সাতক্ষীরার ২৫০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ ভবনে চলছে পাঠদান। কোনো বিদ্যালয়ে পুরোনো ভবনের ছাদ ও দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে, কোথাও পর্যাপ্ত পাকা ভবন না থাকায় টিন, গোলপাতা কিংবা আধাপাকা ঘরে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হচ্ছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই এসব বিদ্যালয়গুলোর অনেক শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম।
জেলার আশাশুনি উপজেলার কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। কোনো বিদ্যালয়ের ভবনের বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে, আবার কোথাও শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে বিকল্প ব্যবস্থায় পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। বৃষ্টির পানি শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পড়ায় স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগও বাড়ে।
নবীননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুকুল রানী সরকার জানান, বিদ্যালয়টিতে পাকা ভবন না থাকায় আধাপাকা গোলপাতার ছাউনির নিচে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে হচ্ছে। অল্প বৃষ্টিতেই শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে পাঠদান চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে প্রতিকূল পরিবেশের কারণে শিশুদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত ধরে রাখাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষকদের মতে, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করা এবং নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সুন্দর ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও উপস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে বৃষ্টির সময় শ্রেণিকক্ষে পানি পড়া, গরমের দিনে টিনের ঘর অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় একাধিক শ্রেণির পাঠদান পরিচালনায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে।
আরও পড়ুন
বিতর্কিত রেজুলেশন বাতিল / ম্যানেজিং কমিটি নয়, এনটিআরসিএর মাধ্যমেই হবে শিক্ষক নিয়োগ
বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত সংকট দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকেরাও। তাদের ভাষ্য, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বয়সে ছোট হওয়ায় তাদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে দীর্ঘদিন পাঠদান চলতে থাকলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থেকে যায়।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু শিক্ষক নিয়োগ কিংবা বিনামূল্যে পাঠ্যবই সরবরাহই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরাপদ বিদ্যালয় ভবন, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন এবং শিশুদের উপযোগী শিক্ষার পরিবেশ।
তাদের মতে, জেলার সমস্যাগ্রস্ত ২৫০টি বিদ্যালয়ে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ বা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সংস্কার করা গেলে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও উন্নত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হবে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা জেলায় মোট ১ হাজার ৯৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে জেলার সাতটি উপজেলার জরাজীর্ণ ভবনবিশিষ্ট ২৫০টি বিদ্যালয়ের তালিকা ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখায় পাঠানো হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. রুহুল আমীন বলেন, বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার নির্দেশনা অনুযায়ী জেলার সাত উপজেলার জরাজীর্ণ ভবনবিশিষ্ট ২৫০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তালিকা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পিইডিপি-৫ প্রকল্পের আওতায় এসব বিদ্যালয়ের ভবন পুনর্নির্মাণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। নতুন ভবন নির্মাণ করা গেলে বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দমুখর পরিবেশে পাঠদান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
আহসানুর রহমান রাজীব/এনএইচআর/জেআইএম