মো. সামিউর রহমান সাজ্জাদ
অনেক দিন হলো কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না। ভাবলাম কোথাও যাওয়া ফরজ হয়ে গেছে। সকালে অফিস, রাতে বাসা—এই ক্যালকুলেটরের মতো জীবন আর ভালো লাগছে না। এমন চাকরি করি যে, ছুটিছাটা পাই না বললেই চলে। ভাবলাম কুরবানির ঈদের ছুটিটাকে কাজে লাগাতে হবে। সময়টা ২০২৫ সালের জুন মাস। কোরবানির ঈদের সাতদিনের লম্বা ছুটি পেয়েছি। মূলত ঈদের নানা ঝক্কিঝামেলা পেরিয়ে হাতে আর চারদিন সময় আছে। ভাবলাম বান্দরবান ঘুরতে যাই। প্রথাগত ভ্রমণ গাইড অনুসরণ না করে ভিন্ন স্বাদ নিতেই আমাদের এই যাত্রা।
যেহেতু এখনো বিয়ে করিনি। তাই ব্যাচেলর বন্ধুরাই ভরসা। বান্দরবান গেলে ৪-৫ জন বন্ধু হলেই যথেষ্ট, খরচও কম হয়। মজার কোনো কমতি নেই। তাই আমাদের ব্যাচের বাকি ৩ জনকে বললাম যে, চলো যাই। কিন্তু শেষমেশ ২ জন রাজি হলো—আমি, বাবু আর তুহিন। ৯ জুন বিকেল ৫টায় আমরা মিরপুর ১০ গোলচক্কর থেকে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। মেট্রোরেলে চড়ে মতিঝিল গেলাম। সেখান থেকে রিকশায় চড়ে কমলাপুর পৌঁছাতে রাত ৮টা বেজে গেল। আমাদের ট্রেন চট্টগ্রাম মেইল ছাড়বে রাত সাড়ে ১০টায়।
তিনজন টিকিট কেটে ট্রেনে চড়ে বসলাম। সন্ধ্যায় সামান্য নাস্তা খেয়েছিলাম। তাই প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছিল। ভাগ্যিস ট্রেনে চড়ার আগেই বাবু রুটি-কলা কিনে নিয়েছিল। সেগুলো খেয়ে তিন বন্ধু রাত কাটালাম। তুহিন একটু পর পর ট্রেনের গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে আর একটার পর একটা সিগারেট ধরাচ্ছে। আমি আবার ওসব খাই না। পরদিন সকাল ৭টায় আমরা চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছালাম। আমাদের মতো অসংখ্য মানুষ এই লম্বা ছুটি কাটাতে চট্টগ্রাম এসেছে। এখান থেকে নেমে কেউ যাবে রাঙ্গামাটি, কেউ খাগড়াছড়ি, কেউ বান্দরবান আবার কেউ কক্সবাজার।
স্টেশন থেকে একটা সিএনজিতে চড়ে চট্টগ্রাম নতুন ব্রিজে নামলাম। সকালের নাস্তা সেরে আমরা বান্দরবানের বাসের টিকিট কেটে বাসে উঠে পরলাম। চট্টগ্রাম নতুন ব্রিজ থেকে বাসে উঠে ৩ ঘণ্টার জার্নি শেষে বান্দরবান বাস স্টেশনে নামলাম। এখন আমাদের হোটেল খোঁজার পালা। কারণ আগামী ৩ দিন আমরা এখানেই থাকব। বাজারের আশেপাশের কিছু হোটেল দেখে আমাদের পছন্দ হলো না। তাই ভাবলাম, আরেকটু ভেতরের দিকে গিয়ে দেখি। হাঁটতে হাঁটতে আমরা বান্দরবান সেনানিবাসের মেইন গেটের সামনে এসে পরেছি। কিন্তু মনমতো হোটেল পাচ্ছি না। শেষমেশ একটা চায়ের দোকানে গিয়ে চা খেতে খেতে এক দাদার (বান্দরবানে সবাই লোকালদের দাদা বলেই সম্বোধন করেন) সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, শিশুপার্কের থেকে ২০ গজ সামনে গেলে একটা ছোট পাহাড় আছে। সেটার চূড়ায় একটা কটেজ আছে। যেখান থেকে পুরো বান্দরবান শহর দেখা যায়।
আরও পড়ুন
পাহাড়ে ঘুরতে গেলে হঠাৎ বন্যা ও ভূমিধস হলে কী করবেন?
