লিওনেল মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিয়েছেন। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে শেষবারের মতো মাঠে নামার পর থেকেই এই মহাতারকাকে ঘিরে আলোচনা থামছে না। কেউ মনে করছেন, এটাই মেসির জন্য অবসর নেওয়ার সঠিক সময়, কেউ আবার বলছেন, ফুটবলের এই জাদুকর হয়তো আরও কিছুদিন বিশ্বকাপের মাঠে থাকতে পারতেন। তবে বিদায় নিলেও ফুটবলকে মেসি যা দিয়েছেন, তাতে দর্শকের হৃদয়ে তিনি অনন্য হয়েই থাকবেন।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ফুটবল মানুষের কাছে জনপ্রিয়। আর সেই ফুটবলের সঙ্গে লিওনেল মেসি নিজেকে এমনভাবে জড়িয়ে নিয়েছেন যে, তাকে বাদ দিয়ে আধুনিক ফুটবলের গল্প ভাবাই কঠিন। গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চগুলোতে আলো কেড়ে নিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসি ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ছোট-বড় সবার প্রিয় সেই মেসি এবার আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন।
ফুটবলে হয়তো ভবিষ্যতে আরও অনেক মহাতারকা আসবেন। কেউ হয়তো রেকর্ড ভাঙবেন, নতুন ইতিহাস লিখবেন। কিন্তু লিওনেল মেসি থেকে যাবেন নিজের স্বতন্ত্র মহিমায় অনন্য হয়ে।
বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়
রেকর্ড আর অর্জনে ভরা দুই দশকের ক্যারিয়ারের ইতি টেনে অনন্য এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন লিওনেল মেসি। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন ৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবল জাদুকর।
অবসরবার্তায় মেসি লিখেছেন, ‘আমার দেওয়ার মতো আর কিছু বাকি নেই। তা ছাড়া পেছনে অনেক দুর্দান্ত তরুণ খেলোয়াড় আসছে, যাদের (জাতীয় দলে) থাকাটা প্রাপ্য।’
এই কয়েকটি শব্দেই যেন ফুটে উঠেছে মেসির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দর্শন। নিজের জন্য নয়, দলের জন্য খেলা; ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে আর্জেন্টিনার সাফল্যকে বড় করে দেখা। জাতীয় দলের হয়ে মেসির পুরো যাত্রাজুড়েই ছিল এই মানসিকতা।
মেসির যত অর্জন
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে ক্যারিয়ারের শেষ ভাগে। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে ফিনালিসিলাম এবং এরপর কাঙ্ক্ষিত ফিফা বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতেন তিনি।
আর্জেন্টিনার হয়ে রেকর্ড সাতটি ফাইনালে খেলেছেন মেসি। জাতীয় দলের হয়ে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা এবং সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবেও নিজের নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।
তবে মেসির অর্জনের তালিকা শুধু ট্রফি আর রেকর্ডে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বকাপের মঞ্চে তার দীর্ঘ উপস্থিতি, ধারাবাহিক পারফরম্যান্স এবং দলকে কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাই তাকে আলাদা করে দিয়েছে।
১০ নম্বর জার্সির গল্প
মেসির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের শুরু হয়েছিল ১৯ নম্বর জার্সি পরে। শুরুর সেই গল্পে ছিল না পাওয়ার কষ্ট, ছিল অপেক্ষা ও হতাশা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় সেই গল্প।
২০০৯ সাল থেকে আর্জেন্টিনার হয়ে ১০ নম্বর জার্সিতে খেলছেন মেসি। ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে সেই ১০ নম্বর জার্সির পাশে জমা হয়েছে অসংখ্য অর্জন। দুটি বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল, একটি বিশ্বকাপ শিরোপা এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। একটি জার্সি যেন হয়ে উঠেছিল একটি যুগের প্রতীক। আর সেই যুগের নাম মেসি।
রোজারিওর সেই ছেলেটি
