একদিন ভোরে শহরের ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষকে দেখে মনে হলো, তিনি কোথাও যাচ্ছেন না। চারপাশে মানুষ ছুটছে—কেউ অফিসে, কেউ স্কুলে, কেউ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে, কেউ হাসপাতালের দিকে। গাড়ির হর্ন, মানুষের কোলাহল, মোবাইল ফোনের শব্দ—সব মিলিয়ে জীবন যেন এক অবিরাম দৌড়। অথচ সেই মানুষটি স্থির। তাঁর চোখে এমন এক প্রশ্ন, যার উত্তর কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল, ব্যাংক হিসাব কিংবা চাকরির পদবি দিতে পারে না—জীবন আসলে কী?
এই প্রশ্নটি পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো প্রশ্নগুলোর একটি। মানুষ সভ্যতা নির্মাণের আগে থেকেই সম্ভবত এই প্রশ্ন করেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রযুক্তি যত এগিয়েছে, সম্পদ যত বেড়েছে, মানুষের আয়ু যত দীর্ঘ হয়েছে, প্রশ্নটি ততই গভীর হয়েছে। কারণ জীবনকে আরামদায়ক করা আর জীবনকে অর্থপূর্ণ করা এক জিনিস নয়।
আমরা প্রায়ই জীবনকে সাফল্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। ভালো চাকরি, বড় বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংকে টাকা, সামাজিক পরিচিতি—এসব অর্জনকে জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষ উপলব্ধি করেন, অর্জনের তালিকা দীর্ঘ হলেও ভেতরে কোথাও যেন শূন্যতা রয়ে গেছে। তখন প্রশ্ন ওঠে—আমি এত কিছু পেলাম, কিন্তু কী পেলাম?
মৃত্যু একদিন আমাদের সব অর্জনের হিসাব বন্ধ করে দেবে। তখন ব্যাংক ব্যালান্স, পদবি, ক্ষমতা কিংবা খ্যাতি আমাদের হয়ে কথা বলবে না। কথা বলবে আমাদের আচরণ, আমাদের সম্পর্ক, আমাদের রেখে যাওয়া ভালোবাসা এবং মানুষের মনে আমাদের তৈরি করা স্মৃতি।
আধুনিক সমাজের বড় সংকট সম্ভবত এখানেই। আমরা কীভাবে সফল হতে হয় তা শিখছি; কিন্তু কীভাবে অর্থপূর্ণভাবে বাঁচতে হয়, তা শেখার সুযোগ খুব কম।
হার্ভার্ডের দীর্ঘমেয়াদি ‘Study of Adult Development’ পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘস্থায়ী গবেষণাগুলোর একটি। প্রায় আট দশক ধরে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, সুখ ও সম্পর্কের ওপর গবেষণা চালিয়ে গবেষকেরা দেখেছেন, দীর্ঘমেয়াদে মানুষের ভালো থাকার সবচেয়ে শক্তিশালী পূর্বাভাসগুলোর একটি হলো উষ্ণ, বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক। অর্থাৎ জীবনের শেষ হিসাব কেবল কত টাকা ছিল, কত বড় পদে ছিলেন কিংবা কত সম্পদ রেখে গেলেন—সেটি নয়; বরং কার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, কে আপনাকে ভালোবাসত এবং আপনি কাকে ভালোবাসতে পেরেছিলেন, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই সত্যটি আমরা জানি, কিন্তু জীবনযাপনে অনেক সময় ভুলে যাই।
শৈশবে আমরা ভাবি, পরীক্ষায় ভালো করলে জীবন সুন্দর হবে। কৈশোরে মনে হয়, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তারপর চাকরি, পদোন্নতি, বিয়ে, বাড়ি, সন্তান—প্রতিটি ধাপকে আমরা পরবর্তী সুখের দরজা মনে করি। কিন্তু একটি দরজা পেরোনোর পর দেখা যায়, সামনে আরও একটি দরজা। এভাবে জীবন কখনো ‘এখন’-এ এসে দাঁড়ায় না; সব সময় ‘পরে’ ভালো থাকার প্রস্তুতি নিতে থাকে।
‘আর একটু হলে’—এই দুটি শব্দ আধুনিক মানুষের জীবনের অন্যতম বড় ফাঁদ।
