‘আমি তো কালো মানুষ, আমার কেমনে বিয়ে হবে?’
কথাটি শুনলে হয়তো প্রথমে হাসি পেতে পারে। কিন্তু একটু থামলেই বোঝা যায়, এই একটি বাক্যের ভেতর হাসির চেয়ে কষ্টই বেশি। জনপ্রিয় অভিনেতা ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাসান মাসুদ নিজের গায়ের রং নিয়ে এমন কথা বলেছেন। একজন মানুষ যখন নিজের ত্বকের রংকে বিয়ের সম্ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে বাধ্য হন, তখন প্রশ্নটি আর ব্যক্তিগত থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে আমাদের সমাজের আয়না।
এর পরের কথাটিই যেন সেই আয়নাটা আরও পরিষ্কার করে দেয়—‘আমরা মুখে যা-ই বলি, আমরা সাদাদের থেকেও বেশি বর্ণবাদী।’
একটি ছেলে বন্ধুর গায়ের রং নিয়ে মজা করলে তাকে থামাতে হবে। একটি মেয়ে নিজের গায়ের রং নিয়ে কাঁদলে তাকে বদলানোর পরামর্শ না দিয়ে তার কষ্টটা বুঝতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বিয়ের সময় সন্তানের সামনে গায়ের রংকে যোগ্যতা হিসেবে আলোচনা করা বন্ধ করতে হবে।
কথাটি আক্ষরিক অর্থে সবার ক্ষেত্রে সত্য নয়। কিন্তু অস্বস্তিকর সত্য হলো, আমাদের সমাজে গায়ের রং নিয়ে এমন অসংখ্য বিচার আছে, যেগুলোকে আমরা বর্ণবাদ বলে স্বীকারই করি না। আমরা তাকে বলি ‘পছন্দ’, ‘রুচি’, ‘সৌন্দর্যবোধ’, ‘বিয়ের বাজার’ কিংবা খুব সহজ করে—‘এতে কী হয়েছে?’ সমস্যাটা ঠিক সেখানেই।
একটি শিশু পৃথিবীতে আসে। সে জানে না ফর্সা কী, কালো কী। আয়নায় নিজের মুখ দেখে সে শুধু নিজের মুখটাই দেখে। তার কাছে ত্বকের রং কোনো যোগ্যতা নয়, কোনো অযোগ্যতাও নয়। তারপর একদিন কেউ বলে, ‘তুই তো কালো!’ কেউ বলে, ‘রোদে এত ঘুরিস না, কালো হয়ে যাবি।’ কেউ ভাই-বোনের সঙ্গে তুলনা করে। আবার নবজাতককে দেখেও আমরা অনেক সময় প্রথমেই বলে উঠি, ‘আহা, কী ফর্সা হয়েছে!’
শিশুটি তখন ধীরে ধীরে শিখতে শুরু করে—ফর্সা হওয়া ভালো, কালো হওয়া খারাপ।
বিয়ের বাজারে ফর্সা হওয়ার বাড়তি নম্বর
আমাদের বিয়ের বাজার বড় অদ্ভুত জায়গা। একজন মেয়ের উচ্চশিক্ষা থাকতে পারে, ভালো চাকরি থাকতে পারে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা থাকতে পারে, চমৎকার ব্যক্তিত্ব থাকতে পারে। কিন্তু এত কিছুর পরও কোথাও গিয়ে একটি প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়—‘রং কেমন?’ ফর্সা হলে যেন বাড়তি নম্বর। শ্যামলা হলে একটু কম। আর কালো হলে—‘দেখা যাক।’
তবে রঙবৈষম্য শুধু নারীর সমস্যা নয়। পুরুষও এর বাইরে নন। একজন কালো বা শ্যামলা ছেলেকেও শুনতে হয়—‘মেয়েরা তোকে পছন্দ করবে না।’ বন্ধুর আড্ডায় তার গায়ের রং নিয়ে ঠাট্টা হতে পারে, বিয়ের সময়ও প্রশ্ন উঠতে পারে—‘ছেলেটা একটু কালো না?’
তবে পুরুষের জন্য সমাজের কিছুটা ছাড় আছে। তার চাকরি, অর্থনৈতিক অবস্থান, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠাকে অনেক সময় গায়ের রঙের ‘ঘাটতি’ পূরণ করার মতো বিষয় হিসেবে দেখা হয়। নারীর ক্ষেত্রে সেই ছাড় অনেক কম।
একজন পুরুষ কালো হলেও ‘ভালো চাকরি করে’—এই একটি বাক্য তার গায়ের রং নিয়ে আপত্তি অনেকটাই সরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু একজন নারীর ক্ষেত্রে ‘ভালো চাকরি করে’ বলার পরও কেউ বলে বসতে পারেন—‘হ্যাঁ, কিন্তু দেখতে তো…’
বৈষম্যের দায় শুধু পুরুষের নয়
রঙবৈষম্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই পুরুষকে দায়ী করি। কিন্তু এখানেও আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। রঙবৈষম্যের দায় শুধু পুরুষের নয়। শুধু শ্বশুরবাড়ির নয়, শুধু ঘটকেরও নয়। অনেক নারীও এই বৈষম্যের চর্চা করেন।
একজন মা ছেলের জন্য বউ দেখতে গিয়ে বলেন, ‘মেয়েটা ভালো, পড়াশোনাও করেছে, কিন্তু একটু কালো।’
একজন নারী নিজের ছেলের বউ হিসেবে ফর্সা মেয়েকেই চান। একজন বোন বন্ধুর গায়ের রং নিয়ে মজা করেন। এমনও হয়, যিনি নিজে ছোটবেলায় গায়ের রং নিয়ে অপমানিত হয়েছেন, তিনিই পরবর্তী সময়ে অন্য কারও গায়ের রং বিচার করতে শুরু করেন।
কাউকে একা দোষী বানিয়ে এখানে লাভ নেই। কারণ বৈষম্যটি এতটাই সামাজিক যে, নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে এসেছে।
একজন মা যখন বলেন, ‘তুই একটু ফর্সা হলে তোকে আরও সুন্দর লাগত’, তিনি হয়তো মেয়েকে অপমান করতে চান না। বরং তাঁর নিজের শেখা সৌন্দর্যের ধারণাটিই তিনি মেয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। এইভাবেই বৈষম্য টিকে থাকে। কেউ তাকে নিয়ম হিসেবে লেখে না, তবু সবাই মেনে চলে।
‘ফর্সা মানেই সুন্দর’—এই শিক্ষা কে দিল?
