নাজমুল হুসাইন
একটি অনলাইন ক্লাস। পর্দায় ভেসে উঠছে শিক্ষকের লেকচার, পাশে দেওয়া হয়েছে একটি পিডিএফ, আর ভিডিওতে চলছে গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনা। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য এটি স্বাভাবিক একটি শিক্ষার অভিজ্ঞতা। কিন্তু একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী যদি স্ক্রিন-রিডারে সেই পিডিএফটি পড়তে না পারেন? শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী যদি ভিডিওটির ক্যাপশন না পান? কিংবা ডিসলেক্সিয়া বা ডিসগ্রাফিয়ায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীর কাছে কনটেন্টের জটিল বিন্যাসই হয়ে ওঠে নতুন বাধা?
প্রযুক্তি যখন শিক্ষার দরজা আরও প্রশস্ত করার কথা তখন সেই দরজা যেন কারো জন্য বন্ধ না হয়ে যায়, এই লক্ষ্যেই বিশ্বমঞ্চে কাজ করছেন বাংলাদেশের তরুণ গবেষক তোরসা জহুর। তার গবেষণা ও পেশাগত কাজের মূল ক্ষেত্র ‘ডিজিটাল একসেসিবিলিটি’ ও ‘লার্নিং ডিজএবিলিটি’। অর্থাৎ প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় শারীরিক, মানসিক, ভাষাগত কিংবা শিক্ষণগত প্রতিবন্ধকতা থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
এজন্য যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডেকোটায় তোরসা জহুর পেয়েছেন সম্মানজনক ‘২০২৬ ইয়াং প্রফেশনাল অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার। ‘গ্রেটার গ্র্যান্ড ফোর্কস ইয়াং প্রফেশনালস’ (জিজিএফওয়াইপি) তাকে এ সম্মাননা দেয়। এ বছর মার্চে দ্য অলিভ অ্যান হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সংগঠনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্রেনা ম্যাথিয়াসনের কাছ থেকে তিনি পুরস্কার গ্রহণ করেন। গ্র্যান্ড ফোর্কস অঞ্চলের শিক্ষা ও সামাজিক অবকাঠামোয় দুই বছরেরও বেশি সময়ের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়।
এই অর্জন অবশ্য হঠাৎ করে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের মাটিতে গড়ে ওঠা একাডেমিক ভিত্তি, বিশেষায়িত জ্ঞান এবং মানুষের জন্য কাজ করার দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষা।
আরও পড়ুন
গুগলে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য যুক্ত করার উপায় জানেন?
তোরসা জহুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডার্স বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ডেকোটা-তে ‘টিচিং অ্যান্ড লিডারশিপ’ বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে টিচিং ইন্সট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার গবেষণার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু কীভাবে শিক্ষকদের ভূমিকা ও প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা যায়।
ডিজিটাল একসেসিবিলিটি আসলে কী?
তোরসার ভাষায়, ডিজিটাল একসেসিবিলিটি হলো এমন একটি প্রযুক্তিগত ও শিক্ষাবান্ধব ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী তার শারীরিক, মানসিক, ভাষাগত কিংবা শিক্ষণগত প্রতিবন্ধকতার কারণে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় যখন অনলাইনে লেকচার, পিডিএফ, অ্যাসাইনমেন্ট কিংবা ভিডিও প্রকাশ করে, তখন শুধু সেগুলো অনলাইনে তুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সেগুলো সব শিক্ষার্থীর ব্যবহারের উপযোগী কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হয়।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী যেন স্ক্রিন-রিডারের মাধ্যমে একটি ডকুমেন্ট পড়তে পারেন, শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী যেন ভিডিওর সঠিক ক্যাপশন দেখতে পারেন, আর ডিসলেক্সিয়া বা ডিসগ্রাফিয়ায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীর জন্য কনটেন্টের কাঠামো যেন সহজবোধ্য হয় এসবই ডিজিটাল একসেসিবিলিটির অংশ।
তোরসার আশঙ্কা, প্রযুক্তি যদি সবার জন্য প্রবেশগম্য না হয়, তাহলে প্রযুক্তির অগ্রগতি নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ একদিকে প্রযুক্তি শিক্ষাকে সহজ করবে, অন্যদিকে সেই প্রযুক্তিই কিছু শিক্ষার্থীকে শিক্ষার মূলধারা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ডেকোটায় অ্যাক্সেসিবিলিটি রিভিউয়ার হিসেবে তোরসার কাজ আরও নির্দিষ্ট। শিক্ষকদের তৈরি ডিজিটাল লার্নিং ম্যাটেরিয়াল ও অনলাইন কোর্স তিনি পরীক্ষা করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলোকে আরও প্রবেশগম্য করে তোলেন।
আরও পড়ুন
কপালে লাগানো থাকলেই শরীরের খুঁটিনাটি মাপবে ‘টেম্পল’
পিডিএফ, পাওয়ারপয়েন্ট কিংবা ভিডিও কোনো কনটেন্টই তার পর্যালোচনার বাইরে নয়। কোথায় হেডিংয়ের কাঠামো ভুল, কোনো টেবিল স্ক্রিন-রিডারে ঠিকমতো পড়া যাচ্ছে কি না, ছবির সঙ্গে যথাযথ ‘অল্টারনেটিভ টেক্সট’ আছে কি না, ভিডিওতে সময়ের সঙ্গে সমন্বিত ক্যাপশন রয়েছে কি না এসব বিষয় তিনি পদ্ধতিগতভাবে পরীক্ষা করেন।
এ কাজে তিনি ব্যবহার করেন বিভিন্ন ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক প্ল্যাটফর্ম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় ইউনিভার্সাল ডিজাইন ফর লার্নিং (ইউডিএল), আমেরিকানস উইথ ডিস্যাবিলিটিস অ্যাক্ট (এডিএ) এবং ওয়েব কনটেন্ট অ্যাক্সিসিবিলিটি গাইডলাইনস (ডব্লিউসিএজি)-এর মতো কাঠামো অনুসরণ করে তিনি শিক্ষকদের তৈরি কনটেন্টে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে সহায়তা করেন।
