
জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীদের টানে ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে পড়ে প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিনের নিহত হওয়ার ঘটনা তদন্তে তেমন অগ্রগতি নেই। চার দিন আগের এ ঘটনায় সন্দেহভাজন যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁরা কতটা জড়িত, এত দিনেও তা নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারী কর্মকর্তারা। উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলের রং নিয়েও যে প্রশ্ন উঠেছে, সেটিরও কোনো মীমাংসা হয়নি। ঘটনার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আদালত গ্রেপ্তার তিন আসামির পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। ইতিমধ্যে তিন দিন অতিবাহিত হয়েছে। তাঁদের সন্দেহভাজন হিসেবেই জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারী কর্মকর্তারা। এমনকি মোটরসাইকেলের রং নিয়ে ওঠা প্রশ্নেরও সুরাহা হয়নি। গ্রেপ্তার আসামিদের পাশাপাশি আরও কয়েকজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে নজরদারিতে রেখেছেন তাঁরা। গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
গত ২৯ আগস্ট ভোরে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে ছিনতাইকারীদের হ্যাঁচকা টানে রাস্তায় পড়ে নিহত হন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিন (৫৬)। চিকিৎসার জন্য স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। ভোরে কল্যাণপুর বাস টার্মিনালে নেমে ব্যাটারিচালিত রিকশায় করে হাসপাতালে যাওয়ার পথে সংসদ ভবন এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী রনজিলা পারভিনের হাতে থাকা ব্যাগ টান দেয়। এতে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। পরে হাসপাতালে নিলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। এ ঘটনায় রনজিলার স্বামী আবদুল মতিন বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।
পরদিন ৩০ আগস্ট রাজধানীর পূর্ব তেজতুরী বাজার এলাকা থেকে মূল সন্দেহভাজন হিসেবে মোশাররফ হোসেন পনি ওরফে প্যারা পনি (২৮), তাঁর সহযোগী সেড্রিক জুলিয়ান (২৪) এবং মোটরসাইকেলটির মালিক মো. রাকিব হোসেনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তিনজনকেই আলাদা আলাদা বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে ‘ইয়ামাহা আর-১৫’ মডেলের একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানায় র্যাব।

র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেল ও ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহার করা মোটরসাইকেল এক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ছিনতাইয়ের সময় ধারণকৃত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে যে মোটরসাইকেল দেখা গেছে, সেটি নীল রঙের। আর র্যাবের উদ্ধার দেখানো যে মোটরসাইকেলের ছবি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া হয়, সেটি রুপালি ও কালো রঙের।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ঘটনার পর প্রকাশ হওয়া সিসিটিভি (ক্লোজ সার্কিট) ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যাওয়া ব্যক্তিদের চেহারা স্পষ্ট নয়। তারা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে। মোটরসাইকেলের রঙের বিষয়টির মীমাংসা এখনো হয়নি।
মামলাটি তদন্ত করছেন শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কোনো নিরীহ ব্যক্তি যেন ভুলভাবে সাজা না পান, সে সম্পর্কে তাঁরা সচেতন আছেন। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আসামিদের বিষয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি। তদন্ত চলছে।
মামলার বাদী আবদুল মতিন এজাহারে উল্লেখ করেন, রনজিলা পারভিনের হাতে থাকা ভ্যানিটি ব্যাগে দুটি মুঠোফোন ছিল। একটি স্মার্টফোন, যার আনুমানিক মূল্য ২৫ হাজার টাকা। আরেকটি বাটন ফোন, যার মূল্য মাত্র দুই হাজার টাকা। এ ছাড়া ব্যাগে নগদ ১০ হাজার টাকা ও জাতীয় পরিচয়পত্রের একটি ফটোকপি ছিল।
র্যাব জানায়, গ্রেপ্তারের সময় র্যাব সেড্রিকের কাছ থেকে একটি লিনো ক্যানন ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন, প্যারা পনির কাছ থেকে একটি রিয়েলমি ব্র্যান্ডের নীল রঙের স্মার্টফোন এবং নগদ পাঁচ হাজার টাকা উদ্ধারের কথা জানায়। আর ‘ইয়ামাহা আর-১৫’ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয় রাকিবের বাসার গ্যারেজ থেকে।
মামলার বাদী আবদুল মতিন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর স্ত্রীর ব্যাগের ভেতরে দুটি মুঠোফোন ছিল। এর মধ্যে একটি স্যামসাং গ্যালাক্সি এ-১৫, আরেকটি বাটন ফোন ছিল। কিন্তু সেটি কোন কোম্পানির, তার মনে নেই। পুলিশ তাঁকে উদ্ধারের বিষয়ে এখনো কিছু জানায়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রনজিলা পারভিনের ছিনতাই হওয়া মালামাল এখনো উদ্ধার করতে পারেনি তারা। র্যাবের উদ্ধার করা মালামাল রনজিলা পারভিনের নয়। ফলে তারা এখনো আসামিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারছে না।
মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা হিসেবে শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখতে পাওয়া মোটরসাইকেলের চালকদের সঙ্গে মিল থাকায় র্যাব তাঁদের গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তাঁরা। অস্পস্টতা আছে। পাশাপাশি সন্দেহভাজন আরও কয়েকজনকে তাঁরা নজরদারিতে রেখেছেন। শিগগিরই তাঁদের গ্রেপ্তারে সফল হবেন বলে জানান তিনি।
মালামাল উদ্ধারের বিষয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, আসামিরা এখনো দায় স্বীকার করেননি। ফলে হারানো মালামাল উদ্ধার করা যায়নি। তাঁরা উদ্ধারের চেষ্টা করছেন।

র্যাবের দাবি, প্যারা পনি একজন পেশাদার ছিনতাইকারী। রাজধানীর তেজগাঁও, শেরেবাংলা নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক কারবার, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। তাঁর বিরুদ্ধে রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন থানায় ১৩টি মামলা রয়েছে। আগেও তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে জামিনে বেরিয়ে আসেন।
পুলিশ বলছে, প্যারা পনিকে পূর্ব তেজতুরী বাজারের সরকারি বিজ্ঞান কলেজের বিপরীত পাশের নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
আজ বুধবার দুপুরে ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, একজন নিরাপত্তাকর্মী বাড়িটির নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। নাম খোরশেদ আলম। পনির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর পরিবার ভবনের একটি ফ্ল্যাটে থাকত। চার মাস আগে ফ্ল্যাটটি তাঁরা ভাড়া নেন। তাঁর বাবা নেই। মা, বোন, বড় ভাই আর পনি বাসাটিতে থাকতেন। তাঁর আরও তিনজন বড় ভাই থাকলেও তাঁরা অন্য বাসায় থাকতেন। ভাড়া নেওয়ার দুই মাসের মাথায় বাসাটি ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ দেয় তারা। গত ৩১ আগস্ট বাসা ছেড়ে চলে গেছে পরিবারটি। তবে ওই বাসা থেকেই পনি গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তারের সময় তিনিই ডিউটিতে ছিলেন।
২৯ আগস্ট বিকেল থেকে ডিউটিতে ছিলেন উল্লেখ করে খোরশেদ আলম বলেন, পনি ভাইদের সঙ্গে কারওয়ান বাজার এলাকায় কাঁচামালের ব্যবসা করতেন বলে তিনি জানতেন। ব্যবসার কাজে প্রায় প্রতিদিন রাতেই বাইরে থাকতেন তিনি। সকালে বাসায় আসতেন। ঘটনার দিন কখন বাসায় এসেছিলেন, তিনি জানেন না। রাত পৌনে দুইটার দিকে র্যাব তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
একই এলাকার চৌরঙ্গী মোড়ের একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন সেড্রিক জুলিয়ান। আজ দোতলা বাড়িটিতে গিয়ে তালাবদ্ধ দেখতে পাওয়া যায়। বাড়িটির নিচে দুটি দোকান রয়েছে। আর বাড়ির সামনে একটি মুদিদোকান। দোকানটিতে সেড্রিকের বিষয়ে খোঁজখবর নিতেই আরও কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি সেখানে জড়ো হন।
তাঁরা জানান, সেড্রিকের বাবা দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় বেসকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তাঁর একটি বোন আছেন। দোতলা বাড়িটি তাঁদের নিজস্ব। তবে সেখানে তিনি বাবার সঙ্গে থাকতেন। তাঁর মা সেখানে থাকতেন না। সেড্রিক নিয়মিত মাদক সেবন করতেন। মাঝেমধ্যে বন্ধুদেরও নিয়ে আসতেন। এসব কারণে দু–তিন বছর আগে পড়াশোনা ছেড়ে দেন তিনি। এলাকার সবাই মাদকের বিষয়টি জানত। তবে তিনি ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত কি না, সেটি তাঁরা নিশ্চিত নন। তাঁর সম্পর্কে আগে এমন অভিযোগ শোনা যায়নি। এ ঘটনায় তাঁকে ফাসানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
মুদিদোকানি আশরাফুল খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেড্রিকের বাবা লিটন জর্জ ধনী মানুষ। বাড়ির নিচে থাকা দুটি দোকানের মালিকও তিনি। বাবার টাকায় সেড্রিক মাদক সেবন করে বেড়াতেন বলে জানি। তবে ছিনতাইকারী ছিলেন না। গ্রেপ্তারের খবরটি শুনে অবাক হয়েছি।’
মোটরসাইকেলের মালিক রাকিব হোসেন তেজগাঁও এলাকার একটি অটোরিকশার গ্যারেজে কাজ করতেন। রাজধানীর নাখালপাড়ার শাহীনবাগ এলাকায় থাকতেন তিনি। রাকিবের বাসার গ্যারেজ থেকেই মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে র্যাব।
তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পনির বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা থাকলেও সেড্রিক ও রাকিবের বিরুদ্ধে মামলার তথ্য পাওয় যায়নি। তাঁরা রাকিবের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) থাকার কথা শুনেছেন। তবে কোন থানায়, কী বিষয়ে জিডি, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি।