দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় ১৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি প্রকল্প সরকারি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি ‘স্ট্রেনদেনিং অ্যাগ্রিকালচারাল টারশিয়ারি এডুকেশন প্রজেক্টের (এসএটিইপি)’ আওতায় কৃষি উচ্চশিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি শিক্ষা ও গবেষণা জোরদার এবং কৃষিশিল্পের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে (বাকৃবি) কৃষি গবেষণার উৎকর্ষকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক গবেষণা ও জ্ঞান হাব হিসেবে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতেও সহায়তা দেওয়া হবে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সঙ্গে এডিবির প্রতিনিধিদলের এক পরামর্শ সভায় এ তথ্য জানানো হয়। ইউজিসি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের সভাকক্ষে এসএটিইপি নিয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এরমধ্যে এডিবি ১০৫ মিলিয়ন এবং কোরিয়া এক্সিম ব্যাংক/ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (কেএক্সিম/ইডিসিএফ) ৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়ন করবে। অবশিষ্ট অর্থ বাংলাদেশ সরকার বহন করবে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০২৭ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় কৃষি উচ্চশিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কৃষি শিক্ষাকে শিল্প ও কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পাশাপাশি আধুনিক ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে।
উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা, আধুনিক গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন, পাঠক্রম ও একাডেমিক কাঠামোর আধুনিকায়ন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং শিক্ষক ও গবেষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষি গবেষণা সংক্রান্ত একটি আধুনিক ইন্সট্রুমেন্টেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে। এ কেন্দ্রের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশগত বিভিন্ন বিষয়ে আধুনিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও গবেষণার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পের আওতায় কৃষি গবেষণা ও শিক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হবে। রিমোট সেন্সিং, জিপিএস, জিআইএস, ড্রোন, ডিজিটাল টুইন, ওয়েদার অ্যানালিটিকস, বিগ ডেটা অ্যানালিটিকস, বায়োটেকনোলজি ও রোবটিকসের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবনের ফলাফলকে কৃষি খাত ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা। গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ, কৃষিশিল্পের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর অংশীদারত্ব এবং গবেষণা-শিল্প-উদ্যোক্তা সংযোগ জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রি-স্টার্ট-আপ, স্টার্ট-আপ ও ইনকিউবেশন সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সভায় এডিবির সিনিয়র সোশ্যাল সেক্টর ইকোনমিস্ট ও মিশন লিডার রিওতারো হায়াশি বলেন, আন্তর্জাতিক র্যাংকিং বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা ও গবেষণার সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অন্যান্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কেও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ করা হবে। গবেষণা, উদ্ভাবন, শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং স্টার্ট-আপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলাও প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।
তরুণদের কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রি-স্টার্ট-আপ থেকে শুরু করে স্টার্ট-আপ ও ইনকিউবেশন পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, এডিবির প্রস্তাবিত প্রকল্পটি দেশের কৃষি, উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নে ইউজিসি কাজ করছে।
তিনি বলেন, দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বিদ্যমান সক্ষমতার বৈষম্য কমিয়ে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান আরও বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য শুধু তরুণদের সরকারি বা প্রচলিত চাকরির উপযোগী করে গড়ে তোলা নয়; তাদের একটি অংশকে দক্ষ উদ্যোক্তা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এ জন্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্টার্ট-আপ, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
তিনি বলেন, কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাদি জমি কমে যাওয়া এবং খাদ্য ও পুষ্টির ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও গবেষণা আরও বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ইউজিসি, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, প্রকল্পটি শিক্ষার্থীদের আধুনিক দক্ষতায় দক্ষ করে কর্মবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সভায় ইউজিসির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান ভূঁইয়া, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্পটির ফোকাল পয়েন্ট অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামসুল আলম ভূঁইয়া, ইউজিসির অতিরিক্ত পরিচালক সুরাইয়া ফারহানাসহ ইউজিসি, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও এডিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এএএইচ/এমএএইচ/