
৮০ হাজার বছর! সংখ্যাটা হজম করতে আপনার হয়তো একটু সময় লাগতে পারে। একটু হিসাব কষে দেখুন, আজ থেকে ঠিক ৮০ হাজার বছর আগে মানুষ সবেমাত্র নিয়ানডার্থালদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জঙ্গলে টিকে থাকার কায়দাকানুন শিখছে। আর এখন? ঠিক এত দীর্ঘ এক সময়ের জন্য মহাকাশে একটি যান পাঠানোর প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হচ্ছে, যার টিকিট কাটা হচ্ছে ২০২৯ সালের জন্য! গন্তব্য আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী নক্ষত্রজগৎ আলফা সেন্টাউরি।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মহাকাশযানের গন্তব্যে পৌঁছানো উদ্যাপন করার জন্য পৃথিবীতে আমি, আপনি বা এই প্রজেক্টের কারিগরদের কেউই বেঁচে থাকবেন না। এমনকি মানবজাতি আদৌ টিকে থাকবে কি না, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবুও ফার্মি এক্সপ্লোরার মিশন নামে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এই দুঃসাহসিক উদ্যোগ নিয়েছে। একে আসলে পাগলামি বললেও খুব একটা ভুল বলা হয় না!
ফার্মি এক্সপ্লোরার মিশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট ফিলিপ জনস্টনের ভাষায়, ‘আমরা এই যাত্রার প্রথম হতে চাই, আবার গন্তব্যে পৌঁছানো শেষ দলও হতে চাই। এই দীর্ঘ যাত্রা যখন শেষ হবে, তখন আমাদের কেউই থাকব না—এটাই হলো এই মিশনের মূল সৌন্দর্য।’
অর্থাৎ, মহাশূন্যে এমন একটি স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়ে যাওয়া, যার ফসল হয়তো ৮০ হাজার প্রজন্ম পরের কেউ দেখবে।
দীর্ঘ সময়ের জন্য মহাকাশে একটি যান পাঠানোর প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হচ্ছে, যার টিকিট কাটা হচ্ছে ২০২৯ সালের জন্য! গন্তব্য আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী নক্ষত্রজগৎ আলফা সেন্টাউরি।
আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র হওয়া সত্ত্বেও আলফা সেন্টাউরির দূরত্ব প্রায় ৪.৪ আলোকবর্ষ। আলোর গতিতে ছুটলেও সেখানে পৌঁছাতে লাগবে সাড়ে চার বছরের বেশি। কিন্তু মানুষের তৈরি যান তো আর আলোর বেগে ছুটতে পারে না। তাই এই দীর্ঘ যাত্রায় পাঠানো হচ্ছে খুব ছোটখাটো আকারের একটি যান, পৃথিবীতে যার ওজন হবে মেরেকেটে ১০০ থেকে ২০০ কেজির মতো। এটি অন্তত এক কেজি ওজনের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সঙ্গে নিয়ে যাবে।
আপনার মনে হতেই পারে, নাসার ভয়েজার-১ কিংবা ভয়েজার-২ তো আগেই সৌরজগত ছাড়িয়ে অনন্ত অসীমে পাড়ি জমিয়েছে। তাহলে এই মিশন নিয়ে এত মাতামাতি কেন? আসলে ব্যাপারটা হলো, ভয়েজার যানগুলো নির্দিষ্ট কোনো নক্ষত্রের দিকে তাক করে ছোড়া হয়নি।

বৃহস্পতি ও শনির মতো গ্রহগুলোর পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় মহাকর্ষীয় ধাক্কা খেয়ে সেগুলো এখন মহাশূন্যে উদ্দেশ্যহীন ভবঘুরের মতো ভাসছে। কিন্তু ফার্মি এক্সপ্লোরারই হবে পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম মহাকাশযান, যা একেবারে নিখুঁত নিশানায় সরাসরি অন্য একটি নক্ষত্রের দিকে ছুটে যাবে।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য এই যানে প্রচলিত রাসায়নিক জ্বালানির বদলে ব্যবহার করা হবে বিদ্যুৎ-চালিত প্রোপালশন সিস্টেম। এর আগে ব্রেকথ্রু স্টারশট নামে একটি মেগা-প্রকল্প লেজার রশ্মি ব্যবহার করে আলোর গতির ২০ শতাংশ বেগে মহাকাশযান পাঠানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো সেই প্রযুক্তি বাস্তবে মুখ থুবড়ে পড়ে। তাই ফার্মি এক্সপ্লোরার কোনো কাল্পনিক বা আজগুবি প্রযুক্তির অপেক্ষায় না থেকে, বর্তমানে পরীক্ষিত ও সফল বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন দিয়েই কাজ সেরে ফেলার একটি স্মার্ট পরিকল্পনা করেছে।
মানুষের তৈরি যান তো আর আলোর বেগে ছুটতে পারে না। তাই এই দীর্ঘ যাত্রায় পাঠানো হচ্ছে খুব ছোটখাটো আকারের একটি যান, পৃথিবীতে যার ওজন হবে মেরেকেটে ১০০ থেকে ২০০ কেজির মতো।
মহাকাশ গবেষণার কথা শুনলেই মনে হয় কোটি কোটি ডলারের বাজেট আছে। কিন্তু চমৎকার বিষয় হলো, পুরো ফার্মি এক্সপ্লোরার মিশনটি শেষ করার জন্য বাজেট ধরা হয়েছে মাত্র দেড় কোটি ডলারের কম। মাত্র বলার কারণ, মহাকাশ মিশনের জন্য এটা সত্যিই অনেক কম। সম্প্রতি যে ন্যন্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠানো হলো, তার বাজেট প্রায় ৪০০ কোটি ডলার। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের বাজেট ছিল ১০০০ কোটি ডলার। আর্টেমিস ২ মিশনে অন্তত ৪১০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে। সুতরাং এসব মিশনের খরচেয় তুলনায় দেড় কোটি ডলার খুব সামান্যই!