আরও একটু টাকা হলে, আরও ভালো চাকরি হলে, সন্তান প্রতিষ্ঠিত হলে, ঋণ শোধ হলে, অবসর নিলে—তারপর শান্তিতে থাকব। কিন্তু সেই ‘তারপর’ অনেকের জীবনে আর আসে না।
জীবন তাই কেবল ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করার নাম নয়। ভবিষ্যৎ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু বর্তমানকে বিসর্জন দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে গেলে একসময় দেখা যায়, ভবিষ্যৎ এসে গেছে, অথচ বেঁচে থাকার অভ্যাসটি হারিয়ে গেছে।
জাপানি সংস্কৃতিতে ‘ইকিগাই’ শব্দটি বহুল আলোচিত—সহজভাবে যার অর্থ জীবনের অর্থ বা বেঁচে থাকার কারণ। ধারণাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ শুধু আয় করার জন্য বাঁচে না। এমন কিছু প্রয়োজন, যার জন্য সকালে ঘুম থেকে ওঠার মধ্যে আনন্দ আছে। সেটি বড় কোনো সামাজিক অবদান হতে পারে, আবার হতে পারে বাগানে গাছের যত্ন নেওয়া, বই পড়া, সন্তানকে সময় দেওয়া, বন্ধুর পাশে দাঁড়ানো কিংবা অন্যের উপকারে আসা।
জীবনের অর্থ সব মানুষের জন্য এক নয়। কারও কাছে পরিবার, কারও কাছে জ্ঞান, কারও কাছে সৃজনশীলতা, কারও কাছে মানবসেবা, কারও কাছে ধর্মীয় বিশ্বাস, আবার কারও কাছে নিঃশব্দে ভালো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
তাই অন্যের জীবনের মাপকাঠি দিয়ে নিজের জীবনকে মাপা বিপজ্জনক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই তুলনাকে আরও ভয়াবহ করেছে। সেখানে আমরা অন্যের জীবনের সম্পাদিত সংস্করণ দেখি—সফলতা, ভ্রমণ, হাসি, নতুন গাড়ি, নতুন বাড়ি, পুরস্কার, পদোন্নতি। নিজের জীবনের ক্লান্ত, অসম্পূর্ণ, ব্যর্থ ও অগোছালো অংশের সঙ্গে অন্যের সাজানো ছবির তুলনা করে মানুষ অকারণে নিজেকে ব্যর্থ মনে করতে শুরু করে।
অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ তার নিঃসঙ্গ রাতের ছবি পোস্ট করে না। ঋণের বোঝা, দাম্পত্যের অশান্তি, চাকরি হারানোর ভয়, সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব, অসুস্থতার আতঙ্ক কিংবা নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই—এসব সাধারণত ক্যামেরার বাইরে থাকে।
ফলে আমরা অন্যের জীবনের ‘হাইলাইট’ দিয়ে নিজের জীবনের ‘ব্যাকস্টেজ’ বিচার করি।
এটি সুখের জন্য বিপজ্জনক।
সুখ কি তাহলে কেবল আনন্দ? সম্ভবত নয়। জীবনে দুঃখ থাকবে, ব্যর্থতা থাকবে, বিচ্ছেদ থাকবে, মৃত্যু থাকবে। যে জীবন দুঃখকে অস্বীকার করে, সে জীবন বাস্তবতাকেই অস্বীকার করে। বরং অর্থপূর্ণ জীবন হলো এমন একটি জীবন, যেখানে দুঃখের মধ্যেও অর্থ খুঁজে নেওয়া যায়।
অস্ট্রীয় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ভিক্টর ফ্রাঙ্কল নাৎসি বন্দিশিবিরে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েও মানুষের জীবনে অর্থের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে ছিল—মানুষ সব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও, পরিস্থিতির প্রতি নিজের অবস্থান বেছে নেওয়ার একটি মানসিক স্বাধীনতা অনেক সময় ধরে রাখতে পারে। এই ধারণা আমাদের শেখায়, জীবনের অর্থ সব সময় সুখের মধ্যে পাওয়া যায় না; কখনো কখনো প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষ তার জীবনের অর্থ আবিষ্কার করতে পারে।
আমাদের সমাজে এই উপলব্ধির প্রয়োজন অনেক বেশি।
