির ঐতিহাসিক বিকাশের দিকে ফিরে তাকাতে হয়। বাংলাদেশ একটি বহুত্ববাদী ও বৈচিত্র্যময় সমাজ। ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি, অঞ্চল, শ্রেণি ও পেশাগত পরিচয়ের বৈচিত্র্যের মধ্যেও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয় ও স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতি গভীর আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। এই বাস্তবতাকে ধারণ করেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শনকে সুসংগঠিত রূপ দেন।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শন বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অনুসারীদের কাছে আজও প্রেরণার উৎস। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অতীতের গৌরবকে ধারণ করে ভবিষ্যতের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের অঙ্গীকারই হোক আমাদের প্রধান প্রত্যয়।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কোনো বিভাজনের দর্শন নয়; বরং বাংলাদেশের ভূখণ্ড, ইতিহাস, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং এ দেশের জনগণের সম্মিলিত পরিচয়কে কেন্দ্র করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার একটি রাজনৈতিক ধারণা। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ-পেশা-মতাদর্শ নির্বিশেষে সকল নাগরিক রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম শক্তি এখানেই।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর জাতি এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়। সেই সংকটময় সময়ে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন এবং মুক্তিকামী জনগণকে সশস্ত্র প্রতিরোধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। স্বাধীনতার ঘোষণার সেই সাহসী কণ্ঠ মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে মানুষের মধ্যে সাহস ও প্রতিরোধের চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল।
পরবর্তীতে তিনি জেড ফোর্সের নেতৃত্ব দেন এবং মুক্তিযুদ্ধে একজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমান্ডার হিসেবে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সামরিক নেতৃত্ব, সাহস, দেশপ্রেম ও দায়িত্বশীলতা তাঁকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম স্মরণীয় সামরিক নেতায় পরিণত করে। পরবর্তী জীবনে তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভিত্তি গড়ে ওঠে এই মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি তাঁর গভীর অঙ্গীকারের ওপর।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। অর্থনৈতিক দুরবস্থা, খাদ্যসংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে কঠিন করে তোলে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় একাধিক পরিবর্তন ঘটে। এই অস্থির সময়ের ধারাবাহিকতায় জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর বাস্তবমুখী উন্নয়ন চিন্তা। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য উৎপাদন বাড়াতে হবে, কৃষিকে শক্তিশালী করতে হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে এবং দেশের সাধারণ মানুষকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করতে হবে।
১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল তাঁর এই উন্নয়ন দর্শনের একটি সুস্পষ্ট প্রকাশ। কৃষি উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, কর্মসংস্থান, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, গ্রামীণ উন্নয়ন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জনগণের অংশগ্রহণ—এসব বিষয়কে তিনি রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।
বিশেষ করে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের ওপর তাঁর গুরুত্বারোপ ছিল বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। খাল খনন, সেচ সম্প্রসারণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার উদ্যোগ সে সময় ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা সৃষ্টি করেছিল। উন্নয়নকে রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে গ্রাম ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই চিন্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও তিনি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর সময়েই বাংলাদেশের বেসরকারি খাত ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির বিকাশের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ দেখা যায়। তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ও এই সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। পরবর্তী সময়ে এই শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
একইভাবে প্রবাসী কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হওয়ার পেছনে দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন কাজ করেছে। তবে এসব ক্ষেত্রে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়কার বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক চিন্তা ও বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করার নীতি পরবর্তী অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিল—এ কথা বলার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে।
১৯ দফা কর্মসূচির মূল দর্শন ছিল জনগণকে উন্নয়নের অংশীদার করা। কৃষক, শ্রমিক, যুবসমাজ, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষকে উৎপাদন ও উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার যে চিন্তা তিনি সামনে এনেছিলেন, তা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ছিল। তাঁর কাছে রাষ্ট্রের উন্নয়ন মানে ছিল জনগণের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মানুষের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করা।
এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনকে সাংগঠনিক ভিত্তি দেওয়ার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ছিল ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠা। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক উদ্যোগ ও জাতীয়তাবাদী শক্তির সমন্বয়ের ধারাবাহিকতায় বিএনপি আত্মপ্রকাশ করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক মত, সামাজিক শ্রেণি ও পেশার মানুষকে একটি বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে বিএনপির প্রতিষ্ঠা ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি শুরু থেকেই জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নকে গুরুত্ব দেয়। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়।
বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকটি আজ গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ধান বাংলাদেশের কৃষি, গ্রামীণ জীবন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। বিএনপি ধানের শীষকে কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে জনগণের কাছে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই প্রতীক দলটির গণমুখী রাজনৈতিক পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করেছে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একদলীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠার ফলে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ সংকুচিত হয়েছিল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের সুযোগ সম্প্রসারিত হয় এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র পুনরায় উন্মুক্ত হয়।
এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভিন্নমত, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও জনগণের ভোটাধিকার রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রাণবন্ত করে। বিএনপির প্রতিষ্ঠা এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন গতিশীলতা সৃষ্টি করে।
