প্রায় চার-পাঁচ বছর আগে ফেসবুকে দেখা গিয়েছিল একটি মেয়েকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। মেয়েটিকে অত্যাচার করে সেটি ভাইরাল করে দেওয়া হয়েছে। ভারতের বেঙ্গালুরুতে একজন কমবয়সী বাংলাদেশি মেয়েকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের এই ভিডিও দুই দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো ঝাঁকুনি দিয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকেই টিকটকের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলে কিশোরী-তরুণীদের পাচার হওয়া-সংক্রান্ত ঘটনার কথা সংবাদমাধ্যমে খবর হয়ে আসে।
অভিভাবক, পুলিশ, শিক্ষক, সাংবাদিক বা অন্যান্য পেশাজীবী—তাঁরা আদতে কেউই জানতে পারেননি যে, টিকটক ও লাইকি’র মতো অ্যাপ ব্যবহার করে মেয়েপাচারকারীদের এত বড় একটি র্যাকেট ৮-১০ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে।
অনলাইনে ওই ঘটনা প্রকাশ না হলে কেউ হয়তো জানতেই পারত না যে, অনলাইন দুনিয়ায় কী ঘটছে। এত দিন কেউ জানতে পারেনি, অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে মেয়েরা নিখোঁজ হচ্ছে এবং ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
সবাইকে ইন্টারনেটের বিপদ, অনলাইন বন্ধুত্ব এবং অনলাইন প্রাইভেসি সম্পর্কে জানাতে হবে। নয়তো এ রকম অপরাধ আরও বাড়তেই থাকবে। অ্যাপ ব্যবহার করা অপরাধ নয়, কিন্তু যথেচ্ছ ব্যবহার করতে গিয়ে যখন শিশু-কিশোরেরা ফাঁদে পড়ে, তখনই সেটা অপরাধ।
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার শিশুর নিখোঁজের জিডি-সংক্রান্ত খবরটি শুনে হঠাৎ করে সেই পুরোনো খবরটির কথা মনে হলো। এই ১৫ হাজারের কতজন পরে ফিরে এসেছে, কতজন এখনো নিখোঁজ, কতজন অপহরণ বা পাচারের শিকার হয়েছে—তার কোনো সমন্বিত জাতীয় হিসাব এখনো জানা নেই।
শিশু হারিয়ে যাওয়ার এই সংখ্যাটি কিন্তু খুব ভয়াবহ। সাত মাসে ১৫ হাজার মানে মাসে গড়ে প্রায় ২,১৪৩টি জিডি, দিনে ৭০টি। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ২০-২১ মিনিটে একজন শিশুর নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় এসেছে। (সূত্র: একাত্তর টিভি)
পরবর্তীতে হয়তো অনেক শিশু ফিরে আসে, কিন্তু সেই হিসাবটা আর জানা হয়ে ওঠে না। এ ছাড়া কতজন পালিয়ে গেছে, কতজনকে অপহরণ করা হয়েছে, কতজন পাচার হয়ে গেছে এবং কতজন বিয়ে করেছে—এটাও জানা হয় না। কারণ সেই জিডির ফলোআপ নিয়ে নির্ভরযোগ্য জাতীয় হিসাব নেই।
২০২২ সালে শুধু ঢাকাতেই নিখোঁজ-সংক্রান্ত ৫,৯৮৪টি জিডি হয়েছিল। তখন পুলিশও স্বীকার করেছিল, কতজন পরে ফিরে এসেছে তার সঠিক হিসাব তাদের কাছে নেই। কারণ অনেক পরিবার শিশু ফিরে পাওয়ার পর থানাকে আর জানায় না। ফলে জিডি কাগজে থেকে যায়, সরকারি ডেটাবেসে যুক্ত হয় না। (সূত্র: ভোরের ডাক)
পনেরো হাজার শিশু উধাও হওয়ার খবরটি মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। আমরা জানতে পারিনি, গত কয়েক বছরে কতজন শিশু হারিয়ে গেছে এবং কতজন ফিরে এসেছে। শিশু, বিশেষ করে কিশোরী হারানোর ঘটনা নিয়ে আদতে রাষ্ট্র কী ভাবছে?