আমরা তিনজন তিনজনের দিকে তাকালাম। দেরি না করে দ্রুত সেখানে গেলাম। গিয়ে দেখি প্রায় দশতলা ভবনের সমান উঁচু একটা খাঁড়া পাহাড়। গেটের সামনে আসতেই দুটি কুকুর আমাদের অভ্যর্থনা জানাল। বেশ কষ্টে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম। ঠিক কটেজ বলা যাবে না। ৬ রুমের একটু টিনশেডের বাসা। দাদা আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে রুমে নিয়ে গেলেন। তখন বিকেল ৪টা। ভাবলাম আজ আর কোথাও যাব না। আশেপাশের কিছু এলাকা টহল দিতে তিন বন্ধু বের হলাম। কাছেই একটা পাহাড় ছিল বেশ খাঁড়া। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। এই সময়ে এই খাড়া পাহাড়ে ওঠা কিছুটা বিপজ্জনক। অ্যাডভেঞ্চারের নেশা আমাদের পেয়ে বসেছে। সিদ্ধান্ত নিলাম, যত কঠিনই হোক পাহাড়ে উঠতেই হবে।
কিছুটা ওপরে উঠতেই একজন নারী আমাদের দেখে হকচকিয়ে উঠলেন। তিনি আমাদের বললেন, ‘এখানে কী?’ আমরা বললাম যে, আমরা আশেপাশে ঘুরতে এসেছি। প্রথমে তিনি আমাদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বললেন, ‘আপনারা পাহাড় দেখতে এসেছেন, এদিকে একটা সুন্দর জায়গা আছে, আসেন আমার সাথে।’ আমরা কিছু না ভেবে তার পিছু পিছু যাচ্ছিলাম। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে রোমাঞ্চ। সেই নারী তার গরুটিকে নিয়ে আগে যাচ্ছেন আর আমরা পিছে। একটু পর আমরা সেই পাহাড়ের প্রায় চূড়ায় উঠে গিয়েছি। চমৎকার একটি জায়গায়। ঠিক ভিউপয়েন্ট বলা যাবে না। তবে মনে হচ্ছিল, বৃষ্টির মাঝে এত কাঠখড় পুড়িয়ে পাহাড়ে ওঠার সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল।
পাহাড় থেকে নামতে নামতে মাগরিবের আজান হয়ে গেল। আমরাও নিচে নেমে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। সেদিন রাতে বান্দরবান বাজারে ঘুরলাম। সবাই হরেক রকম পাহাড়ি শাক-সবজি, ফলমূল, শুঁটকি, পিঠা ইত্যাদির পসরা সাজিয়ে ক্রেতার অপেক্ষা করছেন। কিছুক্ষণ ঘুরে রাতের খাবার খেলাম ভাত, মিক্সড সবজি, পাহাড়ি মুরগি ভুনা আর ডাল দিয়ে। এরপর সবাই হোটেলে গিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।
শৈলপ্রপাতে অ্যাডভেঞ্চার
আমরা কয়েকটি বিখ্যাত স্পট ঘুরে দেখব বলে ঠিক করলাম। সে উদ্দেশ্যে প্রথমে শৈলপ্রপাত ঝরনায় গেলাম। সেখানে অনেক পর্যটক এসেছেন। বেশ জমজমাট পরিস্থিতি। শৈলপ্রপাত ঝরনার মূল আকর্ষণ এর পাদদেশে গোল গোল ছোট ছোট চৌবাচ্চার মতো জায়গা। যেখানে আরাম করে বসে থাকা যায়। কিন্তু মানুষের হই-হট্টগোলের কারণে দাঁড়ানোরও জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। তাই আমরা তিন বন্ধু একটু অ্যাডভেঞ্চারের উদ্দেশ্যে ঝরনার ঝিঁরিপথ ধরে ধরে সামনে এগোচ্ছি আর সৃষ্টিকর্তার তৈরি নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করছি। প্রায় ২০ মিনিট হাঁটতে হাঁটতে বেশ ভেতরে চলে এসেছি। পাশেই একটা সিমেন্টের সিঁড়ি। এমন সময় তুহিন বলল, ‘চল, আমরা এই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দেখি কী আছে?’