১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। জনগণের বিপুল সমর্থনে অর্জিত এই বিজয় প্রমাণ করে যে বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন অল্প সময়ের মধ্যেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। এরপর থেকেই বিএনপি বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে রাখা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষার চেষ্টা তাঁর পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্য ছিল।
তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে তার জনগণের স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার ভিত্তিতে পরিচালিত। প্রতিবেশীসহ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই নীতি আজও বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো দলটির জাতীয়তাবাদী অবস্থান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় মর্যাদা ও স্বার্থের প্রশ্নে বিএনপি বরাবরই দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান দলটির রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা কেবল বিএনপি প্রতিষ্ঠার কারণে সৃষ্টি হয়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সামরিক ভূমিকা, স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার, জেড ফোর্সের নেতৃত্ব, রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর কর্মমুখী দৃষ্টিভঙ্গি, ১৯ দফা কর্মসূচি, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন, উৎপাদন ও স্বনির্ভরতার ওপর গুরুত্ব, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি—সবকিছু মিলিয়েই তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে।
তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সংকটের সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা। তিনি শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব ক্ষেত্রে অর্থনীতি, কৃষি, প্রশাসন ও জনগণের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর কর্মমুখী রাজনৈতিক দর্শন তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শহীদ হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিএনপি পরবর্তী ৪৮ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করেছে।
বিএনপি বিভিন্ন সময়ে সরকার পরিচালনা করেছে, বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করেছে এবং দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়ে দলটি সরকার গঠন করে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও বিএনপি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখে। বিশেষ করে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয় দলটির রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় প্রমাণ।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় বিএনপি নানা প্রতিকূলতা, রাজনৈতিক চাপ, আন্দোলন, নির্বাচন এবং সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও দলটি টিকে থেকেছে। একটি রাজনৈতিক দলের চার দশকের বেশি সময় ধরে জনগণের মধ্যে সাংগঠনিক উপস্থিতি ধরে রাখা তার রাজনৈতিক ভিত্তি ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্কেরই প্রমাণ বহন করে।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বড় বিজয় দলটির ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সাধারণ আসনে ২০৯টি আসনে বিজয় এবং সংরক্ষিত নারী আসনসহ সংসদে ২৪৫ সদস্যের প্রতিনিধিত্ব বিএনপিকে পুনরায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।
এই বিজয়কে শুধু একটি নির্বাচনী ফলাফল হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য পুরোপুরি উপলব্ধি করা যাবে না। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর জনগণের ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ফিরে পাওয়া বিএনপির জন্য একটি ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন। একই সঙ্গে এটি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি জনগণের আস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ।
তবে এই বিজয়ের সঙ্গে বিএনপির দায়িত্বও বেড়েছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া—এসব ক্ষেত্রে বিএনপিকে কার্যকর নেতৃত্ব দিতে হবে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধারণ করার প্রকৃত অর্থ শুধু তাঁর নাম ও স্মৃতি স্মরণ করা নয়; বরং তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল বিষয়গুলোকে সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা। জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, স্বনির্ভরতা, জনগণের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি—এসব নীতিকে আধুনিক বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে সামনে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে তাঁর প্রতি সর্বোত্তম শ্রদ্ধা।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতীতের রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত করা। তরুণদের কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, সামাজিক ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি—এসব ক্ষেত্রে কার্যকর কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই বিএনপি তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক শক্তিকে আরও সুসংহত করতে পারে।
বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস মূলত সংগ্রাম, প্রতিকূলতা, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার ইতিহাস। এই দীর্ঘ সময়ে দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একাধিকবার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিয়েছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে।
আজ বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করা মানে শুধু অতীতের একজন রাষ্ট্রনায়ককে স্মরণ করা নয়; বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় মর্যাদা, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের জন্য তাঁর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক দর্শনকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা।
ইতিহাসের বিচারে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি সংকটময় সময়ে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তায় একটি স্বতন্ত্র ধারার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিএনপি আজ ৪৮ বছর অতিক্রম করে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ফিরে এসেছে।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর যে রাজনৈতিক সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে একটি শক্তিশালী জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কীর্তি তাই শুধু বিএনপি প্রতিষ্ঠা নয়; বরং বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে একটি সুসংগঠিত, জনভিত্তিক ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ধারায় রূপ দেওয়া।
আজকের দিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী, সমৃদ্ধ, স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় গ্রহণ করা।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শন বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অনুসারীদের কাছে আজও প্রেরণার উৎস। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অতীতের গৌরবকে ধারণ করে ভবিষ্যতের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের অঙ্গীকারই হোক আমাদের প্রধান প্রত্যয়।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, জিয়া পরিষদ, রাবি, উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
এইচআর/এএসএম