একজন শিশু হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু সেই শিশুর মা-বাবা বা পরিবারের জন্য আতঙ্কের নয়, এই আতঙ্ক সমাজ ও রাষ্ট্রেরও হওয়া উচিত। নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে কাজ করছে পুলিশ সদর দপ্তর এবং শিশু সুরক্ষায় নিয়োজিত বিশেষ অ্যালার্ট সিস্টেম ‘মুন অ্যালার্ট’। তাদের মতে, শিশু হারানোর পরে প্রথম তিন ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশ জানিয়েছে, অনেক সময় পরিবার দেরিতে পুলিশকে জানায়। পরিবার নিজে খোঁজাখুঁজি করে সময় নষ্ট করে, যা অপরাধীদের দূরে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার সামাজিকভাবে বিষয়টি প্রকাশ করতে চায় না। বিশেষ করে প্রেমের বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাবে—এই আশঙ্কায় কেউ কেউ পুলিশকে জানাতেও দেরি করেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিখোঁজ ও পাচারের শিকার শিশুদের বড় একটি অংশই কিশোরী বা কমবয়সী তরুণী।
কিশোরী মেয়েদের ঘর ছাড়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত তিন মাসে নারায়ণগঞ্জের একটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ৪০ কিশোরী উধাও হয়ে গেছে। তাদের বেশির ভাগই মুঠোফোনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগের পর অপরিচিত বা পরিচিত তরুণদের সঙ্গে বাড়ি ছাড়ছে বলে পুলিশ বলছে। তাদের কেউ কেউ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও বাড়ি ফিরতে চাইছে না।
শিশু মনোবিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, কিশোরীদের ঘর ছাড়ার ঘটনায় মুঠোফোনের ব্যবহার অন্যতম বড় কারণ। স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে খুব সহজেই নতুন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। প্রেমের কারণেও অনেক কিশোরী পালিয়ে যাচ্ছে।
শিশু নিখোঁজ হওয়ার এই ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ও অনিরাপদ ব্যবহার ব্যাপকসংখ্যক শিশু-কিশোর, বিশেষ করে কিশোরীদের ফাঁদে ফেলছে। টিকটক ও লাইকি’র জনপ্রিয়তার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিশোরী-তরুণীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে।
কাউকে কাউকে যৌন ব্যবসায় সম্পৃক্ত করা হয়, বিদেশে পাচার ও বিক্রি করে দেওয়া হয়। পাচার হয়ে যাওয়া কিশোরী ও তরুণীদের যারা ফিরে আসেন, তাঁরা ট্রমায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন। যেসব মেয়েরা ফিরে আসতে চায় না, দেখা গেছে, এদের অনেককেই ধর্ষণ, আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হয়।
টিকটক, লাইকি’র মতো অ্যাপগুলো নিয়ে আমাদের অনেকেরই তেমন কোনো ধারণা নেই, কিন্তু অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের কাছে এই অ্যাপ খুবই জনপ্রিয়। সেগুলোতে বলা হয়, কমবয়সী, বিশেষ করে কিশোরী ও সুন্দর চেহারার মেয়েদের টিকটক ‘স্টার’ বানিয়ে দেওয়া হবে। এই পথে তারা টাকা আয় করতেও পারবে, তাদের ফলোয়ার বাড়বে।
বিভিন্ন চক্র বিভিন্ন রিসোর্টে ‘টিকটক মিট-আপ’, ‘পুল পার্টি’ বা ফ্যান ক্লাবের আড্ডার আয়োজন করে। এসব পার্টিতে ডেকে নিয়ে কিশোরীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলা হয়, যা পরবর্তীতে তাদের পাচার বা অপহরণ করার পথ সহজ করে দেয়।
লক্ষ করলে দেখা যায়, বেশির ভাগ টিকটকার কম বয়সী। স্বল্পশিক্ষিত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরাও খুব সহজেই সাইবার-বিনোদন জগতে প্রবেশ করতে পারে। শুধু একটি স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট কানেকশন হলেই চলে।