আরও পড়ুন
হাওরের নীল জলে নিজেকে খোঁজার গল্প
বলতে না বলতেই তুহিন সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠা শুরু করল। বাবু আর আমি তুহিনকে অনুসরণ করলাম। ৩০-৪০ ধাপ পরেই ছোট একটা পাহাড়ের চূড়ায় নিজেদের আবিষ্কার করলাম। অল্প দূরেই একটা জুমঘর। তিনজন মিলে জুমঘরের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। পাহাড়ের গা বেয়ে নানা ধরনের ফলের বাগান। আনারস, আমবাগানই বেশি। আমরা সেই জুমঘরে বসে গাছ থেকে আম পেরে খেলাম। পাহাড়ি আম খুব মিষ্টি। গাছের নিচে শত শত আম পড়ে আছে, কিন্তু খাওয়ার লোক নেই।
ঝরনা দেখা শেষ করতে করতে দুপুর হয়ে গেছে। এবার ভাবলাম খাওয়া-দাওয়া করা দরকার। কিন্তু কাছে কোথাও বাজার নেই। তাই আম খেয়ে পেট ভরে আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে রওয়ানা দিলাম। পাহাড়ে এখন সব জায়গায় থ্রিজি নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। গুগল ম্যাপে দেখলাম, আমরা নীলাচল পাহাড়ের খুব কাছেই আছি। শৈলপ্রপাত ঝরনা থেকে অ্যাডভেঞ্চার করতে করতে আমরা প্রায় ৬ কিমি হেঁটে নীলাচল পাহাড়ে চলে এসেছি। তাই দেরি না করে আবার হাঁটা শুরু করলাম। নীলাচল পাহাড়ে ওঠার ২টা রাস্তা। পুরোনো রাস্তাটা খুব খাঁড়া। তাই নতুন আরেকটি রাস্তা করা হয়েছে। আমরা পুরোনো রাস্তা বরাবর হাঁটা শুরু করলাম। নীলাচলে প্রবেশ করতে টিকিট কাটতে হয়। তবে পুরোনো রাস্তার গেট বন্ধ। তাই উপায় না পেয়ে টিকিট না কেটে গেটের পাশ দিয়ে আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম।
পিচঢালা রাস্তা দিয়ে হাঁটছি আর আশেপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করছি। এর মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। পাহাড়ের আবহাওয়া খুবই অদ্ভুত। এই ঠা ঠা রোদ আবার এই ঝুম বৃষ্টি। যখন আমরা আম বাগানে ছিলাম; তখন প্রচণ্ড রোদ ছিল কিন্তু এখন আবার ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। নীলাচলের চূড়ায় উঠে দেখি সেখানে সবাই পরিবার-পরিজন নিয়ে এসেছেন। হাঁটতে হাঁটতে তখন আমরা ক্লান্ত। তাই পাহাড়ের চূড়ায় একটা হোটেলে গিয়ে সবজি, আলুভর্তা, গরুর গোশত ভুনা দিয়ে পেট ভরে ভাত খেলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বিকেলে নীলাচল পাহাড়ের চূড়ায় বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় আমাদের হোটেলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম।
বান্দরবানে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার মাধ্যম খুবই সীমিত। যেমন- চান্দের গাড়ি, সিএনজি, মাহিন্দ্রা, আর মোটরসাইকেল। তাছাড়া ভাড়া তুলনামূলক বেশি। নীলাচল থেকে বান্দরবান শহরে সিএনজি ভাড়া ৬০০ টাকা। উপায় না পেয়ে আমরা সেই সিএনজিতে চড়ে শহরে এলাম। বান্দরবানের প্রতিটি কোনায় কোনায় কিছু না কিছু দেখার আছে। মূলত ট্যুরিস্ট স্পট যেগুলো আছে; সেগুলো ছিমছাম গোছানো, সব সুযোগ-সুবিধা আছে। কিন্তু আমাদের ইচ্ছা ছিল মূলধারার বাইরে গিয়ে ঘোরাঘুরি করা। তাই আমরা নিজেদের মন-মর্জি মতো যখন যেখানে খুশি গিয়েছি।
আরও পড়ুন
বৈচিত্র্যময় অপরূপ পাহাড়ি জনপদ কলমাকান্দা
দেবতাখুমে বৃষ্টি
