মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে আপন বড় ভাইয়ের পা কেটে পঙ্গু করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সিদ্দিক মোল্লা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় মামলা হলেও আসামিরা গ্রেফতার না হওয়ায় এক বছর পর একই বিরোধের জেরে আরেক ভাইয়ের ছেলে ও প্রবাসী ইলিয়াস মোল্লাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার পরিবার।
এ ঘটনায় গ্রেফতার চার আসামির মধ্যে একজন জামিনে বেরিয়ে এসে নিহতের পরিবারকে মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন নিহত ইলিয়াস মোল্লার স্ত্রী লিপি বেগম। সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের অন্য সদস্যদের পাশাপাশি হামলায় পঙ্গু হয়ে যাওয়া ইলিয়াসের চাচা ইসহাক মোল্লাও উপস্থিত ছিলেন।
লিপি বেগমের অভিযোগ, সিরাজদিখান থানার কোলা ইউনিয়নের পূর্ব কোলাগ্রামের বাসিন্দা সিদ্দিক মোল্লা জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত এক মামলার আসামি ছিলেন। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠালেও পরে তিনি জামিনে বেরিয়ে আসেন।
এরপর জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে ২০২৫ সালের ৮ মার্চ সিদ্দিক মোল্লা ও তার পরিবারের সদস্যরা ইসহাক মোল্লার ওপর হামলা করেন বলে অভিযোগ করেন লিপি। এ সময় দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ইসহাকের ডান পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এতে তিনি স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যান।
লিপি বেগম বলেন, ওই ঘটনায় ইসহাক মোল্লা মামলা করলেও আসামিদের কাউকে এক দিনের জন্যও গ্রেফতার করা হয়নি। এমনকি পুলিশের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে মামলার অভিযোগপত্র থেকে মূল আসামিদের নাম বাদ দেওয়ারও অভিযোগ করেন তিনি।
আরও পড়ুন
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে প্রথম দিনেই টাকা ফেরত চাইলেন ১৮ হাজার গ্রাহক
তাদের অভিযোগ, ওই ঘটনার প্রায় এক বছর পর গত ১৯ জুন একই বিরোধের জেরে ইলিয়াস মোল্লাকে হত্যা করা হয়।
লিপি বেগম আরও বলেন, তার স্বামী ইলিয়াস মোল্লা মালয়েশিয়া প্রবাসী ছিলেন। বিরোধের মীমাংসা করে দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলেন তিনি। ঘটনার দিন ইলিয়াস তার পঙ্গু চাচা ইসহাক মোল্লাকে হুইলচেয়ারে করে রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় একটি অটোতে করে এসে সিদ্দিক মোল্লা, তার স্ত্রী রওশন আরা এবং দুই ছেলে বিপ্লব মোল্লা ও বিদ্যুৎ মোল্লা ইলিয়াসের ওপর হামলা চালান।
তিনি বলেন, হামলাকারীরা রামদা দিয়ে ইলিয়াসকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। এতে তার হাতের রগ কেটে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়। একই সময় হুইলচেয়ারে থাকা ইসহাক মোল্লাকেও কুপিয়ে তার ডান হাতের দুটি আঙুল কেটে দেওয়া হয়। তাকেও শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করা হয়।
লিপি বেগম আরও অভিযোগ করেন, হামলার সময় স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসতে চাইলে হামলাকারীরা অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বলেন- যে আসবে, তাকেই মেরে ফেলবো।
পরে গুরুতর আহত ইলিয়াস ও ইসহাককে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ইলিয়াসকে হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুন তার মৃত্যু হয়।
ইলিয়াস হত্যার ঘটনায় সিরাজদিখান থানায় মামলা করা হয়েছে জানিয়ে লিপি বেগম বলেন, মামলার পর একে একে বিপ্লব মোল্লা, বিদ্যুৎ মোল্লা, সিদ্দিক মোল্লা ও রওশন আরাকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
আরও পড়ুন
ঘুষ নেওয়া ও পলায়নের অভিযোগে তিন পুলিশ কর্মকর্তা বরখাস্ত
তবে গ্রেফতারের প্রায় এক মাসের মধ্যে রওশন আরা জামিনে বেরিয়ে আসেন বলে জানান লিপি। তার অভিযোগ, জামিনে বের হওয়ার পর থেকেই রওশন আরা তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছেন। মামলা প্রত্যাহার না করলে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে লিপি বেগম আরও অভিযোগ করেন, সিদ্দিক মোল্লা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে এর আগেও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাদের হাতে এক গৃহকর্মী ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন এবং আসিফ নামের আরেক যুবকও হত্যার শিকার হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অভিযুক্তরা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে চলছেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভয় পান না।
লিপি বেগম বলেন, আমরা স্বামী হত্যার বিচার চাই। পুলিশ যেন কোনো প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার না করে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে আদালতে সঠিক চার্জশিট দেয়। দ্রুত বিচার না হলে তারা আরও হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে।
পরিবারটির পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিহত ইলিয়াস মোল্লার হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
টিটি/কেএসআর