২৯ বছর বয়সে যখন মোহাম্মদ রুবেল গত বছর এনসিএল টি-টোয়েন্টিতে ‘মোস্ট প্রমিজিং ক্রিকেটার’ পুরস্কার জিতেছিলেন, তখন অনেকের কাছেই বিষয়টি ছিল একটু ব্যতিক্রমী। উপমহাদেশের ক্রিকেটে যেখানে ২৭-২৮ পেরোলেই অনেক ক্রিকেটারকে সম্ভাবনার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, সেখানে বয়সকে বাধা না বানিয়ে নিজেকে প্রতিনিয়ত নতুন করে তৈরি করেছেন রুবেল।
অফস্পিনের সঙ্গে ক্যারম বল, ব্যাক স্পিন, লেগ স্পিন ও দুসরার মতো বৈচিত্র রপ্ত করে হয়ে উঠেছেন রহস্য স্পিনার। গত বছর ক্যারিয়ারে প্রথম স্বীকৃত টুর্নামেন্ট এনসিএল টি-টোয়েন্টিতে এসেই বাজিমাত। চট্টগ্রাম বিভাগের হয়ে ৮ ম্যাচে ৫.২০ ইকোনমি ও ১৫.১০ গড়ে ১০ উইকেট।
এরপর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, বিপিএল পেরিয়ে এবার এইচপির হয়ে অস্ট্রেলিয়ার টপ এন্ড টি-টোয়েন্টিতে নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন রুবেল। মাত্র ৭ ম্যাচে ২৩ উইকেট নিয়ে হয়েছেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। নেপালের বিপক্ষে ৪ উইকেট দিয়ে শুরু, এরপর হোবার্ট হ্যারিকেন্সের বিপক্ষে ৩, ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে ৪, অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্সের বিপক্ষে ৩, নিউজিল্যান্ড ‘এ’-এর বিপক্ষে ১ এবং আজ নর্দান টেরিটরির বিপক্ষে ৫ আর শেষ ম্যাচে শিকার ৩ উইকেট।
প্রথমবার দেশের বাইরে খেলতে গিয়েই এমন পারফরম্যান্সে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসা রুবেল কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। নিজের বোলিংয়ের রহস্য, সাফল্যের পেছনের পরিশ্রম, দেরিতে পাওয়া সুযোগ, বিদেশের অভিজ্ঞতা, জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়ে অকপট ছিলেন এই রহস্য স্পিনার।
জাগো নিউজ: টপ এন্ড টি-টোয়েন্টিতে খেললেন, সর্বোচ্চ উইকেটও নিলেন। সব মিলিয়ে আসলে ট্যুরটা কেমন গেল আপনার?
মোহাম্মদ রুবেল: সব মিলিয়ে তো আলহামদুলিল্লাহ ভালো গেছে। জীবনে প্রথমবার (দেশের) বাইরে গেলাম। সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হলাম। পারফরম্যান্স ভালো হয়েছে, বোলিং ভালো হয়েছে।
জাগো নিউজ: প্রথমবার দেশের বাইরে খেলতে যেয়েই এরকম একটা পারফরম্যান্স, আসলে এটা কীভাবে সম্ভব হলো?
রুবেল: আমি ওভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। আমি যখন বাংলাদেশ থেকে গিয়েছি, তখন মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম যে কন্ডিশন যেমনই হোক, আমাকে মানিয়ে নিতে হবে। আমি ওখানে গিয়ে প্র্যাকটিস সেশনে অনেক কঠোর পরিশ্রম করেছি। আল্লাহর রহমতে কন্ডিশনটা আমার পক্ষে ছিল।
আমি ওভাবে বোলিং করতে পেরেছি। লক্ষ্য ছিল সুযোগ পেলে আমার টার্গেট ছিল পারফর্ম করার। যে সুযোগ পেয়েছি, ওভাবেই চেষ্টা করছি... যেটা আমি সবসময় করে আসছি আরকি। ভালো ফিগারটা বজায় রাখতে পারছি, আলহামদুলিল্লাহ সবকিছু ভালো হয়েছে।
জাগো নিউজ: ভালো খেলার টার্গেট তো অবশ্যই ছিল, মানে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল কি না…।
রুবেল: ওই রকম নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য আসলে ছিল না। তবে যখন ম্যাচ আসছে, যখন সুযোগ পেয়েছি, ওভাবেই টিমের জন্য ভালো কিছু করার চেষ্টা করছি। ওভাবেই বল করতে পেরেছি, উইকেট পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ ভালোই হয়েছে।
জাগো নিউজ: ৭ ম্যাচে ২৩ উইকেট নিয়েছেন। প্রত্যেকটা ম্যাচেই বাংলাদেশের সেরা বোলার ছিলেন আপনি। এমনকি শেষ ম্যাচেও আসলে বাংলাদেশ যে লড়াইটা করেছে, আপনার বোলিংয়েই। ধারাবাহিকতাটা কিভাবে ধরে রাখলেন?