তোরসার কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো শিক্ষক। কারণ তার মতে, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু প্রযুক্তি থাকলেই হবে না; শিক্ষককেও সেই প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম হতে হবে।
তিনি দেখেছেন, অনেক শিক্ষকই অন্তর্ভুক্তিমূলক শ্রেণিকক্ষ তৈরি করতে আগ্রহী। কিন্তু কীভাবে ডিজিটাল কনটেন্টকে অ্যাক্সেসিবল করা যায়, কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে কিংবা কীভাবে শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত সহায়তা ও সচেতনতার অভাব রয়েছে।
তার পিএইচডি গবেষণার সঙ্গে তাই বিষয়টি সরাসরি যুক্ত অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্লাসরুম নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের ভূমিকা কী এবং তাদের কীভাবে প্রস্তুত করা যায়। বাংলাদেশে অর্জিত স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথলজির ক্লিনিক্যাল জ্ঞানকে আধুনিক শিক্ষা প্রযুক্তি ও বর্তমান গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করে একটি টেকসই প্যাডাগজিক্যাল মডেল তৈরির লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছেন তিনি।
ডিজিটাল একসেসিবিলিটির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী নিঃসন্দেহে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও লার্নিং ডিজএবিলিটি থাকা শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এর সুফল কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যেমন-একটি ভিডিওতে ক্যাপশন থাকলে শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী যেমন উপকৃত হন, তেমনি শব্দ ছাড়াই ভিডিও দেখতে চাওয়া একজন সাধারণ শিক্ষার্থীও সহজে বিষয়টি বুঝতে পারেন। একইভাবে সুসংগঠিত ও পরিষ্কার ডিজিটাল কনটেন্ট সব শিক্ষার্থীর শেখার অভিজ্ঞতাই উন্নত করে।
অর্থাৎ একসেসিবিলিটি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য আলাদা সুবিধা তৈরি করা নয়; বরং এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে সবাই নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী সমানভাবে শেখার সুযোগ পাবে। বিশ্বের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থায় ডিজিটাল একসেসিবিলিটি যখন নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে, তখন বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত অনলাইন লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ডিজিটাল বই, ভিডিও লেকচার ও অনলাইন অ্যাসাইনমেন্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এসব কনটেন্ট কতটা অ্যাক্সেসিবল সেই প্রশ্নটি এখনই গুরুত্ব দিয়ে ভাবা প্রয়োজন।
তার মতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা ব্যবস্থা করার পাশাপাশি শুরু থেকেই ‘সবার জন্য ডিজাইন’ নীতিকে শিক্ষাব্যবস্থার অংশ করা যেতে পারে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির নির্দেশিকা, অ্যাক্সেসিবিলিটি অডিট এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মতো বিষয়গুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন
ফেসবুকে হঠাৎ এআই ড্রামার কেন এত জনপ্রিয়তা?
যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পরও তোরসার লক্ষ্য শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যে থেমে নেই। বরং এই অর্জনকে তিনি আরও বড় কাজের প্রেরণা হিসেবে দেখছেন। তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে শিক্ষকতা, লার্নিং ডিজএবিলিটি ও ডিজিটাল একসেসিবিলিটি নিয়ে টেকসই মডেল তৈরি করা। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভার্চুয়াল রিয়ালিটি প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে তার। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদনে তার এ ধরনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে।
তোরসা জহুরের গল্প তাই কেবল একজন বাংলাদেশি তরুণের বিদেশে পুরস্কার পাওয়ার গল্প নয়। এটি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্নের গল্প, যেখানে প্রযুক্তি কাউকে বাদ দেবে না; বরং প্রযুক্তিই হয়ে উঠবে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির হাতিয়ার।
বিশ্ব যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল শিক্ষার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন তোরসার কাজ মনে করিয়ে দেয় প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, তার প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন সেই প্রযুক্তির দরজা সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষটির জন্যও খোলা থাকে। বাংলাদেশ থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে দাঁড়িয়ে তোরসা জহুর সেই দরজাটিই আরও প্রশস্ত করার কাজে ব্যস্ত। তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সেই প্রচেষ্টারই এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
কেএসকে