
প্রতিদিন বদলাতে থাকা বাংলাদেশের কর-জগতে নোটিশের চাপ আর ঝুঁকির হিসাব-নিকাশের খাটুনি নিতে পারে এআই; সিদ্ধান্ত থাকবে মানুষের হাতেই
শুরুটা সাধারণত একটা নোটিশ দিয়েই হয়। আয়কর আইন, ২০২৩-এর কোনো ধারা দেখিয়ে কর অফিস থেকে চিঠি আসে। সঙ্গে থাকে লম্বা তালিকা—কখনো ১৫টা, কখনো ২০টার বেশি কাগজপত্র, বিবরণী, হিসাব মেলানোর ডকুমেন্ট আর ব্যাখ্যা; জমা দিতে হবে কয়েক দিনের মধ্যে। ঢাকার কোনো অফিসে তখন ট্যাক্স ম্যানেজার বাকি সব কাজ ফেলে রাখেন, বের করেন গত বছরের অ্যাসেসমেন্ট ফাইল, শুরু হয় চেনা সেই ঘাম ঝরানোর পালা।
বাংলাদেশের মতো দ্রুত বদলাতে থাকা কর-পরিবেশে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের কাছে এ দৃশ্য প্রতিদিনের। বদলাচ্ছে শুধু একটা জিনিস—পাশে কে বসছেন। সেমিনারের আলোচনার বিষয় থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন করের জগতে কাজের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এর সবচেয়ে বাস্তব রূপ হতে পারে ‘ইন-হাউস ট্যাক্স এজেন্ট’—এমন এক এআই, যাকে শেখানো হয় দেশের কর আইন, প্রতিষ্ঠানের নিজের অ্যাসেসমেন্টের ইতিহাস আর ব্যবসার প্রক্রিয়া। এরপর সপ্তাহের কাজ সেকেন্ডে সেরে সে নোটিশ ভেঙে ভেঙে পড়ে, বিরোধ কোথায় বাধতে পারে চিহ্নিত করে, আগেভাগে জানিয়ে দেয় করঝুঁকির হিসাব।
ম্যানেজমেন্টের ভাষায় এমন পরিবেশকে বলে ‘ভুকা’ (VUCA)—ভোলাটাইল বা অস্থির, আনসার্টেইন বা অনিশ্চিত, কমপ্লেক্স বা জটিল, আর অ্যামবিগুয়াস বা অস্পষ্ট। বাংলাদেশের কর-জগৎ কথাটার পুরো মানেই বহন করে। প্রতিবছর অর্থ আইনে বদলায় করের বিধান; তার ওপর স্তরে স্তরে জমে এসআরও, পরিপত্র, ব্যাখ্যা। এক সার্কেল অফিস থেকে আরেক সার্কেলে প্রয়োগের ধরনও এক নয়। আর পেশাজীবীরা জানেন এমন এক সত্য, যা পাঠ্যবইয়ে লেখা থাকে না—ফলাফল অনেক সময় আইনের অক্ষরের চেয়ে চালু প্র্যাকটিসের ওপরই বেশি নির্ভর করে।
এ জন্যই করঝুঁকি মাপা এত কঠিন। নতুন কোনো উদ্যোগ, বদলে যাওয়া বিজনেস প্রসেস কিংবা নতুন করে সাজানো সাপ্লাই চেইনে নেওয়া কোনো অবস্থান অ্যাসেসমেন্টে টিকবে কি না, তা নির্ভর করে হাজারো বিষয়ের ওপর—লেনদেনের ধরন, খাত, টিডিএসের (উৎসে কর কর্তন) ইতিহাস, আগের অ্যাসেসমেন্ট অর্ডার, আপিলের গতিপ্রকৃতি, এমনকি কর কর্মকর্তার দৃষ্টিভঙ্গি। শত শত এমন বিষয় একসঙ্গে ধারাবাহিকভাবে ওজন করার কাজ মানুষ করে ধীরে, যন্ত্র করে দ্রুত। আবার এ কাজেই মানুষ মাঝেমধ্যে জরুরি কিছু মিস করে যায়; সে জন্যই সবচেয়ে দামি কর-ধাক্কাগুলো আসে ব্যবসা চালুর পরে, আগে নয়।