আমরা সন্তানকে বলি, ‘বড় হও, সফল হও।’ কিন্তু খুব কমই বলি, ‘ভালো মানুষ হও, মানুষের পাশে দাঁড়াও, নিজের সঙ্গে সৎ থাকো।’ আমরা নম্বরের মূল্য শেখাই, কিন্তু ব্যর্থতার সঙ্গে কীভাবে বাঁচতে হয় তা শেখাই না। আমরা প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করি, কিন্তু একাকিত্বের জন্য প্রস্তুত করি না। আমরা অর্থ উপার্জনের শিক্ষা দিই, কিন্তু সময়ের মূল্য শেখাই না।
ফলে অনেক মানুষ জীবনের মাঝপথে এসে আবিষ্কার করেন, তাঁরা যা চেয়েছিলেন তা পেয়েছেন, কিন্তু কেন চেয়েছিলেন—সেই প্রশ্নটির উত্তর কখনো খোঁজেননি।
জীবন মানে শুধু দীর্ঘ সময় পাওয়া নয়; পাওয়া সময়কে অর্থপূর্ণ করে তোলাও জীবন।
এর জন্য সব সময় বড় কিছু করতে হয় না। একটি অসুস্থ মানুষের হাত ধরা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে বসে কিছুক্ষণ কথা বলা, সন্তানের কথা মন দিয়ে শোনা, বন্ধুর বিপদে পাশে দাঁড়ানো, নিজের ভুল স্বীকার করা, অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করা—এসব ছোট কাজই জীবনের বড় অর্থ তৈরি করতে পারে।
সমাজও যদি শুধু উৎপাদনশীল মানুষ তৈরি করতে চায়, তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে যন্ত্রে পরিণত হবে। আমাদের দরকার দায়িত্বশীল, সহমর্মী ও চিন্তাশীল মানুষ। অর্থনীতি মানুষের জন্য; মানুষ অর্থনীতির জন্য নয়। প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করার জন্য; মানুষ প্রযুক্তির দাস হওয়ার জন্য নয়।
জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে কেউ সাধারণত আফসোস করেন না যে, ‘আমি আরও কয়েকটি ই-মেইল পাঠাতে পারতাম’, ‘অফিসে আরও কয়েক ঘণ্টা বসতে পারতাম’ কিংবা ‘আরও একটি পদোন্নতি পেতে পারতাম’। আফসোস অনেক সময় অন্য জায়গায় থাকে—আরও একটু সময় দিতে পারতাম, আরও একটু ভালোবাসতে পারতাম, আরও কিছু কথা বলা হয়ে ওঠেনি, নিজের মতো করে বাঁচার সাহস করিনি।
তাই জীবন মানে কী—এই প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই। জীবন মানে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের ব্যবধানও নয়। জীবন মানে সম্পর্ক, দায়িত্ব, ভালোবাসা, সংগ্রাম, ভুল, ক্ষমা, আশা, স্মৃতি এবং অর্থের সন্ধান। জীবন মানে কখনো জিতে যাওয়া, কখনো হেরে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানো। জীবন মানে অন্যের জীবনে নিজের উপস্থিতির একটি মানবিক চিহ্ন রেখে যাওয়া।
শেষ পর্যন্ত আমরা কত বছর বেঁচেছি, সেটি হয়তো ইতিহাসের একটি সংখ্যা। কিন্তু কত মানুষের হৃদয়ে আমরা জায়গা করে নিয়েছি, কত অন্ধকারে আলো জ্বালতে পেরেছি, কত মানুষের কষ্ট একটু কমাতে পেরেছি—সেটিই জীবনের গভীরতর হিসাব।
মৃত্যু একদিন আমাদের সব অর্জনের হিসাব বন্ধ করে দেবে। তখন ব্যাংক ব্যালান্স, পদবি, ক্ষমতা কিংবা খ্যাতি আমাদের হয়ে কথা বলবে না। কথা বলবে আমাদের আচরণ, আমাদের সম্পর্ক, আমাদের রেখে যাওয়া ভালোবাসা এবং মানুষের মনে আমাদের তৈরি করা স্মৃতি।
সুতরাং জীবনকে বড় করার চেয়ে অর্থপূর্ণ করা জরুরি। দীর্ঘ জীবন সৌভাগ্য হতে পারে; কিন্তু অর্থপূর্ণ জীবনই প্রকৃত অর্জন। আমরা কতটা পেয়েছি, তার চেয়ে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হয়তো আরও সহজ—আমরা কতটা মানুষ হয়ে বেঁচেছি?
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। drharun.press@gmail.com
এইচআর/এএসএম