ডিম দিতে জন্মস্থানেই ফিরে আসে অলিভ রিডলি বা জলপাই রঙা সামুদ্রিক কচ্ছপ। কিন্তু কক্সবাজারের বালুকাবেলায় ফেরার পথে ছড়িয়ে থাকা মৃত্যুফাঁদে প্রাণ যাচ্ছে তাদের। মানুষের কর্মকাণ্ডে সৈকত বৈরী হয়েছে আগেই। সাগরও এখন আর নিরাপদ নয়। তাই দেড় দশক আগের তুলনায় কক্সবাজার সৈকতে কমেছে মা কাছিমের আনাগোনা। কমেছে ডিমের পরিমাণও।
বাংলাদেশের ‘বিপদ সংকুল’ সৈকতে এখন আর দলবেঁধে আসে না অলিভ রিডলি। তাই বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ‘আরিবাদা’ও আর দেখা যায় না। চলতি বছরের দুই মাস পুরো হওয়ার আগেই ৯৫টি মৃত অলিভ রিডলি কচ্ছপ মিলেছে সৈকতে। বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে বিশেষজ্ঞদের।
প্রাথমিক তদন্তে তারা দেখতে পেয়েছেন, জালে আটকা পড়ায় এবং ফ্লিপার (কচ্ছপের সাঁতার কাটার অঙ্গ) ও গলাসহ বিভিন্ন অঙ্গ কেটে যাওয়ায় এসব কচ্ছপ মারা গেছে। সাগরে অতিরিক্ত ট্রলিং (লম্বা আকারের টানা জাল টেনে মাছ ধরা), উপকূলের কাছাকাছি ফিশিং ট্রলারের আধিক্য, গলায় ও ফ্লিপারে জাল আটকে যাওয়া, জালে আটকা পড়া কচ্ছপ ছেড়ে না দিয়ে ফ্লিপার কেটে দেওয়া, সৈকতে অপরিকল্পিত পর্যটন, অতিরিক্ত আলো ও শব্দদূষণসহ এরকম বিভিন্ন কারণ বিদ্যমান থাকলে সৈকতে ডিম পাড়তে আসা অলিভ রিডলির সংখ্যা আরও কমবে।
আরও পড়ুন
বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঠবিড়ালি বাংলাদেশে, তবুও কেন হারিয়ে যাচ্ছে?
অলিভ রিডলি জাতের সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়ার মৌসুম নভেম্বর থেকে মার্চের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত। এ সময়ে পূর্ণিমা বা অমাবস্যার সময় সৈকতে আসে মা কাছিম। এই ভরা মৌসুমে জানুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সৈকতে ৯৫টি মৃত অলিভ রিডলি কচ্ছপ পেয়েছেন বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিওআরআই) সদস্যরা। কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কের উখিয়া উপজেলার সোনার পাড়া থেকে টেকনাফ সৈকত, টেকনাফের হাজমপাড়া ও বাহারছড়া, ইনানি সৈকত এবং মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া উপকূলে মৃত কচ্ছপগুলো ভেসে আসে।
বিওআরআই’র জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, ফেব্রুয়ারিতে মা কচ্ছপ বেশি মাত্রায় ডিম পাড়ে। যেসব মৃত কচ্ছপ পাওয়া গেছে, সবই অলিভ রিডলি প্রজাতির। সবগুলোর পেটে ডিম ছিল। বেশিরভাগের শরীরে ছিল জাল প্যাঁচানো, ফ্লিপারে জালের রশি আটকে ছিল, অনেকগুলোর ফ্লিপার ছিল কাটা, গলায় ছিল কাটা দাগ ও ক্ষতচিহ্ন। মারা যাওয়ার ৭-১০ দিন পর এগুলো উপকূলে ভেসে আসে। তখন বেশিরভাগের শরীর ফুলে পচে যায়। সেগুলো মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে।
এসব কচ্ছপের মৃত্যুর কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. তৌহিদা রশিদ বলেন, কচ্ছপের ফরেনসিক করার মত ল্যাব দেশে নেই। তবে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তাদের মনে হয়েছে, ফেলে দেওয়া জালের অংশ (ঘোস্ট নেট) এবং ফিশিং নেটে ফ্লিপার আটকানোর কারণে এসব কচ্ছপের মৃত্যু হয়েছে।
আরও পড়ুন
৩ কারণে বিপন্ন হচ্ছে প্রকৃতির পরম বন্ধু ‘গন্ধগোকুল’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন বলেছেন, জালে কচ্ছপ আটকালে জাল ও সময় বাঁচাতে জেলেরা কচ্ছপের ফ্লিপার কেটে দেয়, সে কারণে কচ্ছপগুলো মারা যাচ্ছে। মৃত কাছিমের মধ্যে ৮০ শতাংশের শরীরে ছিল জাল প্যাঁচানো। শুধু কচ্ছপ নয় সৈকতে বড় বড় জেলিফিশও মিলেছে। জেলিফিশ হচ্ছে কচ্ছপের খাদ্য। ফিশিং এলাকায় কচ্ছপ ও জেলিফিশের আধিক্য ছিল সম্ভবত।