রুবেল: আমি আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী বোলিং করছি। আমি যে জায়গায় বল করার ব্যাটারকে..., ব্যাটার যেগুলা ব্যাকফুটে বা ফুল লেংথে আছে, ওইভাবে চেষ্টা করছি বল করার। ওইভাবেই চেষ্টা করছি বোলিং করার, আলহামদুলিল্লাহ ভালো হয়েছে।
জাগো নিউজ: আপনি মানে দুই পাশেই আসলে বল ঘোরাচ্ছিলেন, যেটা আসলে খুব কম স্পিনারই পারে। এটা কি মানে সহজাত, নাকি এটার জন্য কাজ করেছেন?
রুবেল: এটা তো আমার সহজাতই, চেষ্টা করি। বল করতে করতে হয়ে যায়। এটা আলাদা করে করার চেষ্টা করি নাই কখনও। এর জন্য আলাদা করে কাজও করিনি কখনো। বিসিবিতে সোহেল ভাই (সোহেল ইসলাম) ছিলেন, ওনার সঙ্গে বোলিং স্কিল নিয়ে কথা বলছিলাম। ওনার সঙ্গে কাজ করছি, ওই অনুযায়ী ডেলিভারিগুলো করার চেষ্টা করছি আরকি।
জাগো নিউজ: আপনি গত বছর এনসিএল টি-টোয়েন্টিতে ভালো বোলিং করার পর আসলে বিপিএলে দল পেয়েছেন। এরপরে প্রিমিয়ার লিগ খেললেন, এইচপিতে আসলেন, অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে এমন পারফরম্যান্স..., এই পুরো জার্নিটা আপনি কিভাবে দেখছেন? একটু কি রূপকথার মতো বা অবিশ্বাস্য লাগে কি না আপনার কাছে?
রুবেল: ওই রকম অবিশ্বাস্য মনে হয় না। কারণ আমি তো কষ্ট করছিলাম। যেমন প্রথমবার বিপিএল খেললাম, বিপিএলে চান্স পেলাম, তখন তো ভালো বোলিং করছিলাম। একটা ম্যাচে হয়তো বা ওই রকম উইকেট পাই নাই, বাকি সব ম্যাচে আলহামদুলিল্লাহ ভালো বোলিং করার চেষ্টা করছি। ওই জার্নিটা ওইদিক থেকে অবিশ্বাস্য না, তবে সবকিছু দ্রুতই হয়ে গেল আরকি!
জাগো নিউজ: আপনার বোলিংয়ে আপনার কাছে কোন জায়গাটা আপনার নিজের জন্য শক্তির মনে হয়?
রুবেল: আমি নরমালি চেষ্টা করি জায়গাটা ধরে রাখতে। টাইট লাইন-লেংথে বল করার। যখন ব্যাটার চার্জ করে, তখন চেঞ্জ করি।
জাগো নিউজ: এনসিএল দিয়ে আপনি লাইমলাইটে আসলেন; কিন্তু আপনার কি কখন মনে হলো যে অনেক দিন তো ক্রিকেট খেললাম, এবার আসলে আমি টপ লেভেলে এগোতে পারছি বা এবার ক্যারিয়ারে টার্নিং পয়েন্ট এসেছে?
