একটি গাছ থেকে মিলছে খাবার, পানীয়, তেল, দড়ি, জ্বালানি, ঘরের উপকরণ এমন গাছ পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। অথচ নারিকেল গাছের ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রায় আক্ষরিক অর্থেই সত্যি। ফল থেকে পাতা, ছোবড়া থেকে খোল, এমনকি গাছের কাণ্ডও মানুষের নানা কাজে লাগে। তাই বিশ্বের বিভিন্ন উষ্ণ ও উপকূলীয় অঞ্চলে নারিকেল গাছ পরিচিত হয়েছে ‘ট্রি অব লাইফ’ বা ‘জীবনের গাছ’ নামে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও-ও নারিকেলের বহুমুখী ব্যবহারের কারণে এই নামটি উল্লেখ করেছে।
একটি ফল, নাকি পুরো জীবনের সহায়?
নারিকেলকে শুধু একটি ফল হিসেবে দেখলে এর গুরুত্বের একটা ছোট অংশই দেখা হয়। কাঁচা নারিকেলের পানি তৃষ্ণা মেটায়, নরম শাঁস খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরিণত নারিকেলের শাঁস থেকে তৈরি হয় নারিকেল দুধ ও তেল। শুকিয়ে তৈরি করা হয় কপরা, যা নারিকেল তেল উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। এই তেল খাবার তৈরির পাশাপাশি সাবানসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্য তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। এছাড়া এর শুকনো খোসা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহা করা যায়। অর্থাৎ, একই গাছের একটি ফলই খাবার থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল পর্যন্ত নানা ভূমিকা পালন করে।
ছোবড়া ফেলে দেওয়া হয় না
নারিকেলের শক্ত বাইরের অংশের নিচে থাকা ছোবড়াও অত্যন্ত মূল্যবান। এই ছোবড়া থেকে পাওয়া যায় নারিকেলের আঁশ। এই আঁশ দিয়ে দড়ি, মাদুর, ব্রাশ, ঝুড়ি, ব্যাগ ও বিভিন্ন ধরনের গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরি করা হয়। নারিকেলের ছোবড়ার গুঁড়া কৃষি ও বাগানচর্চাতেও ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ, যে অংশটিকে আমরা সাধারণত বর্জ্য হিসেবে দেখি, সেটিও হয়ে উঠতে পারে অর্থনৈতিক সম্পদ।
খোল থেকেও জ্বলে আগুন
নারিকেলের শক্ত খোলও অপ্রয়োজনীয় নয়। এটি জ্বালানি ও কয়লা তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। বিশেষ প্রক্রিয়ায় নারিকেলের খোল থেকে তৈরি করা সম্ভব অ্যাক্টিভেট কার্বন, যা বিভিন্ন ধরনের ফিল্টার ও শোষক উপাদান তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ফলে নারিকেল খাওয়ার পর যে খোলটি ফেলে দেওয়া হয়, সেটিও শিল্প ও জ্বালানি ব্যবস্থায় কাজে লাগতে পারে।
আরও পড়ুন
মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে শাড়ি-স্যান্ডেল পরে ম্যারাথনে মা
পাতাও হয়ে যায় ঘরের উপকরণ
নারিকেল গাছের লম্বা পাতারও রয়েছে বহু ব্যবহার। ঐতিহ্যবাহী সমাজে নারিকেলের পাতা দিয়ে ঘরের ছাউনি, ঝুড়ি ও নানা ধরনের বোনা সামগ্রী তৈরি করা হয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপাঞ্চলের অনেক মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কারুশিল্পের সঙ্গে এই পাতার ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। সামোয়ার মতো অঞ্চলে গাছটির প্রায় প্রতিটি অংশই মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত।
কাণ্ডও মূল্যবান
নারিকেল গাছের ব্যবহার শুধু ফল, পাতা বা ছোবড়াতেই শেষ নয়। পুরনো বা উৎপাদনক্ষমতা হারানো গাছের কাণ্ড থেকেও কাঠ পাওয়া যায়। এই কাঠ দিয়ে ঘরবাড়ির বিভিন্ন অংশ, আসবাব, নৌকা এবং অন্যান্য কাঠের সামগ্রী তৈরি করা সম্ভব। এফএও-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভিন্ন দ্বীপে নারিকেল গাছের কাঠ ঐতিহাসিকভাবে নৌকা ও নির্মাণকাজেও ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ একটি নারিকেল গাছ তার জীবনের শেষ পর্যায়েও মানুষের কাজে আসতে পারে।
শুধু পণ্য নয়, জীবিকারও উৎস
নারিকেল গাছের ‘ট্রি অব লাইফ’ পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ সম্ভবত এর অর্থনৈতিক ভূমিকা। বিশ্বের উষ্ণ অঞ্চলের বহু ছোট কৃষক ও পরিবার নারিকেল চাষের ওপর নির্ভরশীল। নারিকেল থেকে তেল, আঁশ, খাবার, পানীয় ও বিভিন্ন পণ্য তৈরির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান। এফএও নারিকেলকে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ফসল হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং জানিয়েছে, এর বিভিন্ন পণ্য বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত।
আরও পড়ুন
গোপাল ভাঁড় দেখতে দেখতে ভাত খাওয়ার ট্রেন্ড কীভাবে এলো?
তাই ‘ট্রি অব লাইফ’ নামটি এত অর্থবহ
নারিকেল গাছের বিশেষত্ব শুধু এই নয় যে এটি অনেক কিছু দেয়। এর বিশেষত্ব হলো গাছটির প্রায় প্রতিটি অংশেরই ব্যবহার খুঁজে পাওয়া যায়। ফল দেয় খাবার ও পানীয়, শাঁস দেয় তেল, ছোবড়া দেয় আঁশ, খোল দেয় জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামাল, পাতা দেয় ঘর ও কারুশিল্পের উপকরণ, আর কাণ্ডও হয়ে ওঠে নির্মাণসামগ্রী।
এই বহুমুখী ব্যবহার, মানুষের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের অবদানই নারিকেলকে ‘ট্রি অব লাইফ’, ‘ট্রি অব অ্যাবুডেন্স’ বা ‘জীবনের গাছ’ নামে পরিচিত করেছে।
দূর থেকে দেখতে নারিকেল গাছ হয়তো আর পাঁচটি গাছের মতোই একটি গাছ। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি আসলে একটি ছোট্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে গাছের প্রায় কোনও অংশই অকারণে নষ্ট হওয়ার কথা নয়। আর এই কারণেই উষ্ণ অঞ্চলের মানুষের কাছে নারিকেল শুধু একটি ফলের গাছ নয়, বরং বহু প্রজন্মের জীবনযাত্রার সঙ্গী।
কেএসকে