প্রতিবছর এভাবে কচ্ছপের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় উদ্বিগ্ন পরিবেশ অধিদফতর। একদিকে পেটে রয়েছে ডিম, অন্যদিকে শরীরে আঘাতের চিহ্ন। শুধু সোনারপাড়া উপকূল নয়, পেচারদ্বীপ সমুদ্র উপকূলেও ভেসে আসছে মৃত কচ্ছপ। স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলে, ট্রলিং জাহাজ, বড় ট্রলার ও অবৈধ জাল এসব কিছুই কচ্ছপের মৃত্যুর জন্য দায়ী। বড় ট্রলার ও ট্রলিং জাহাজের আঘাতেও মারা যায় কচ্ছপ।
গত ৪ বছর ধরে সোনারপাড়া সমুদ্র উপকূলে কচ্ছপ রক্ষণাবেক্ষণ ও ডিম সংরক্ষণে কাজ করছেন স্থানীয় যুবক নবী হোসেন। তার দাবি, উপকূলে ডিম পাড়তে এসে প্রাণ হারাচ্ছে একের পর এক মা কচ্ছপ। এক সপ্তাহে প্রায় ২০টি মৃত কচ্ছপ পেয়েছি। নিজ উদ্যোগে এগুলো মাটিতে চাপা দিয়েছি। যদি ফেলে রাখা হয়, দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং আশেপাশের ছোট বাচ্চাদের জন্য ক্ষতিকর। মানুষ কচ্ছপ ও পরিবেশ রক্ষার কাজে সচেতন হোক; এটাই আমার চেষ্টা।
আরও পড়ুন
পরিবেশের বন্ধু লজ্জাবতী বানর হারিয়ে যাচ্ছে
একের পর এক কচ্ছপের মৃত্যুর মিছিল নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও। গবেষকরা বলছেন, কচ্ছপ রক্ষায় আইন প্রয়োগ এবং জেলেদের সচেতন করার বিকল্প নেই। রেডিয়েন্ট রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন সেন্টারের গবেষক মো. আব্দুল কাইয়ুম জানান, গত দুই মাসে প্রায় ৬০-৭০টি মৃত কচ্ছপ উপকূলে ভেসে এসেছে। বিশেষ করে সোনাদিয়া দ্বীপ, কক্সবাজার, টেকনাফ পেনিনসুলা ও সেন্টমার্টিনস দ্বীপ এলাকায় ঘটনা বেশি।
ডিম পাড়ার সময় কচ্ছপ সাগরে জালে আটকে যায় বা ট্রলারের আঘাতে গুরুতরভাবে আহত হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক সময় জাল কেটে দেওয়া হলেও রক্তক্ষরণ বা আঘাতের কারণে কচ্ছপ মারা যায়। গত বছরও মৃত কচ্ছপ উদ্ধারের সংখ্যা ২০০-এর বেশি ছিল। তাই সরকারি বিধিনিষেধ, মোবাইল কোর্ট এবং জনসচেতনতা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, উপকূলের জেলে ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে বোঝাতে হবে; সামুদ্রিক কচ্ছপ টিকে থাকলে জীববৈচিত্রের ভারসাম্য বজায় থাকে। এতে জেলিফিশের আধিক্য কমে, মাছের উৎপাদন বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে জেলেদের লাভ হয়। পরিবেশকর্মী, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগে সচেতনতা তৈরি করা গেলে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।
আরও পড়ুন
অচিরেই হারিয়ে যেতে পারে সুন্দরবনের বাঘ
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, সামুদ্রিক কচ্ছপ সমুদ্র ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। তাই সংরক্ষণে সবার সচেতনতা ও অংশগ্রহণ অপরিহার্য। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে কচ্ছপ মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়েছিল। বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফলাফলও ইঙ্গিত করছে, প্রতিবছর মৃত কচ্ছপের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং গভীর দুশ্চিন্তার কারণ।
কক্সবাজার অধিদপ্তর জানায়, সোনাদিয়া দ্বীপে একটি সংরক্ষণ প্রকল্প চলছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে হ্যাচারি স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একজন গার্ড নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। দক্ষিণপাড়া, পশ্চিমপাড়া ও পূর্বপাড়ার অন্তত দুটি স্থানে হ্যাচারি হবে। যেখানে ডিম নিরাপদে সংরক্ষণ ও ফুটানোর ব্যবস্থা থাকবে। সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে কচ্ছপ সংরক্ষণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এমআইএইচ