এআই নিয়ে যাঁরা এখনো দোটানায়, তাঁদের জানা দরকার—কর প্রশাসন কিন্তু বসে নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বলেছে, অডিটের জন্য ফাইল বাছাই হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে, বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ডে; সেই বাছাইয়ে মানুষের কোনো হাত থাকবে না। ২০২৭ সালের মধ্যে সারা দেশে পুরোপুরি অটোমেটেড কমপ্লায়েন্স-মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যও ঠিক করেছে সংস্থাটি; শুরু হবে পুরোদমে চালু ই-রিটার্ন ও ই-অডিট প্ল্যাটফর্ম আর ব্যক্তি ও কোম্পানির জন্য ঝুঁকিভিত্তিক অডিট দিয়ে। ইতিমধ্যে প্রায় ৪৪ লাখ রিটার্ন অনলাইনে জমা পড়েছে; কর্মকর্তাদের আশা, সংখ্যাটা ৫০ লাখের কাছাকাছি যাবে।
এত তোড়জোড়ের পেছনে আছে রাজস্বের চাপ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত নেমে আসে প্রায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশে—এশিয়ার মধ্যে একেবারে নিচের সারিতে। আর সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণার হিসাবে, শুধু ২০২৩ সালেই কর ফাঁকিতে রাজস্ব ক্ষতি ছাড়িয়ে যায় ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরের ভাষ্য, অটোমেশনে একদিকে করজাল বাড়বে, অন্যদিকে কমবে ব্যক্তিবিশেষের খেয়ালখুশির সুযোগ।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.com
বাংলাদেশ আসলে হাঁটছে বিশ্বের পথেই। ওইসিডির সর্বশেষ প্রযুক্তি জরিপ বলছে, সংস্থার ৩৮ সদস্যদেশের মধ্যে ২৯টির কর প্রশাসনই এআই ব্যবহার করছে; সবচেয়ে বেশি ব্যবহার কর ফাঁকি আর জালিয়াতি ধরায়। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি নিরীক্ষকদের হিসাবে, দেশটির রাজস্ব সংস্থা আইআরএসে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্র ২০২২ সালের ১০টি থেকে বেড়ে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি দাঁড়ায় ১২৬টিতে; ২০২৬ সালের শুরুতে এসব ব্যবস্থা চালানোর আনুষ্ঠানিক নিয়মকানুন ঢোকে সংস্থার অভ্যন্তরীণ ম্যানুয়ালে। কর্তৃপক্ষ যখন অ্যানালিটিকস দিয়ে কোম্পানির দাখিলপত্র চষে বেড়ায়, তখন হাতে বানানো স্প্রেডশিট দিয়ে জবাব দেওয়া রীতিমতো অসম লড়াই।
দূরদর্শী ট্যাক্স টিমগুলোয় যে সমাধান দানা বাঁধছে, সেটা কোনো সাধারণ চ্যাটবট নয়; নির্দিষ্ট কাজের জন্য বানানো এজেন্ট। পার্থক্যটা জরুরি। সাধারণ এআই মডেল আইন জানে বইয়ের মতো করে; ইন-হাউস ট্যাক্স এজেন্ট দাঁড়িয়ে থাকে আয়কর আইন, ২০২৩ আর সংশোধিত ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ভিতের ওপর। আর—সবচেয়ে বড় কথা—প্রতিষ্ঠানের নিজের ভান্ডারের ওপর: আগের অ্যাসেসমেন্ট অর্ডার, আপিলের রায়, বিভাগীয় ব্যাখ্যা, ইন-হাউস ট্যাক্স অপিনিয়ন আর লিখে রাখা বিজনেস প্রসেস। এখনকার এআই মডেলগুলো আইনের যুক্তি ধরতে পারে, কোন শর্ত কোন তফসিলের সঙ্গে কীভাবে জড়ায় বুঝতে পারে, আর দাখিল করা অবস্থান চালু প্র্যাকটিস থেকে কোথায় সরে গেছে, সেটাও চিনতে পারে। বিরোধের জন্ম তো ঠিক ওখানেই।
