
আমার জীবনে কোনো দিন লটারি লাগে না। অথচ পোলাওয়ের পাতিলে দেওয়া পাঁচটা এলাচির প্রতিটি ঠিকই প্লেট থেকে মুখে গিয়ে আমার দাঁতে লাগে। ভাগ্য আমার সঙ্গে এমনই করে সব সময়, পুরস্কার এড়িয়ে যায়, এলাচি এড়িয়ে যায় না। এই আমিই শহরের রাস্তায় সাবধানে বাইক চালাই, কখনো প্রাইভেট কারের সঙ্গে লাগেনি, বাসের সঙ্গে লাগেনি, ট্রাকের সঙ্গে লাগেনি। এমনকি কোরবানির সময় একাধিক গরুও রাস্তার মাঝখানে হটাৎ দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, সেদিনও কোনো দুর্ঘটনা হয়নি। শুধু অটোরিকশাওয়ালাদের সঙ্গে আমার চলার রাস্তার সম্পর্কটা একটু গভীর। প্রায়ই এদের সাথে কোথাও না কোথাও একটা লাগালাগি হয়ে যায়। কখনো সে উল্টো দিক থেকে হঠাৎ রিকশার হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে দিক পরিবর্তন করে আমার সামনে এসে সিদ্ধান্ত নেয় আজ এই রাস্তায় না, অন্যদিকে যাই। কখনো আবার আমি ব্রেক করি, গতি সামলাতে না পেরে পেছন থেকে এসে রিকশা আমার বাইকে এমনভাবে চুমু খায়, যেন রিকশার সাথে আমার বাইকের বহুদিনের প্রেমের সম্পর্ক। গত দুই বছরে শহরে অটোরিকশার সংখ্যা এমন বেড়েছে যে মাঝে মাঝে মনে হয়, সরকার অন্য গাড়ির চলাচলের জন্য রাস্তা বানায়নি, অটোরিকশার জন্য একটা বিশাল পার্কিং এরিয়া বানিয়ে তার মধ্যে ভুল করে ঢাকা শহরটা রেখে দিয়েছে।
সেদিনও প্রতিদিনের মতো অফিস থেকে ফিরছি। রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা। আমি নিজের লেনে, নিজের গতিতে। হঠাৎ পেছন থেকে...ঠাস! ধাক্কা খেয়ে আমার বাইক সামনে এগিয়ে গেল, আমি সামনে ঝুঁকে গেলাম, আর হেলমেটের ভেতর আমার আত্মা একটু বের হয়ে এসে আবার ঢুকে গেল। বাইক থামিয়ে পেছনে তাকালাম।
অটোরিকশাওয়ালা হাত তুলে বলল, ভাই, কিছু হয় নাই।
কার হয় নাই, আপনার না আমার? আপনি তো আমার নাম্বারপ্লেটটা বাঁকা করে ফেললেন। এটা কিছু হয় নাই?
নাম্বার দিয়া কী হইব মামা, আমাগোও তো নাম্বার নাই। চলতাসি না? খাড়ান, ব্যাঁকাডা সুজা কইরা দেই।
রাগ মাথায় উঠে গেল, আর রিকশাওয়ালার উঠে গেল ভিকটিম প্লেয়িং রোল। সবকিছুর পর রিকশাওয়ালা দিল তার সেই অমোঘ বাণী, মামা, গরিব মানুষ!
আমি বললাম, গরিব মানুষ বলে আমাকে গরিব করতে পেছন থেকে বাইকে মারবেন?
আর কী করব?
ব্রেক করবেন!
সে আমার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ব্রেকটা মাঝেমইধ্যে কাম করে না মামা!
আমি তখন বুঝলাম, এই কলাগাছের সাথে কথা খরচ করাই লস। আমি রাগে ফোন বের করে ফেসবুক লাইভে চলে গেলাম।
‘বন্ধুরা, আপনারা দেখেন। এই ভাই পেছন থেকে এসে আমার বাইকে মেরে এখন বলছে গরিব মানুষ...’ ক্যামেরা ঘুরিয়ে অটোরিকশাওয়ালাকে দেখালাম। লোকটা প্রথমে একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, ভাই, আপনার কত ফলোয়ার?
আমি বললাম, ষোলো হাজার।
সে হেসে লুঙ্গির গিট্টু থেকে একটা ফোন বের করল।
আমার ‘মাই রিকশা মাই রুল’ পেইজে ছয় লাখ। আমিও লাইভে যাই খাড়ান?
দুই মিনিটের মধ্যে তার লাইভে চার হাজার মানুষ। আমার লাইভে তখন ৭৮ জন। আমি বললাম, ভাই, আপনি আমার বাইকে মেরেছেন, আবার লাইভ করছেন কেন?
সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল, ভাইসব, আমি গরিব মানুষ। আজকে রাস্তায় একটা বাইকওয়ালা আমাকে হেনস্তা করতাছে। এদের কারণে আমাদের রাস্তায় বেশি বেরেক মারতে হয়। এত বেরেক মারলে একটা বেরেক কাম না ও করতে পারে...
কমেন্ট আসতে লাগল—
ভাই, ভয় পাবেন না।
আমরা আছি।
বাইকওয়ালারে ছাড়বেন না।
একজন লিখল— লোকেশন দেন, আমরা আসতেছি।
আমি ঘামতে শুরু করলাম। আমার লাইভে শুধু বউয়ের কমেন্ট, তুমি খালি রিকশাওয়ালাদের সাথেই ঝগড়া করো, কাল থেকে অফিসে বাইক নিয়ে যাওয়ার দরকার নাই, হেঁটে অফিসে যাবা!
রিকশাওয়ালা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, মামা, কী করবেন তাইলে? আমার ফলোয়াররা কইতাসে দোষ আপনার!
বুঝলাম ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে, এখন আমার গরিব রিকশাচালককে জরিমানা দিয়ে নিজেরই গরিব বাইকচালক সাজার উপক্রম হচ্ছে। বাইক স্টার্ট দিতে দিতে রিকশাওয়ালা নামক কলাগাছকে রাস্তায় চলার কিছু রুলসের বয়ান দিয়ে রীতিমতো পলায়ন করে এলাম। পেছন থেকে রিকশাওয়ালা বলল, মামা, আমার পেইজটা ফলো কইরেন!
পরের দিন সকালে বাইক নিয়ে আবার বের হলাম অফিসের উদ্দেশে। তবে এবার আমার স্ট্র৵াটেজি চেঞ্জ করতে হবে। রাস্তায় অটোরিকশার সাথে গ্যাঞ্জাম হলে ক্ষয়ক্ষতি দেখার আগে জিজ্ঞেস করব, মামা, আপনার ফলোয়ার কত?