রুবেল: এনসিএলের পর যখন বিপিএলে সুযোগ পেলাম, তারপর প্রিমিয়ার লিগে ভালো টিম পেলাম। প্রিমিয়ার লিগে ভালো পারফর্ম করলাম। ওখান থেকে মনে হয়েছে ক্যারিয়ারের মোড়টা হয়তো ঘুরছে। ভালো পারফর্ম হয়েছে, আমি প্রসেসটা বজায় রাখছি। ২০১৭-১৮ সেশনের পর আমি স্কোয়াডে (জাতীয় লিগের) ছিলাম না। তারপর আমি স্কোয়াডে ঢুকলাম। তারপর বিপিএল, এনসিএলে ভালো পারফর্ম করলাম।
জাগো নিউজ: এশিয়ান গেমসেও আসলে আপনার টিমে থাকার সুযোগ ছিল। কিন্তু প্রাথমিক দলে ছিলেন না, এই কারণে রাখতে পারেনি নির্বাচকরা। এখন যে ছন্দে ছিলেন বা যে ফর্মে ছিলেন, তো কিছুটা হতাশ লাগছে কিনা?
রুবেল: না, ওই রকম তো কিছু নাই। হতাশার কিছু নাই। সবাই ভালো পারফর্ম করছে। প্রসেসটা ঠিক রাখলে সামনে সুযোগ আসবেই। হতাশ হওয়ার কিছু নাই, সব আল্লাহর ইচ্ছা।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশ তো ডারউইনে টেস্ট জিতেছে, আপনারা টুর্নামেন্টটা ওখানেই খেললেন। আপনিও প্রথমবার দেশের বাইরে গেলেন। কন্ডিশনের সঙ্গে এত দ্রুত মানিয়ে নিয়েছেন যে বোঝাই যাচ্ছিল না যে আপনি প্রথমবার দেশের বাইরে গেছেন খেলতে।
রুবেল: না, ওই রকম সমস্যা হয় নাই। কন্ডিশনটা ওই রকমই ছিল, মানিয়ে নিতে ওই রকম কোনো সমস্যা হয়নি। সিনিয়র ভাইদের সঙ্গে কথা বলছি, ওনারাও গাইড করছেন। ওগুলা হ্যান্ডেল করতে সুবিধা হয়েছে।
জাগো নিউজ: ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ খেলার সময়ও আপনার পাসপোর্ট ছিল না। সেখান থেকে পাসপোর্ট করলেন, বিসিবি থেকে বলা হয়েছিল কি না, নাকি আপনি নিজেই করলেন?
রুবেল: হ্যাঁ, সত্যি বলতে যখন আমি প্রিমিয়ার লিগ খেলতে আসছিলাম, তখন আমার পাসপোর্ট ছিল না। প্রিমিয়ার লিগে ভালো পারফর্ম করার পর সোহেল ভাই বলল পাসপোর্টটা করে রাখতে। এরপর পাসপোর্টটা করে নিই। আগেও পাসপোর্ট করতে পারতাম, করিনি! মনে হয়েছে হয়তো লাগবে না।
জাগো নিউজ: প্রথমবার দেশের বাইরে গেলেন, প্রথমবার খেলতে গেলেন। বাইরের পরিবেশ, চলাফেরা বা কোনো সমস্যা কি না, বা শুরুতে একটু মানিয়ে নেওয়ার কোনো বিষয় ছিল কি না?
রুবেল: না, ওরকম কোনো সমস্যা হয় নাই। শুরুতে খাবারের একটু সমস্যা হচ্ছিল। তবে পরে একটা বাঙালি রেস্টুরেন্টে যাওয়া শুরু করি, তারপর থেকে সব ঠিকঠাক ছিল।
জাগো নিউজ: বাকি টিমমেটরা তো অনেকেই অনেকবার সফর করেছে, কোচিং স্টাফে যারা ছিল তারাও করেছে। তাদের থেকে যে একটা মানসিক সমর্থন বা হেল্প কেমন পেয়েছেন?