কাজের জায়গাগুলোও মিলে যায় একজন পেশাজীবীর সবচেয়ে কঠিন সপ্তাহগুলোর সঙ্গে। নোটিশ এলে এজেন্ট চাওয়া প্রতিটি ডকুমেন্ট আর বিবরণী আলাদা করে পড়বে, কোন খতিয়ান বা ফাইলে তার জবাব আছে মিলিয়ে দেবে, আর চায়ের কাপ ঠান্ডা হওয়ার আগেই সাজিয়ে ফেলবে জবাবের চেকলিস্ট। পরিকল্পিত কোনো লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন করলে আন্দাজে উত্তর নয়; প্রতিষ্ঠানের নিজের অ্যাসেসমেন্টের ইতিহাস মিলিয়ে বলে দেবে, আপত্তি ওঠার আশঙ্কা কতটা। আর কমপ্লায়েন্স রিপোর্টে চালালে সেকেন্ডের মধ্যে বের করে আনবে টিডিএস-ভিডিএসের ফাঁকফোকর আর ঝুঁকির জায়গাগুলো।
সবচেয়ে বড় লাভটা সম্ভবত আরও আগের ধাপে—বিজনেস ইনকিউবেশনের সময়। কোনো প্রকল্পের করপ্রভাব বোঝার সেরা সময় সেটা শুরুর আগে; অথচ ব্যস্ত মানুষের চোখ সবচেয়ে বেশি ফসকে যায় এই ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টেই। ব্যবসার প্রক্রিয়া শেখানো এজেন্ট থাকলে মালিক আর করের বাইরের স্টেকহোল্ডাররাও সহজ ভাষায় জেনে নিতে পারেন, কোন সিদ্ধান্তের করফল কী। ট্যাক্স তখন আর পরের ধাক্কা নয়, পরিকল্পনারই অংশ।
এর কোনোটাই কর পেশাজীবীকে অবসরে পাঠাচ্ছে না। ধূসর জায়গায় বিচার-বিবেচনা, শুনানিতে যুক্তি তুলে ধরা, আপিল ফোরামে দাঁড়ানো, কোনো অবস্থানের নৈতিক ওজন মাপা—এসব শেষ পর্যন্ত মানুষেরই কাজ। এজেন্ট চালাতেও লাগে নিজস্ব শৃঙ্খলা: অ্যাসেসমেন্টের নথি স্পর্শকাতর, তাই ডেটা সুরক্ষা আর গোপনীয়তায় ছাড় নেই; আর কোনো ফলাফল কর্মকর্তার টেবিলে যাওয়ার আগে পেশাদার যাচাই বাধ্যতামূলক। কর প্রশাসনে ভরসাযোগ্য এআইয়ের শর্ত হিসেবে ওইসিডিও এই সতর্কতার কথাই বলে।
তবে গতিপথ ঠিক হয়ে গেছে। দক্ষ এজেন্ট তদারক করা পেশাজীবীরা এগিয়ে যাবেন হাতে হাতে বিবরণী বানানো সহকর্মীদের চেয়ে—ঠিক যেমন অ্যানালিটিকসে চলা প্রশাসন এগিয়ে যাচ্ছে বাকিদের চেয়ে। বাংলাদেশের কর অঙ্গনের জন্য প্রশ্নটা তাই ট্রেনে উঠবেন কি না, তা নয়; উঠবেন কত দ্রুত, সেটাই।
নোটিশ আসবেই, ডেডলাইনও থাকবে আগের মতোই কঠিন। বদলাবে শুধু তার পরের দৃশ্য: ঘাম ঝরাবে এআই, সিদ্ধান্ত নেবেন পেশাজীবী—আর ব্যবসা ফিরে যাবে তার আসল কাজে, ব্যবসা দেখভালে।
*লেখক: মো. শওকত হোসেন, হেড অব ট্যাক্স, আকিজ রিসোর্স