পাকিস্তান ক্রিকেটে একের পর এক বিতর্কের মধ্যেই রহস্যময় এক পোস্ট দিয়ে আলোচনায় এসেছেন দেশটির লেগস্পিনার উসামা মীর। ইংল্যান্ড সফরের মাঝপথে পাকিস্তান টেস্ট দলের সাত ক্রিকেটার ও কোচিং স্টাফদের সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় যখন তুমুল সমালোচনা চলছে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া উসামার একটি পোস্ট নতুন করে কৌতূহল তৈরি করেছে।
কাউকে সরাসরি উল্লেখ না করলেও পাকিস্তান ক্রিকেটের অবস্থা নিয়ে নিজের ক্ষোভ কিংবা হতাশা প্রকাশ করেছেন উসামা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘অবিশ্বাস্য ব্যাপার, কেউ কীভাবে পুরো সিস্টেম ধ্বংস করে দিল, অথচ কেউ সেটি টেরই পেল না।’
এরপর স্থানীয় একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ দিয়ে নিজের বক্তব্যের ইঙ্গিত আরও স্পষ্ট করেন উসামা। তিনি লেখেন, ‘এখন আফসোস করে কী লাভ, পাখি তো ক্ষেতের ফসল খেয়ে ফেলেছে।’
তবে তার পোস্টে কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তিনি কাকে উদ্দেশ্য করে এমন মন্তব্য করেছেন, সেটিও পরিষ্কার করেননি। ফলে পাকিস্তান ক্রিকেটে চলমান অস্থিরতার সঙ্গে তার বক্তব্যের যোগসূত্র নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
ইংল্যান্ড সফরের মাঝপথে বড় পরিবর্তন
সম্প্রতি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) ইংল্যান্ড সফরে থাকা টেস্ট দলের ওপর বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। সাতজন ক্রিকেটার ও কোচিং স্টাফের কয়েকজনকে দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ড। চলমান সফরের মাঝপথে এমন সিদ্ধান্তে পাকিস্তান ক্রিকেটে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।
বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক ক্রিকেটার, কোচ ও সমর্থকদের অনেকে। পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ও কিংবদন্তি রমিজ রাজা এবং দলের সাবেক কোচ মিকি আর্থারও এই সিদ্ধান্তের সমালোচকদের তালিকায় রয়েছেন।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই উসামার রহস্যময় পোস্ট সামনে আসে। যদিও তিনি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়ী করেননি, তার ‘পুরো সিস্টেম ধ্বংস’ মন্তব্যটি পাকিস্তান ক্রিকেটের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে করা বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের বাইরে উসামা
পাকিস্তানের হয়ে এখন পর্যন্ত ১২টি ওয়ানডে ও পাঁচটি টি-টোয়েন্টি খেলেছেন উসামা মীর। লেগস্পিনার হিসেবে জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়া এই ক্রিকেটার সর্বশেষ পাকিস্তানের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় দলের বাইরে রয়েছেন তিনি। ইংল্যান্ড সফরের বর্তমান টেস্ট দলের অংশও নন উসামা। ফলে বাইরে থেকে পাকিস্তান ক্রিকেটের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখেই তিনি এমন মন্তব্য করেছেন বলে মনে করছেন অনেকে। তবে তার পোস্টের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, কিংবা তিনি ঠিক কাকে বা কোন ঘটনাকে ইঙ্গিত করেছেন- এ বিষয়ে উসামার পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
‘পারফরম্যান্সের কারণে শুধু নয়, অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলাও আছে’
উসামার পোস্টের পর পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ ইউসুফও চলমান পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খুলেছেন। ইংল্যান্ড সফরের মাঝপথে খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউসুফ লিখেছেন, ‘চলমান সফর থেকে খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের ফিরিয়ে আনার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি শুধু পারফরম্যান্সের কারণে নেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।’
তার মতে, পাকিস্তান ক্রিকেটে এমন ঘটনা নতুন নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও মতবিরোধেরই প্রতিফলন এবারের ঘটনাতেও দেখা যাচ্ছে।
ইউসুফ আরও লেখেন, ‘সবশেষে আমরা জহির আব্বাস, জাভেদ মিয়াঁদাদ, ইনজামাম-উল-হক কিংবা সাঈদ আনোয়ারের মতো কিংবদন্তিদের বিকল্প হিসেবে পাঠাচ্ছি না। বরং এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তান ক্রিকেটকে দীর্ঘদিন ধরে তাড়া করে আসা অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা, মতবিরোধ ও বিতর্কের সেই পরিচিত চক্রকেই তুলে ধরছে।’
একদিকে ইংল্যান্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সফর চলাকালীন দল ও কোচিং স্টাফে বড় পরিবর্তন, অন্যদিকে সাবেক ক্রিকেটারদের প্রকাশ্য সমালোচনা- সব মিলিয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট আবারও অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে।
উসামা মীরের রহস্যময় পোস্ট সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও তিনি কাউকে সরাসরি দায়ী করেননি, ‘পুরো সিস্টেম ধ্বংস’ হয়ে যাওয়ার মন্তব্যটি নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা।
অন্যদিকে মোহাম্মদ ইউসুফের মন্তব্যও ইঙ্গিত করছে, পাকিস্তান ক্রিকেটের সাম্প্রতিক সমস্যাকে শুধু মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। দলের ভেতরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মতবিরোধ এবং প্রশাসনিক অস্থিরতার বিষয়গুলোও সামনে চলে এসেছে।
তবে উসামা মীরের পোস্টের আসল লক্ষ্য কী ছিল এবং তিনি কোন ব্যক্তি বা ঘটনাকে ইঙ্গিত করেছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তার পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা আসেনি। ফলে পাকিস্তান ক্রিকেটের চলমান সংকটের মধ্যে তাঁর কয়েকটি ক্রিপটিক কথাই আপাতত জন্ম দিয়েছে নতুন জল্পনা।
আইএইচএস/