মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
শেষ কবে জোনাকি পোকা দেখেছেন, বলতে পারবেন? জোনাকি পোকার কথা তো দূরের কথা, আকাশভরা জোছনার আলোও তো এখন আর দেখা হয় না। এই শহর, এই শহরের মানুষগুলো কেমন যেন! তারা ব্যস্ততার অজুহাতে জোছনা আর জোনাকি পোকার জীবন থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছে। আর এই প্রজন্ম মোবাইলের ছোট্ট স্ক্রিনকেই নিজের পৃথিবী বানিয়ে নিয়েছে। অথচ আমাদের শৈশব-কৈশোরের জীবনটা কত সুন্দরই না ছিল! আজ না হয় সে কথাই বলি। আজকের গল্প সত্যি, একদল উচ্ছল মানুষের জীবনের গল্প।
ছোট্ট একটি গ্রাম, দক্ষিণ নাজিরপুর। যে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সন্ধ্যা নদী। আহ, কী অপরূপ তার সৌন্দর্য, আবার একই সঙ্গে কী ভয়াবহতা! নদীর ভরা জলে পা ডুবিয়ে গল্প করতাম। ডিগবাজি খেয়ে পানিতে পড়তাম। কাদায় ফুটবল খেলে এক লাফে নদীতে ঝাঁপ দিতাম। ফুটবল খেলে নদীতে যাওয়ার আগে দেখতাম, কারও গাছে পেয়ারা, বরই এসব আছে কি না।
নাজিরপুর স্কুলের পাশ দিয়ে কয়েকটি বাড়ি পেরিয়ে সন্ধ্যা নদীতে যাওয়ার যে পথ, এতই সুন্দর ছিল, তা বলে বোঝানো যাবে না। এরপর নদী যখন ভেঙে আরও মাঠের কাছে চলে এল, তখন তো ইচ্ছে হলেই নদীতে ঝাঁপ দেওয়া যেত।
তবে নদীর ভয়াবহ দিক হলো তার ভাঙন। নদীভাঙনে কত মানুষ সব হারিয়েছে, তার হিসাব নেই। আমাদের মূল বাড়িটাও নদীর গর্ভে হারিয়ে গেছে। বাবার কবরটাও নদীতে চলে গেছে। বসতবাড়ি, বড় বড় বাগান সবকিছু। এখন পুরো নদীটাই যেন বাবার কবর হয়ে আমার চোখে ধরা দেয়। নদী দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
আরও পড়ুন
মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে শাড়ি-স্যান্ডেল পরে ম্যারাথনে মা
সিদ্দিক ভাইদের একটি বড় নৌকা ছিল ধান-চাল আনার জন্য। নৌকার ভেতরে থাকার সুন্দর ব্যবস্থা ছিল। রান্নাও করা যেত। আমি, সিদ্দিক ভাইয়ের ছেলে ঝিলনসহ আরও অনেকে সেখানে বসে পিকনিক করেছি। নদীতে নৌকা চলছে, আর এদিকে একদল আনাড়ির রান্না-ওহ, সে কী আনন্দ! লিখে বোঝানোর উপায় নেই। আমাদের তখন সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু জীবনে এমন আনন্দের কোনো কমতি ছিল না।
ছাত্তার চাচার নৌকা নিয়ে যখন-তখন নদীতে ঘুরে বেড়াতাম। নদীর ওপারে ধান-চালের বিখ্যাত ভাসমান হাট বসত। সেখানে গিয়ে মুড়ির মোয়া খেতাম। মাত্র পাঁচ টাকায় তখন অনেক মোয়া পাওয়া যেত। সেই মোয়ার স্বাদ এখনো জিভে লেগে আছে।