এরই মধ্যে একটি স্বনামধন্য স্যাটেলাইট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এই বাজেটের মধ্যেই কাজ করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রজেক্টের পেছনে থাকা মানুষগুলোও সাধারণ কেউ নন। স্টারক্লাউড নামে একটি মহাকাশ ডেটা সেন্টার কোম্পানির সিইও ফিলিপ জনস্টন এবং তাঁর দুই সহপ্রতিষ্ঠাতা এজরা ফেইল্ডেন ও আদি ওল্ডিয়ান মিলে এটি শুরু করেছেন। মিশনটির দৈনন্দিন কাজ তদারকির দায়িত্বে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা গ্যারেট জেমিসন। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ব্লু অরিজিনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রব মেয়ারসন এবং গ্রহাণু থেকে খনিজ উত্তোলনের কোম্পানি অ্যাস্ট্রোফোর্জের সিইও ম্যাট জিয়ালিচের মতো মহারথীরা।
জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের বাজেট ১০০০ কোটি ডলার। আর্টেমিস ২ মিশনে অন্তত ৪১০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে। সুতারং এসব মিশনের খরচেয় তুলনায় দেড় কোটি ডলার খুব সামান্যই!
কিন্তু এত কাঠখড় পুড়িয়ে, এত বছর ধরে একটা যান পাঠিয়ে আসলে লাভ কী? এই প্রশ্নের উত্তর পাবেন বিখ্যাত ফার্মি প্যারাডক্সে। ১৯৫০ সালে পদার্থবিদ এনরিকো ফার্মি আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা খটকা লাগা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন, ‘সবাই কোথায়?’ মহাবিশ্বে এত এত গ্রহ, অথচ ভিনগ্রহের কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর দেখা কেন মিলছে না? গত এক দশকে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, আমাদের গ্যালাক্সিতে বাসযোগ্য গ্রহের কোনো অভাব নেই। তাহলে এলিয়েনরা কোথায়?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে তিনটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, মহাবিশ্বে মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণী খুবই বিরল। দ্বিতীয়ত, বুদ্ধিমান প্রাণী হয়তো গড়ে ওঠে, কিন্তু তারা বেশিদিন টেকে না। হয়তো নিজেদের তৈরি করা অস্ত্র বা প্রযুক্তি দিয়ে নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যায়। তৃতীয় কারণটি হলো, এলিয়েনদের অভাব নেই। এমনকি তারা দিব্যি বেঁচেবর্তেও আছে, কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে তারা আমাদের এড়িয়ে চলছে!
মহাবিশ্বে মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণী খুবই বিরল। দ্বিতীয়ত, বুদ্ধিমান প্রাণী হয়তো তৈরি হয়, কিন্তু তারা বেশিদিন টেকে না। হয়তো নিজেদের তৈরি করা অস্ত্র বা প্রযুক্তি দিয়ে নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যায়।
ফার্মি এক্সপ্লোরার মিশন হয়তো এলিয়েনদের সদর দরজায় কড়া নেড়ে এই রহস্যের শতভাগ সমাধান করবে না, কিন্তু এটি একটি বড় ইতিহাস তৈরি করবে। মহাবিশ্বের অন্তত একটি প্রাণী, অর্থাৎ মানুষ যে তাদের বাজেটের মধ্যে থেকেই অন্য নক্ষত্রে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, সেই রেকর্ড অন্তত মহাকাশের খাতায় লেখা থাকবে। মজার ব্যাপার হলো, একটি অলাভজনক উদ্যোগ হওয়ায় যে কেউ চাইলে অনুদান দিয়ে এই ঐতিহাসিক মিশনের অংশ হতে পারবেন। ২০২৯ সালে যখন এই যানটি উৎক্ষেপণ করা হবে, তখন আপনি অন্তত এই ভেবে স্বস্তি পেতে পারেন যে, মানবজাতির রেখে যাওয়া একটি ছোট্ট পার্সেল ৮০ হাজার বছর ধরে মহাকাশের ঠিকানায় ডেলিভারি হওয়ার অপেক্ষায় ছুটে চলেছে।
হয়তো হাজার হাজার বছর পর আলফা সেন্টাউরির কোনো বাসিন্দা এই যানটি পেয়ে বিরক্ত হয়ে বলবে, ‘পৃথিবী থেকে একটা ডেলিভারি আসতে এত বছর লাগে!’