সৌন্দর্যের ধারণা অনেকটাই তৈরি হয় সমাজের হাতে। পরিবার, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, বিজ্ঞাপন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মিলে আমাদের চোখকে শেখায়—কোন মুখকে সুন্দর বলে দেখতে হবে।
একসময় ফেয়ারনেস পণ্যের বিজ্ঞাপনে দেখানো হতো, একজন মেয়ের গায়ের রং তার জীবনের সব দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। চাকরি হচ্ছে না, আত্মবিশ্বাস নেই, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নেই। তারপর একটি পণ্য ব্যবহারের পর বদলে গেল তার চেহারা, আর চেহারার সঙ্গে বদলে গেল ভাগ্যও।
চাকরি এলো, প্রশংসা এলো, ভালোবাসা এলো, বিয়ের প্রস্তাবও এলো। বার্তাটি ছিল খুব সরল—ফর্সা হও, জীবন সুন্দর হবে।
এটি শুধু একটি প্রসাধনীর বিজ্ঞাপন ছিল না। এটি মানুষের মনে একটি ধারণা ঢুকিয়েছে—তোমার বর্তমান চেহারাটি যথেষ্ট নয়।
আমাদের ভাষার মধ্যেও লুকিয়ে আছে বর্ণবাদ
রঙবৈষম্য শুধু বিয়ের আলোচনায় নেই। আমাদের দৈনন্দিন ভাষার মধ্যেও আছে।
‘কালো মেয়ে।’
‘কালো ছেলে।’
‘রোদে গেলে কালো হয়ে যাবি।’
‘ফর্সা হলে আরও সুন্দর লাগত।’
আমরা এসব কথা এমনভাবে বলি, যেন এগুলো নিছক মন্তব্য। কিন্তু শব্দেরও স্মৃতি থাকে।
একটি শিশুকে যদি বারবার বলা হয়, সে কালো এবং সেই শব্দটি প্রতিবার হাসি, আফসোস কিংবা অবজ্ঞার সঙ্গে বলা হয়, তাহলে শিশুটি একসময় বুঝে যায়—তার শরীরে এমন কিছু আছে, যা সমাজ পছন্দ করে না। তারপর সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখকে অন্যের চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করে। এই জায়গাটিই সবচেয়ে ভয়ংকর।
শিক্ষিত হয়েও আমরা কেন বদলাই না?
আমরা উচ্চশিক্ষিত হচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছি। মানবাধিকার, নারী অধিকার ও সমতার কথা বলছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈষম্যের বিরুদ্ধে পোস্ট দিচ্ছি। তারপর বাড়ি ফিরে বিয়ের জন্য মেয়ের ছবি দেখে বলছি—‘ফর্সা হলে ভালো হতো।’
আমরা অন্য দেশের বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি, কিন্তু নিজের ঘরের কথোপকথনে একই আচরণকে বলি—‘এটা তো আমাদের সামাজিক বাস্তবতা।’ এটাই কি আমাদের সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি নয়?
এবার আয়নাটা আমাদের দিকে ফেরাই
পরিবর্তন শুরু করতে হলে পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে।
শিশুকে ফর্সা হলে বেশি সুন্দর, কালো হলে কম সুন্দর—এই শিক্ষা দেওয়া বন্ধ করতে হবে। নবজাতককে দেখে তার ত্বকের রঙের প্রশংসা না করে তার সুস্থতা নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। সন্তানকে রোদে খেলতে দেখে ‘কালো হয়ে যাবি’ না বলে বলা যেতে পারে, ‘সানস্ক্রিন দাও, ত্বকের যত্ন নাও।’
পার্থক্যটা ছোট, কিন্তু বার্তাটা বড়।
একটি ছেলে বন্ধুর গায়ের রং নিয়ে মজা করলে তাকে থামাতে হবে। একটি মেয়ে নিজের গায়ের রং নিয়ে কাঁদলে তাকে বদলানোর পরামর্শ না দিয়ে তার কষ্টটা বুঝতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বিয়ের সময় সন্তানের সামনে গায়ের রংকে যোগ্যতা হিসেবে আলোচনা করা বন্ধ করতে হবে।
দরকার আমাদের চোখের অভ্যাস বদলানো
যে চোখ এতদিন মানুষ দেখার আগে তার রং দেখেছে, সেই চোখকে এবার একটু মানুষ দেখতে শেখাতে হবে।
হয়তো সেদিন হাসান মাসুদের মতো কাউকে আর বলতে হবে না—‘আমি তো কালো মানুষ, আমার কেমনে বিয়ে হবে?’
কারণ তখন আমরা বুঝতে শিখব—মানুষের রং নয়, মানুষের পরিচয় তার মানবিকতায়। আর সত্যিকারের পরিবর্তন তখনই হবে, যখন আমরা শুধু অন্যের রং নয়, নিজের ভেতরের অন্ধকারটুকুও দেখতে শিখব।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।
এইচআর/এএসএম