আর্জেন্টিনার তৃতীয় বৃহত্তম শহর রোজারিওতে জন্ম লিওনেল মেসির। শ্রমজীবী পরিবারের এই ছোট্ট ছেলেটির ফুটবল প্রতিভা খুব অল্প বয়সেই নজর কাড়ে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাকে স্পেনে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেয় বার্সেলোনা।
মেসির চিকিৎসার জন্য তখন গ্রোথ হরমোন থেরাপির প্রয়োজন ছিল। এর ব্যয় বহন করা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ছোট্ট মেসির প্রতিভা দেখে বার্সেলোনা তার চিকিৎসার খরচ বহনের সিদ্ধান্ত নেয়।
বাবার সঙ্গে স্পেনে চলে যান মেসি। মা ও তিন ভাইবোন থেকে যান রোজারিওতে। অল্প বয়সে নিজের শহর, পরিবার ও দেশ থেকে দূরে চলে যাওয়া ছিল তার জীবনের কঠিন এক অধ্যায়। কিন্তু সেই বিচ্ছেদই একসময় তাকে নিয়ে যায় বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে।
বার্সেলোনার হয়ে একের পর এক সাফল্য পাওয়ার পরও আর্জেন্টিনার হয়ে কিছু জেতার স্বপ্ন কখনো ছাড়েননি মেসি। প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টের পরই উঠেছে তার আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন। কখনো হতাশা, কখনো সমালোচনা সবকিছু পেছনে ফেলে তিনি ফিরে এসেছেন।
শেষ পর্যন্ত ২০২৬ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামেন মেসি। এটি ছিল তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। বয়স তখন ৩৯। আগের মতো গতি ছিল না, ম্যাচের অনেক সময় তাকে ধীরগতিতে হাঁটতেও দেখা যায়। কিন্তু বয়স তার কার্যকারিতাকে থামাতে পারেনি। আট গোল ও চারটি অ্যাসিস্ট নিয়ে দলকে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে দেন তিনি। শেষ ম্যাচে স্পেনের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয় আর্জেন্টিনার। আর সেই ফাইনালটি হয় একই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে, যেখানে ঠিক এক দশক আগে প্রথমবার জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি। যেন একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো সেখানেই।
বিদায়েও মেসির জন্য ভালোবাসা
মেসির অবসরে কষ্ট পেয়েছেন তিনি নিজে, কষ্ট পেয়েছেন আর্জেন্টিনার মানুষও। মন খারাপ করেছেন বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী। কারণ মেসির বিদায় মানে শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়; এটি একটি যুগের সমাপ্তিও।
হয়তো আর বিশ্বকাপের মাঠে তাকে দেখা যাবে না। হয়তো একদিন দর্শকসারিতে বসেই দেখতে হবে প্রিয় খেলোয়াড়কে। কিন্তু ফুটবলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মেসি যে স্বর্ণযুগ সৃষ্টি করেছেন, তা কখনো মুছে যাবে না।
আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি হুয়ান রোমান রিকেলমে মেসির অবসর নিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের উচিত তাকে আরও বেশি ধন্যবাদ দেওয়া, সে যা কিছু করেছে, তারপর আমরা আর কী চাইতে পারি? সে নিজের সব স্বপ্ন পূরণ করেছে, আমাদের স্বপ্নও পূরণ করেছে। নিঃসন্দেহে আমি জানি না সে সর্বকালের সেরা কি না, কিন্তু সে সেরাদের কাতারে অবশ্যই। কোনো ফুটবলার এত বছর ধরে সেরা পর্যায়ে থাকতে পারেনি, এটা অবিশ্বাস্য।’
মেসিকে এখন শুধু ভালোবাসা ও সম্মান দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে রিকেলমে বলেন, ‘এখন তাকে ভালোবাসা দিন, স্নেহ দিন, এটাই তার প্রাপ্য। আর্জেন্টিনার ফুটবল এবং ফুটবলের জন্য সে যা করেছে, তার জন্য তাকে ধন্যবাদ দিতে হবে। পুরো বিশ্ব তাকে ভালোবাসে, আর সে এই ভালোবাসার যোগ্য।’
সত্যিই, মেসিকে ঘিরে বিতর্ক থাকতে পারে-কে সর্বকালের সেরা, সেই তর্কও চলবে। কিন্তু একটি জায়গায় কোনো দ্বিমত নেই লিওনেল মেসি ফুটবলকে এমন কিছু দিয়েছেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখবে।
এসএনআর