২০২৫ সালের ১২ জুন। রোদ ঝলমলে সকাল। আমাদের ভ্রমণের তৃতীয় দিন। তাই ভাবলাম, আজ একটু বেশি স্পট ঘুরব। সেই উদ্দেশ্যে সকাল ৮টায় দেবতাখুমের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। কিন্তু আমাদের জন্য অন্য কিছু অপেক্ষা করছিল। বান্দরবানে দূর থেকে এক পাহাড় দেখলে মনে হবে এটাই সবচেয়ে বড়। কিন্তু সেখানে উঠলে মনে হবে, না অই দূরের পাহাড় আরও বেশি বড়। বান্দরবান শহর থেকে মাহিন্দ্রায় চড়ে রোয়াংছড়ি এলাম। সেখানে একটা চায়ের দোকানে বসে সামনে সিপি পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত হলাম আর মনে মনে বললাম, এরপর এলে এই পাহাড়ে অবশ্যই যাব।
সেখান থেকে সিএনজি চড়ে কচ্ছপতলী বাজারে গেলাম। সেখান থেকে গাইড ঠিক করে দেবতাখুম গেলাম। আমাদের ভাগ্য ভালোই বলতে হবে। কারণ জুন মাস হওয়া সত্ত্বেও দেবতাখুমে তখন পানি কিছুটা কম। কারণ পাহাড়ি ঢল তখনো নামেনি। কচ্ছপতলী বাজার থেকে গাইড ঠিক করে সবাই সবার তথ্য দিয়ে ফর্ম পূরণ করলাম। সেখানে আগেই দুপুরের খাবার অর্ডার দিয়ে যেতে হয়। সেনাবাহিনীর চেকপোস্টে সবার নাম এন্ট্রি করে আমরা দেবতাখুমের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। বাজার থেকে চান্দের গাড়ি চড়ে কিছুদূর যাওয়া যায় কিন্তু তারপর ৪০ মিনিট পুরোটাই হাঁটার রাস্তা। আমরা পাহাড়ের গা ঘেঁষে আস্তে আস্তে হাঁটছি। কারণ বর্ষাকালে পাহাড়ের রাস্তা পিচ্ছিল থাকে। প্রায় ৪০ মিনিট হাঁটার পর একটি পাড়ায় এলাম। পাড়া পার হতেই দেবতাখুমের নেমপ্লেট দেখতে পেলাম।
সেখানে একটা অস্থায়ী ক্যাম্প আছে। যেখানে ব্যাগ রেখে পুনরায় সবার নাম এন্ট্রি করে আবার হাঁটা শুরু করলাম। কিছুদূর হাঁটার পর একটা ছোট নৌকায় চড়ে মূল খুমের দিকে গেলাম। খুমের কাছে গিয়ে শুনি এখানে সিরিয়াল ধরতে হবে। খুমের ভেতরে যাওয়ার উপায় দুটি। যারা সাঁতার পারে না; তাদের জন্য নৌকা আর যারা সাঁতার পারে; তাদের জন্য বাঁশের ভেলা। খুমের ভেতরে কোথাও কোথাও ৩০-৫০ ফিট গভীর। আমি সাঁতার পারি না কিন্তু তবুও আমি বাঁশের ভেলা নিয়ে ভেতরে গেলাম। একটি ভেলায় তুহিন একা আর আরেকটা ভেলায় আমি আর বাবু। আমি জীবনে ভেলায় উঠিনি। তাই কীভাবে চালাতে হয় জানি না। কিন্তু বাবু দেখলাম ভালই চালাচ্ছে। ওকে দেখে আমিও ভেলা চালানোর বৃথা চেষ্টা করলাম।
খুমের ভেতরে অদ্ভুত সুন্দর। কোনো কোলাহল নেই, দূষিত বাতাস নেই। খুমের ভেতরে যাওয়া কঠিন। কারণ স্রোতের বিপরীতে যেতে হয়। কিন্তু ফেরত আসা একদম সহজ। কারণ তখন স্রোতের অনুকূল পাওয়া যায়। আমরা ভেলা নিয়ে কিছুদূর যেতেই বৃষ্টি শুরু হলো। খুমের শেষ মাথায় একজন গার্ড থাকেন, যার কাজ পাহাড়ি ঢল এলেই সবাইকে সতর্ক করা। বৃষ্টি শুরু হতে না হতেই সেই গার্ড আমাদের চিৎকার করে বলছেন, ‘ঢল আসছে, ফিরে যান।’ তাই আমরা দেরি না করে দ্রুত ফিরে গেলাম।
আরও পড়ুন
রাঙ্গামাটির দুর্গম অরণ্যে নান্দনিক সব পাহাড়ি ঝরনা
খুম দেখা শেষ করে কচ্ছপতলী বাজারে আসতে আসতে বিকেল হয়ে গেল। ঘড়িতে তখন ৫টা বাজে। কোথায় ভাবলাম অনেকগুলো স্পট ঘুরে দেখব কিন্তু শুধু দেবতাখুম ঘুরতেই একদিন শেষ। বাজারে ফেরত এসে দুপুরের খাবার খেলাম। এরপর পুনরায় বান্দরবান শহরের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। কিন্তু আমরা তো সিএনজি করে এসেছি আর তখন বেশ রাত হয়ে গেছে। আমাদের গাইড বললেন, একটু পর আর গাড়ি পাওয়া যাবে না। তাই তাড়াতাড়ি আমরা একটা সিএনজি ঠিক করতে গেলাম। কিন্তু বেশি ভাড়া চাওয়ায় আমরা সেটায় না উঠে আরেকটির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু আর সিএনজি আসে না। শেষমেশ দাদা তার ডিস্কোভার ১২৫ সিসি বাইক এনে আমাদের উঠতে বললেন। প্রথমে অবাক হলেও দাদার উপস্থিত বুদ্ধি দেখে আশ্চর্য হয়ে কিছু না ভেবে দ্রুত বাইকে আমরা তিন বন্ধু উঠে পরলাম। দাদা কচ্ছপতলী বাজার থেকে বাইকে করে আমাদের রোয়াংছড়ি পৌঁছে দিলেন। দাদাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা বিদায় নিলাম।