সবচেয়ে মজা হতো পরীক্ষা শেষ হলে। বাসা থেকে পড়ার চাপ নেই। তখন আমরা দক্ষিণ নাজিরপুর মাঠে বসে আড্ডা দিতাম। চারদিকে জোনাকি পোকা উড়ছে। কেউ একজন চালাকি করে কয়েকটি জোনাকি বোতলে ভরে আনল। এই আড্ডার কোনো নির্দিষ্ট বিষয় ছিল না। যে যার মতো বলে যেত। সাম চাচার দোকান থেকে মুড়ি, চানাচুর আনা হতো। কারণ তখন এই মুড়ি-চানাচুর কিংবা চিড়ার মোয়া কিনে খাওয়াই ছিল অনেক বড় ব্যাপার।
একবার শোনা গেল, ভাগ্নে ইমনের সঙ্গে জাফরিন নামে একটি মেয়ের প্রেম আছে। ইমন তাকে পছন্দ করে। সত্য-মিথ্যা যাচাই করবে কে! ইস্যু পাওয়া গেছে, এটাই বড় কথা। আমরা বললাম, আমাদের রাজহাঁস খাওয়াও, না হলে তোমার বাসায় বলে দেব। আবার পোস্টার ছাপাব, শিরোনাম হবে ‘ইমন-জাফরিনের প্রেমলীলা চলছে হরদম’।
ভয়ে ইমন বেচারা তখন এক হাজার টাকা দিল। ইমনের বাবা বিদেশে ভালো চাকরি করতেন। তাই তাদের টাকার কোনো অভাব ছিল না। আমরা সবাই মিলে সেই টাকা দিয়ে পিকনিক করলাম। নিজের প্রেমসংক্রান্ত ‘ব্ল্যাকমেইলের’ পিকনিক ইমনও বেচারা খুব মজা করে খেল। বারবার বলছিল, ‘মামা, আরেকটু মাংস দেন।’ কী যে মজা হয়েছিল!
আরও পড়ুন
গোপাল ভাঁড় দেখতে দেখতে ভাত খাওয়ার ট্রেন্ড কীভাবে এলো?
দুর্ভাগ্যবশত, ইমনের সঙ্গে জাফরিনের বিয়ে হয়নি। হয়তো প্রেমটা একতরফা ছিল, কিংবা কোনো প্রেমই ছিল না। পুরোটাই গুজব। যাই হোক, আমরা কিন্তু মজা নিতে ভুল করিনি। এভাবেই কোনো ইস্যু পেলেই খানাপিনার আয়োজন হতো। কেউ রাগ করত না। সবাই খুশি মনে অংশ নিত, হাসি-আনন্দে মেতে উঠত।
বন্ধু শাহিনের বাড়ির পেছনে একটি বড় বাগান ছিল। সেখানে বসে সামান্য ডিম দিয়ে আমরা একবার বনভোজন করেছিলাম। আহ, সেই খাবারের কী স্বাদ! মাটি খুঁড়ে চুলা বানানো হয়েছিল। সেই কাঁচা চুলায় কি আর সহজে আগুন জ্বলে! অনেক পরিশ্রম, কিন্তু শান্তি তার চেয়েও বেশি। কলাপাতায় ডিমের তরকারি আর মোটা চালের ভাত। মনে হয়েছিল, এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে মজার খাবার।
গ্রামের প্রেম-ভালোবাসায় জোছনা ছিল এক বড় সঙ্গী। বাড়ির মেয়েরা রাতে বাড়ির পেছনে বাঁশঝাড় বা বড় গাছের আড়ালে এসে দাঁড়াত। প্রেমিক ছেলেটি সেখানে এসে দেখা করত। দেখা বলতে একটু কথা বলা, আর একনজর প্রিয় মানুষটিকে দেখা এটাই ছিল জীবন ধন্য হওয়ার মতো ব্যাপার। বিদায়ের সময় একটি চিঠি হাতে ধরিয়ে দিত।
