সম্প্রতি এক ইসলামি আলোচনা অনুষ্ঠানে এক ব্যক্তি নোমান আলী খানকে প্রশ্ন করেন, আমাদের জীবনে যে সব কষ্ট, সংকট বা পরীক্ষা আসে এগুলোকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? অনেক সময় আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, এগুলো কি আমাদের অতীত কোনো ভুলের শাস্তি, নাকি আল্লাহর পরীক্ষা?
উত্তরে নোমান আলী খান বলেন:
আমাদের দুনিয়ার জীবন কখনো একটানা মসৃণ বা শুধু সুখে ভরা হয় না। জীবনে যেমন ভালো সময় আসে, তেমনি আঘাত ও বিপর্যয়ও আসে। তবে সংকট যখন বারবার আসে বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন মানুষ ভেঙে পড়ে এবং ভাবতে শুরু করে, ‘আমার সাথেই কেন এমন হচ্ছে? আমি কোন পাপের সাজা পাচ্ছি?’
কোরআনে এই বিষয়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দুই ধরনের পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, এমন কিছু পরিস্থিতি বা ঘটনা, যেখানে মানুষের নিজেদের অহংকার, হিংসা কিংবা অপরকে ছোট করার মনোভাব জড়িত থাকে। সুরা কাহাফের সেই দুই ব্যক্তির বাগানের ঘটনাটি দারুণ এক দৃষ্টান্ত। তাদের একজন অন্যজনকে নিজের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির বড়াই দেখিয়ে খাটো করছিল। সে ভেবেছিল, তার এই প্রাচুর্য কখনো শেষ হবে না। ফলে পরিণতিতে তার সমস্ত বাগান ও সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেল। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, কাউকে হেয় করলে বা অহংকার করলে তার পরিণতি এই দুনিয়াতেই বিপর্যয় হিসেবে নেমে আসতে পারে।
আরও পড়ুন
ড. ইয়াসির ক্বাদি / কনস্টান্টিনোপল জয়ের ভবিষ্যদ্বাণী, প্রথম অভিযানে ব্যর্থতার করুণ ইতিহাস
তবে এর অন্য একটি দিকও আছে, যাকে আমরা ‘আত্মশুদ্ধি’ বা ভেতরের মলিনতা দূর করার প্রক্রিয়া বলতে পারি। অনেক সময় মানুষের অন্তরে ধন-সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত মোহ বা দম্ভ জমা হয়। বাহ্যিকভাবে হয়তো এটাকে বড় কোনো অপরাধ মনে হয় না। কিন্তু অন্তরের এই ব্যাধি মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। এমন অবস্থায় যখন কোনো বড় ক্ষতি বা সংকট আসে, তখন মানুষের সেই ভুল ভাঙার সুযোগ তৈরি হয়। সে অনুধাবন করতে পারে যে, জাগতিক কোনো কিছুর ওপরই চূড়ান্ত ভরসা করা যায় না। তাই আপাতদৃষ্টিতে যাকে আমরা বড় বিপর্যয় মনে করছি, তা হয়তো অন্তরের পরিশুদ্ধিরও একটা উপায়।
দ্বিতীয়ত, যেসব বিপদে মানুষের নিজের কোনো হাত বা নিয়ন্ত্রণ থাকে না। যেমন আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সড়ক দুর্ঘটনা, কোনো গুরুতর ব্যাধি কিংবা আচমকা চাকরি হারিয়ে ফেলা। এসব ক্ষেত্রে মানুষ নিজের শত চেষ্টা সত্ত্বেও পরিস্থিতি বদলাতে পারে না। ইসলামে এই ধরনের ঘটনাগুলোকে বলা হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা পরীক্ষা। এগুলোর মাধ্যমে আপনার ইমান ও ধৈর্য যাচাই করা হয়।
এখানে একটি বিষয়ে আমাদের ভীষণ সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো সাধারণ মানুষের জন্য কখনোই আল্লাহর প্রতিনিধি হয়ে কারো বিপদকে ‘আল্লাহর গজব’ বা ‘শাস্তি’ বলে ফতোয়া দেওয়া উচিত নয়। অনেক সময় দেখা যায়, কারো বড় কোনো ক্ষতি হলে, যেমন সন্তানসম্ভবা নারীর সন্তান নষ্ট হলে বা কারো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে মানুষ মন্তব্য করে বসে, ‘অমুক অন্যায়ের কারণে এই শাস্তি হয়েছে।’ এটি অত্যন্ত জঘন্য আচরণ। কারো কষ্টের সুনির্দিষ্ট কারণ জানার কোনো গায়েবি জ্ঞান আমাদের দেওয়া হয়নি। তাই আল্লাহর নামে বানিয়ে এমন কথা বলা বিরাট অপরাধ।
যে কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় হলো, নিজের দায়িত্বটুকু সততার সঙ্গে পালন করা। যেসব ক্ষেত্রে আমাদের সরাসরি গাফিলতি বা ভুলের কারণে ঘটে যেমন না পড়ে পরীক্ষা দিয়ে ফেল করা কিংবা বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটানো ইত্যাদি, সেসব ক্ষেত্রে নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে আল্লাহর ওপর দায় চাপানো ভুল। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে আমাদের কোনো হাত নেই, সেসব ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরা ও আত্মোপলব্ধির চেষ্টা করা উচিত। সব ধরনের অহংকার, অন্যকে তুচ্ছ ভাবা, অন্যের ওপর অপবাদ দেওয়া ইত্যাদি থেকে বেঁচে থেকে নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা উচিত।
সূত্র: নোমান আলী খানের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল
আরও পড়ুন
‘না দেখেই আমাকে ভাই বলেছিলেন রাসুল (সা.)’ কেন বললেন আজহারী?
ওএফএফ