রুবেল: হ্যাঁ, সবাই অনেক সাহায্য করেছে। বিশেষ করে সিনিয়র খেলোয়াড়রা অনেক সাহায্য করেছেন। তারা আমাকে অনেক পরামর্শ দিয়েছেন, কিভাবে ওখানে বোলিং করতে হবে। সেগুলো আমাকে অনেক সাহায্য করেছে।
জাগো নিউজ: আপনি যখন লাইমলাইটে আসলেন, টপ লেভেলে পারফর্ম করা শুরু করলেন, তখন আপনার বয়স অলমোস্ট ৩০। এই জিনিসটাকে আপনি কি মনে করেন বাকিদের জন্য উদাহরণ হতে পারে যে বয়স যাই হোক, পারফরম্যান্সটাই আসল কথা।
রুবেল: বয়স তো আসলে একটা সংখ্যা মাত্র। আমি মনে করি আমার সময় যখন আসছে, আমি সুযোগ পাইছি। আলহামদুলিল্লাহ ভালো করার চেষ্টা করছি। বয়সের চেয়ে আমার কাছে আমি ফিট কিনা সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফিট থাকলে আপনি যে কোনো কিছু করতে পারবেন, বয়স আমার কাছে অতটা গুরুত্বপূর্ণ না।
জাগো নিউজ: নতুন বল ও পুরোনো বল দুই জায়গাতেই আপনি বোলিং করেছেন। কোন জায়গায় বেশি উপভোগ করেছেন এবং কোন জায়গাটা বেশি চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছে?
রুবেল: আমার কাছে চ্যালেঞ্জিং মনে হয়নি ওভাবে। উপভোগ করেছি দুই জায়গাতেই। ক্যাপ্টেন যখন যেভাবে বল চাইছে, নতুন বলে হোক বা পুরোনো বলে, আমি সেভাবেই সার্ভিস দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্র্যাকটিসেও ওইভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। ক্যাপ্টেন যখন বিশ্বাস দেখাইছে, আমি ওইটা ডেলিভার করার চেষ্টা করেছি।
জাগো নিউজ: প্রত্যেকেরই তো একটা লক্ষ্য থাকে, যারা ক্রিকেট খেলে। আপনার ক্ষেত্রে আল্টিমেট লক্ষ্যটা কী?
রুবেল: আমার টার্গেট তো সবসময় ভালো খেলা। সামনে যেসব ম্যাচ আসবে, সেখানে ভালো পারফর্ম করাই আমার মূল লক্ষ্য। আর সবারই লক্ষ্য থাকে জাতীয় দলে খেলা। আমিও চাই দেশকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিনিধিত্ব করতে। তবে সেসব নিয়ে চিন্তা নেই, আমার মূল লক্ষ্য যেখানেই খেলি ভালো খেলব। এরপর নির্বাচকরা যদি মনে করে, তাহলে অবশ্যই জাতীয় দলে খেলতে চাই।
জাগো নিউজ: গত বছর এনসিএলের আগে আসলে আপনাকে তো ওইভাবে মানুষ চিনত না। এই কয়েক মাসের ভেতরে আসলে রীতিমতো তারকা হয়ে গেছেন। এখন সবাই আপনাকে এক নামে চেনে। এই পরিবর্তনটা বা লাইমলাইটে থাকাটা কি উপভোগ করেন, নাকি কিছুটা বাড়তি চাপের মনে হয়?
রুবেল: না, আলহামদুলিল্লাহ উপভোগই করি। চাপ মনে করি না। কারণ মানুষ ভালোবাসে বলেই চেনে। আমি শুধু আমার বোলিং আর পারফরম্যান্সে ফোকাস রাখার চেষ্টা করি। এক বছর আগে আমাকে ওভাবে কেউ চিনত না। এখন সবাই চেনে, আমাকে নিয়ে কথা বলে। এগুলো তো ভালো লাগারই কথা। আমারও বেশ ভালোই লাগে।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশ জাতীয় দল তো সামনে অনেকগুলো আন্তর্জাতিক সিরিজ খেলবে। সেখানে কি নিজেকে দেখার বা জাতীয় দলের জার্সিতে খেলার স্বপ্নটা এখন আরও উজ্জ্বল মনে হচ্ছে?
রুবেল: যে কোনো ক্রিকেটারের জন্যই জাতীয় দলে খেলাটা সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। আমারও তাই। আমি শুধু আমার কাজটা ঠিকমতো করে যেতে চাই, বাকিটা নির্বাচকদের বিষয়। যদি সুযোগ পাই, তবে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব।
এসকেডি/আইএইচএস