বাংলাদেশের শিশু-কিশোররা যে অনলাইনে বিপদের মুখে আছে, বেশ কয়েক বছর ধরেই এটা নিয়ে অল্পবিস্তর আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু পরিবার, স্কুল, সমাজ এবং সরকার বিষয়টিতে নজর দিচ্ছে না। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (সিক্যাফ) ২০২৩ সালে এক প্রতিবেদনে বলেছে, সাইবার অপরাধের ধরনে বদল দেখা দিয়েছে এবং বেশি ঝুঁকিতে আছেন নারী, কিশোরী ও শিশুরা। সাইবার জগতে কিশোরী ভুক্তভোগীদের হার ক্রমেই বাড়ছে।
সারা দেশে ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপ সক্রিয় হয়ে উঠছে, যারা ফাঁদে ফেলে শিশু ও নারীদের নিয়ে ব্যবসা করছে। ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে ‘পমপম’ নামের একটি গ্রুপ নানাভাবে কিশোরী ও তরুণীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। এরপর কৌশলে তাঁদের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে। ভুক্তভোগী মেয়েদের প্রেমিকরাও এই টেলিগ্রাম গ্রুপে তাঁদের সম্পর্ক চলাকালীন সময়ের ভিডিও দিয়ে থাকে।
ইউনিসেফ ২০১৯ সালেই এক জরিপে বলেছিল, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১০-১৭ বছর বয়সী ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইন সহিংসতা ও ভয়ভীতির মুখে আছে। জরিপে অংশ নেওয়া ১৯ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, তারা অনলাইনে যৌনতাবিষয়ক বার্তা পেয়েছে। ১২ শতাংশ যৌনতাবিষয়ক ছবি বা ভিডিও পেয়েছে। ৫ শতাংশ জানিয়েছে, তাদের নগ্ন ছবি-ভিডিও পাঠানোর জন্য জোরাজুরি করা হয়েছে।
তাহলে কি টিকটক, লাইকি বন্ধ করে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে? বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) মনে করে, টিকটক, ফেসবুক, লাইকি—এগুলো বিটিআরসি চাইলেই বন্ধ করতে পারে না। এ ব্যাপারে সমাজে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
অনলাইন অপরাধ একটি জটিল সামাজিক সমস্যা। আইন দিয়ে বা পুলিশি তৎপরতা চালিয়ে একে ঠেকানো যাবে না। অন্যদিকে শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তির বাইরে রাখা যাবে না। তাই সন্তানকে রক্ষা করার জন্য অভিভাবকদের খুব বেশি সচেতন হতে হবে। কারও সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে শিশু-কিশোর, বিশেষ করে কিশোরীদের সচেতন করতে হবে।
তবে এখানে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, যোগাযোগমাধ্যম বিষয়ক জ্ঞান শিশু-কিশোরদের চেয়ে অভিভাবকদের অনেক কম। ফলে শিশুরা কী দেখছে, কী জানছে—এ-সংক্রান্ত অধিকাংশ তথ্যই অভিভাবকেরা জানতে পারছেন না।
যেহেতু ১৫ হাজার শিশু ও কিশোরীর নিখোঁজ হওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ মোবাইল এবং বিভিন্ন অ্যাপের ব্যবহার, তাই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত। এই বাচ্চারা তো হাওয়ায় উড়ে যায়নি, তাহলে গেল কোথায় এবং কীভাবে গেল?
অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তার জন্য কর্তৃপক্ষকে একটি সচেতনতামূলক, দীর্ঘমেয়াদি এবং সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। সবাইকে ইন্টারনেটের বিপদ, অনলাইন বন্ধুত্ব এবং অনলাইন প্রাইভেসি সম্পর্কে জানাতে হবে। নয়তো এ রকম অপরাধ আরও বাড়তেই থাকবে। অ্যাপ ব্যবহার করা অপরাধ নয়, কিন্তু যথেচ্ছ ব্যবহার করতে গিয়ে যখন শিশু-কিশোরেরা ফাঁদে পড়ে, তখনই সেটা অপরাধ।
১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।
এইচআর/এএসএম