দেশে সাম্প্রতিক সময়ের নজিরবিহীন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের পেছনে বিগত দেড় যুগের ‘ভুল নীতি’ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের আকস্মিক অস্থিরতাকে দায়ী করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুলের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
সংসদে তিনি বলেন, গত ৯ আগস্ট দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল, যা গত ৫৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সংকটের এই চিত্র তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নিছক কথামালার আড়ালে সত্য লুকানোর কোনো সুযোগ নেই।
জনগণের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও সাময়িক কষ্টের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কারিগরি সমস্যার সমাধান এবং সরকারের নেওয়া নতুন পদক্ষেপের ফলে আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির লক্ষণীয় উন্নতি হবে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াট হলেও এ পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি আমদানি মিলিয়ে বর্তমানে দৈনিক ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে পুরো গ্যাস সরবরাহ করা হলে শিল্প ও আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে। তাই সার্বিক অর্থনীতি সচল রাখতে শিল্প, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি- এই তিন খাতের মধ্যে বাধ্য হয়ে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
কারিগরি বিপর্যয় ও বিদ্যুৎ আমদানির ঘাটতির তথ্য তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১৬ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট বর্তমানে কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া আদানির সঙ্গে করা আগের চুক্তি অনুযায়ী ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে দিনে ৯০০ এবং রাতে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
এর মধ্যে গত ২১ জুলাই আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহকারী দুটি এফএসআরইউর (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) একটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। তবে বর্তমানে সংকটের প্রায় ৮৮ শতাংশই সমাধান করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আরেকটি এফএসআরইউ স্থাপনের চুক্তি বাতিল না হলে আজকের এই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের চাহিদা পূরণে দ্রুততম সময়ে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে নতুন এই এফএসআরইউ চালু করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতির লক্ষণীয় উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেন, আগস্ট মাসের বিদ্যুৎ সংকটের কষ্ট যেন সেপ্টেম্বর মাসে পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের নেওয়া নতুন রুফটপ সোলার পলিসি এবং অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সমন্বিত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ফলে আগামী গ্রীষ্মে দেশের মানুষকে বিদ্যুৎ সংকটজনিত এমন কষ্টে আর ভুগতে হবে না।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার মূলত স্বল্পমেয়াদি সমাধানের বিষয়েই কাজ করছে। গত ২১ জুলাই আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহকারী এফএসআরইউটি নষ্ট হয়ে যায়। পরে গত ১৫ আগস্ট সেটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা সম্ভব হয়েছে। তবে এ ঘটনায় জ্বালানি সরবরাহের পুরো শৃঙ্খলে যে বিপর্যয় তৈরি হয়েছিল, তা এখনো শতভাগ স্বাভাবিক হয়নি। বর্তমানে ৮৮ শতাংশ সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছে। চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতেই এটি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকরাও পর্যাপ্ত জ্বালানি পাবেন। এতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে।
তবে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি থাকায় সরকার ফার্নেস অয়েল বা এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসব কেন্দ্র থেকে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এসব কেন্দ্র ‘পিকিং পাওয়ার প্লান্ট’ হওয়ায় একটানা চালানো সম্ভব নয় এবং এগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ।
সে হিসাবে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। এর মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন। বিগত সরকারের সময় ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জমে থাকা বকেয়াসহ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৪৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এ সংকট সামাল দিতে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। দ্রুত এসব অর্থ ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পরিশোধ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া মাতারবাড়ী ও পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বর্তমানে কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে। এগুলো যাতে দ্রুততম সময়ে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারে, সে বিষয়ে সরকার কঠোর নজরদারি করছে।
স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাত ৮টার পর বিপণিবিতান ও দোকানপাট বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়নে সব সংসদ সদস্যকে নিজ নিজ এলাকায় সহযোগিতা করতে হবে।
অমিত বলেন, মধ্যমেয়াদি সমাধানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে ‘রুফটপ সোলার’ বা ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা। আগামী গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমকে সামনে রেখে দেশব্যাপী সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, গত ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করবেন, তারা পরবর্তী তিন বছর উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবেন। এতে তিন বছরের মধ্যেই বিনিয়োগের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ অর্থ তুলে আনা সম্ভব হবে।
অমিত আরও বলেন, অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণার ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী আজ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও ভোল্টেজ রেগুলেটরসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে আগামী ছয় মাসের জন্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর মওকুফ করা হয়েছে। আমদানিকারকদের শুধু ১ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি দিতে হবে। এর ফলে আগামী গ্রীষ্ম থেকেই দেশবাসী এর সুফল পেতে শুরু করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিগত দেড় যুগের বিদ্যুৎ খাতের নীতির সমালোচনা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ওই সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি। এমনকি খুলনা-৩ আসনে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে কবে গ্যাস সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তিনি বলেন, ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন লাইনের সক্ষমতা না বাড়ানো এবং নির্দিষ্ট একটি ভৌগোলিক অঞ্চল, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ভুলের মাশুল এখন মফস্বলের মানুষকে দিতে হচ্ছে। বর্তমান সরকার জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য আনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জনগণের দুর্ভোগের জন্য আবারও দুঃখ প্রকাশ করে অমিত বলেন, সংকট উত্তরণে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইনশাল্লাহ খুব দ্রুতই এই সংকট কেটে যাবে।
এমওএস/এমএএইচ/