এক দশক পর মিশর সফরে গিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় কায়রো পৌঁছান শি জিনপিং। সেখানে তাকে স্বাগত জানান মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। দুই দেশের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারত্বকে নতুনভাবে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই চীনা প্রেসিডেন্টের এ সফর বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশ তাদের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে পারস্পরিক লাভে রূপ দিতে চাইছে। আফ্রিকায় আরও শক্তিশালী শিল্প ও লজিস্টিক অবস্থান তৈরি করতে চায় বেইজিং। অন্যদিকে, চীনা পুঁজি, প্রযুক্তি ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ চায় কায়রো।
তবে, কায়রোকে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। ট্যাংগেন বলেন, কায়রোর জন্য চ্যালেঞ্জ হলো- ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখেই এই সুযোগ কাজে লাগানো।
বেইজিংভিত্তিক বিশ্লেষক আইনর ট্যাংগেন আনাদোলু এজেন্সিকে বলেন, কায়রো শুধু চীনা পণ্য আমদানি এবং চীনা অর্থায়নে অবকাঠামো নির্মাণের ওপর ভিত্তি করে থাকা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। মিশর এমন চীনা পুঁজি, প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থা চায়, যা দেশটির নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
একইভাবে আফ্রিকায় অবস্থান দৃঢ় করার সুযোগ দেখছে বেইজিং। ট্যাংগেন বলেন, মিশরে কোনো সামরিক জোট গঠনের জন্য আসছেন না শি। তিনি এমন একটি অংশীদারত্ব জোরদার করতে এসেছেন, যা পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক দক্ষিণের অর্থনীতিতে মিশরকে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পোৎপাদনকারী দেশে পরিণত করতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর আফ্রিকা প্রকল্পের পরিচালক রিকার্দো ফাবিয়ানি বলেন, প্রতীকী দিক থেকে এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রভাব কমাতে মিশর তার বৈদেশিক সম্পর্ক বহুমুখী করার কৌশল অনুসরণ করছে এবং এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে চীন এর একটি বড় অংশ।
চীন-মিশর সম্পর্ক: বাণিজ্য থেকে উৎপাদন
শি জিনপিংয়ের সফরে অর্থনৈতিক সম্পর্কই মূল বিষয় হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি, শিল্প বিনিয়োগ এবং সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে চীনের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি পাওয়ার চেষ্টা করবে কায়রো।
ফাবিয়ানি বলেন, মিশর মনে করে, উৎপাদন কারখানায় চীনা বিনিয়োগ দেশটির উন্নয়নের জন্য বড় সুযোগ হতে পারে। একইভাবে, তারা চীনা প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তরের সুযোগও চায়, যার মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতও রয়েছে।
তবে, বৃহত্তর অর্থনৈতিক লক্ষ্য হলো চীনের উৎপাদন সক্ষমতাকে মিশরে নিয়ে আসা।
চীনের প্রভাব বিস্তারের উদ্যোগ
মিশরে বেইজিংয়ের আগ্রহ বৈশ্বিক দক্ষিণজুড়ে অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
ট্যাংগেনের মতে, সুয়েজ খাল গুরুত্বপূর্ণ হলেও চীনের আগ্রহ শুধু নৌপরিবহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চীনের লক্ষ্য হলো সুয়েজ খাল অর্থনৈতিক অঞ্চলকে একটি শিল্প-পরিবেশব্যবস্থায় পরিণত করা-যেখানে উৎপাদন, লজিস্টিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পুনঃরপ্তানি থাকবে।
তার মতে, এটি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের পরবর্তী পর্যায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই পর্যায়ে অবকাঠামোর পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি এবং সরবরাহব্যবস্থার একীভূতকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে চীনকে আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের বাজারে প্রবেশের সুযোগ, ইউরোপের কাছাকাছি অবস্থান, বড় শ্রমশক্তি এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ দিতে পারে।
ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য
সফরে প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা চীন ও মিশরের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সামরিক চুক্তির সম্ভাবনা দেখছেন না।
সহযোগিতা যদি অর্থনৈতিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ওয়াশিংটনের উদ্বিগ্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে এই সফরে যদি বড় ধরনের কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে মিশরের ক্রমবর্ধমান অংশীদারত্ব দেশটির দীর্ঘদিনের কৌশলগত মার্কিন সম্পর্কের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
ফাবিয়ানি বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোন বিষয়গুলোকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচনা করে, মিশর তা জানে। তারা চীন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করবে না কিংবা এমন সামরিক সম্পর্কও গড়ে তুলবে না যা ওয়াশিংটনকে উদ্বিগ্ন করে তুলতে পারে।
সম্ভাব্য ফলাফল
ট্যাংগেনের মতে, সফরের সম্ভাব্য ফলাফল মূলত অর্থনৈতিক হতে পারে। এর একটি ক্ষেত্র হলো আর্থিক সহযোগিতা। তার মতে, ৩০ বিলিয়ন ইউয়ানের একটি মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা দুই দেশের বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে চীনা মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর ভিত্তি তৈরি করেছে।
ডলারে নির্ধারিত ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং অর্থায়নের উৎস বহুমুখী করতে কায়রো ইউয়ানভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়াতে পারে। তবে, চীন মিশরের বিদ্যমান সব ঋণ পুনঃঅর্থায়ন করবে-এমন সম্ভাবনা কম।
আরেকটি ক্ষেত্র হলো সুয়েজ খাল অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প বিনিয়োগ, বিশেষ করে প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী প্রকল্প। আর তৃতীয় ক্ষেত্র হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি অবকাঠামো।
কেএম