চিম্বুকে মেঘের নৃত্য
আমাদের ভ্রমণের চতুর্থ এবং শেষ দিন। তাই সবাই সবার ব্যাগ গুছিয়ে হোটেলে রেখে চিম্বুক পাহাড়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। বান্দরবান বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি চিম্বুক যাওয়ার বাস আছে। টিকিট কেটে তিন বন্ধু বাসে চড়ে বসলাম। কিন্তু প্রচণ্ড ভিড় দেখে আমি বাবুকে বললাম, চল বাসের ছাদে উঠি। এই কথা বলতে বলতে বাস সেনাবাহিনীর চেকপোস্টে এসে দাঁড়াল। চেকিং করা শেষ, বাস ছেড়ে দিয়েছে। আমি তুহিনের সাথে কথা বলছি এমন সময় দেখি বাবু বাসের গেটের পাশের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে ছাদে উঠছে। প্রথমে আমি একটু ইতস্তত করছিলাম কিন্তু তুহিন বলল কিচ্ছু হবে না, চল। তুহিনের দেখাদেখি আমিও ছাদে উঠে বসলাম আর আশেপাশের পরিবেশ উপভোগ করা শুরু করলাম। এই ভ্রমণে আমার অনেক নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে। কারণ এর আগে আমি কখনো বাসের ছাদে উঠিনি।
চিম্বুক পাহাড়ের পাদদেশে বাস আমাদের নামিয়ে দিলো। বাস থেকে নামতেই একজন অপরিচিত ব্যক্তি বললেন, ‘ভাই এই পানির গ্যালনটা নিতে আমাকে একটু সাহায্য করবেন।’ আমি অবশ্যই বলে তার হাত থেকে গ্যালন নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। পরে তার সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, এখানে পানির খুব সমস্যা। বিশেষ করে খাবার পানি অনেক দূর থেকে আনতে হয়। তাই সেই ব্যক্তি শহর থেকে বড় গ্যালনে করে খাবার পানি নিয়ে আসেন।
চিম্বুক পাহাড়ে যখন উঠলাম; তখন বেশ রোদ ছিল। কিন্তু মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে আবার বৃষ্টি শুরু হলো। আমি তুহিনকে বললাম, ভালোই হলো, চিম্বুক থেকে রোদ-বৃষ্টি দুইটা আবহাওয়াই দেখা হয়ে গেল। কিছুক্ষণ সেখানে সময় কাটিয়ে আবার আশেপাশের এলাকা একটু ঘুরে দেখলাম। পাশেই একটা হেলিপ্যাড আছে শুনে সেখানেও গেলাম। হেলিপ্যাডে ওঠার সময় এক অসাধারণ দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম। মেঘগুলো পাহাড়ের চূড়ায় ধাক্কা খেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে, এ যেন মেঘের নৃত্য।
আরও পড়ুন
একদিনের ভ্রমণে চন্ডিছড়া চা বাগানে যা দেখবেন
চিম্বুক থেকে সূর্যোদয় দেখার একটা পয়েন্ট আছে, সেখানে গেলাম। কিছু ছবি তুলে এদিক সেদিক কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে একটা সিএনজিতে চড়ে বান্দরবান শহরে চলে এলাম। যেতে ইচ্ছা করছিল না কিন্তু কী আর করার। তবে আমরা তিনজন প্রতিজ্ঞা করলাম যে, আবার আসব। হোটেল থেকে ব্যাগ নিয়ে সরাসরি বান্দরবান বাস স্টেশনে এলাম। কারণ রাত ৯টা ৩০ মিনিটে আমাদের বাস ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে। তাই রাতের খাবার খেয়ে বাসে উঠতেই ঘুমিয়ে গেলাম। ভোর হতেই বাস আমাদের গাবতলি নামিয়ে দিলো। আমাদের চারদিনের বান্দরবান ভ্রমণ শেষ হলো।
এসইউ