২০১৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরে সেলিনা বেগমের বাসায় ঘুমিয়ে ছিলেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার। সেদিন রাতে ডিবি পরিচয়ে টিপুকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এর এক দিন পরই টিপুকে ক্রসফায়ারে হত্যা করার খবর পান সেলিনা বেগম।
এরপর ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে টেলিভিশনে দেখেন টিপু ও কবির নামে দুজন ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। তার ভাগনির কাছে তিনি শুনেছেন, অন্য থানার দুজন পুলিশ টিপুকে ক্রসফায়ার দিয়ে হত্যা করেছেন।
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে ২০১৫ সালে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চার জন আসামির বিরুদ্ধে করা মামলায় সাক্ষীর জবানবন্দি দিয়েছেন দুই জন সাক্ষী।
আসামিরা হলেন, সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, বরিশালের উজিরপুর থানার সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মো. মাহাবুল ইসলাম ও মো.জসিম উদ্দিন এবং বরিশালের তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসানউল্লাহ। এর মধ্যে মো. মাহাবুল ইসলাম ও মো.জসিম উদ্দিন গ্রেফতার করে কারাগারে রয়েছেন।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ তারা জবানবন্দি দেন। ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ভুক্তভোগী দুজন হলেন আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং একই উপজেলার জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা।
অভিযোগে বলা হয়, হাসানাত আবদুল্লাহর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লা। রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে হাসানাত আবদুল্লাহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই দুজনকে হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করেন। হাসানাত আবদুল্লাহ ও এহসানউল্লাহ তাদের অধস্তন পুলিশ সদস্যদের দিয়ে ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে গৌরনদী–গোপালগঞ্জ হাইওয়ের আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের বড় ব্রিজের পশ্চিম পাশে টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লাকে গুলি করে হত্যা করে।
জবানবন্দিতে সেলিনা বেগম বলেন, ভিকটিম টিপু হাওলাদার আমার ভাগ্নি জামাই। টিপু হাওলাদার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। তিনি একটি এনজিও’র সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি টিপু হাওলাদার আমার বর্তমান ঠিকানার বাড়িতে আসেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি দিনগত রাতে আমার বাসায় ডিবি পুলিশ আসে। আমরা জিজ্ঞাসা করলে আগত লোকজন জানান যে, তারা বরিশাল থেকে এসেছে এবং তাদের সঙ্গে ঢাকার কিছু লোক আছে। তারা নিজেদের ডিবি পুলিশের লোক মর্মে পরিচয় দেয় এবং টিপুকে ঘুম থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। আমি ঘটনার সময় চিৎকার করলে পাশের বাসা থেকে একজন প্রতিবেশী বোন নাহার বেগম এগিয়ে আসেন। আমি এবং আমার প্রতিবেশী বোন টিপুকে যে স্থানে গাড়িতে তোলা হয় সে পর্যন্ত যাই। আমি ওইদিন রাতেই আমার ভাগ্নিকে ফোন দিয়ে ঘটনা জানাই।
আরও পড়ুন
ডিভাইস মিসিংয়ের সূত্রে সাগর-রুনি হত্যা মামলায় নতুন ক্লু
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, সম্ভবত ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে টেলিভিশনের হেডলাইনে দেখতে পাই টিপু ও কবির নামে দুইজন ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন। আমি তখন আমার ননদ জামাই অর্থাং টিপু হাওলাদারের শ্বশুরকে কল দিয়ে ঘটনা জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান যে, ঘটনা সত্য।
অন্য জবানবন্দিতে সামছুন নাহার বেগম বলেন, ভিকটিম টিপু হাওলাদারের বাড়ি আমার গ্রামের বাড়ির এলাকায় অবস্থিত। আমি বর্তমানে কেরানীগঞ্জ থানার ঘাটারচর এলাকায় বসবাস করি। ২০১৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে পৌনে ৩টার সময় সেলিনার চিৎকার শুনতে পাই। সেলিনা চিৎকার করে আমার নাম ধরে ডাকে এবং বলে যে, টিপু হাওলাদারকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আমি ঘর থেকে বের হয়ে টিপু হাওলাদারকে যে গাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় সে পর্যন্ত যাই। আমি জিজ্ঞাসা করলে টিপু হাওলাদারকে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা জানায় যে, তারা ডিবি পুলিশের লোক এবং তারা আগৈলঝাড়া থানা থেকে এসেছে। পর দিন সকাল বেলা আমি টিপু হাওলাদারের আত্মীয় স্বজনকে ফোন দেই। আমি মোহাম্মদপুর সহ কয়েকটি থানায় টিপু হাওলাদারের বিষয়ে খোঁজ নিয়েছি।
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে টেলিভিশনে দেখি যে, আগৈলঝাড়া বাইপাস এলাকায় টিপু হাওলাদারকে ক্রসফায়ার দিয়ে হত্যা করা হয়। পরে এলাকার লোকের কাছে শুনেছি টিপু বিএনপির রাজনীতি করত এবং তাকে আওয়ামী লীগে যোগ দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু যোগ না দেওয়ার জন্য তাকে ক্রসফায়ার দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমি শুনেছি যে, উজিরপুর থেকে লোক নিয়ে এসে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
এফএইচ/এমআইএইচএস