আমার চাচাতো বোন মিঠু প্রেম করতো আরেক মিঠুর সঙ্গে। একদিন ছেলেটি এভাবেই বাড়ির পেছনে কাঁঠালগাছের আড়ালে বসে ছিল। আমার মেজ ভাই দেখে এক ধাওয়া দিল। জোছনা থাকায় সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। ছেলে-মেয়ে দুজনেরই নাম মিঠু হলেও তাদের বিয়ে হয়নি। আমার চাচাতো বোন এখনো অবিবাহিত। সে কি এখনো সেই মিঠুর জন্য অপেক্ষা করে, কখনো জানতে চাওয়া হয়নি।
গ্রামে একটি পাখি দেখা যেত, তার নাম ভুতুম প্যাঁচা। নিরীহ একটি পাখি। কিন্তু কেন জানি মানুষ প্যাঁচা দেখলেই ঢিল ছুড়ত। প্যাঁচার ডাক গ্রামের রাতগুলোকে এক অন্য রকম আবহ দিত। প্যাঁচা ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশ দেখতে পারে। একসময় মনে হয়েছিল, একটি প্যাঁচা পুষতে পারলে ভালো হতো। পরে জানতে পারি, এরা পোষার জন্য নয়। বন্য পাখি, বনে থাকলেই সুন্দর। প্রকৃতির অলংকার।
আপনি-আমি বিশ্বাস করি আর না-ই করি, পৃথিবীতে কিছু কাকতালীয় ঘটনা চোখের সামনে ঘটে। যেমন, কুপ পাখি (যাকে অনেকে কানাকুয়া বা বড় কুবো নামেও চেনেন) কারো বাড়ির ওপর বসে রাতে ডাকলে বিপদ হবে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ তখন এটা বিশ্বাস করত। সত্যিই দেখা যেত, যার বাড়ির ওপর বসে কুপ পাখি অনবরত ডেকে চলেছে, তাদের কিছু না কিছু হয়েছে। এসব ধর্ম বা বিজ্ঞান কোনোটিই সমর্থন করে না। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে এমন ঘটনা ঘটত বলেই হয়তো বিশ্বাসটা টিকে ছিল। তাই কুপ পাখি ডাকলেই পরিবারের কর্তারা বলতেন, যাও, ঢিল মেরে পাখিটাকে তাড়িয়ে দিয়ে আসো।
পাখির গায়ে ঢিল মারা যেন মানুষের এক আদিম স্বভাব। কারণ ছাড়াই তারা পাখি দেখলেই ঢিল ছুড়ে। আমার জীবনেও এই ঢিল ছোড়া নিয়ে একটি দুঃখের ঘটনা আছে। একবার অকারণে ঢিল ছুড়ে একটি শালিক পাখি মেরে ফেলেছিলাম। এরপর আজ পর্যন্ত সেই অপরাধবোধ আমাকে ছাড়েনি। এখনো মনে পড়লে খুব খারাপ লাগে। কেন পাখিটির গায়ে ঢিল মারলাম, সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পাই না।
কিন্তু পাখি দেখলেই ঢিল মারার প্রবণতা আজও দেখি। জিজ্ঞেস করলে কেউ বলতে পারে না কেন ঢিল ছুড়েছে। পাখির অপরাধ কী? এখন তো ফসলের ক্ষেতে এমন জাল দেওয়া হয়, যেখানে আটকা পড়েই অসংখ্য বন্য পাখি প্রাণ হারায়। মানুষের এই নিষ্ঠুরতার যেন কোনো শেষ নেই। তারা কি জানে না, প্রকৃতিতে পাখির অবদান কত বিশাল? কৃষকের সবচেয়ে বড় বন্ধু তো পাখিই। বিনা বেতনে ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে। বন সৃষ্টিতেও পাখির ভূমিকা অপরিসীম।
আরও পড়ুন
মাদকের কড়াল গ্রাস থেকে মুক্তি মিলবে কবে?
আমাদের শৈশব ছিল আনন্দে ভরা। গ্রামের সবাই মিলেমিশে চলতাম। আমাদের প্রচুর টাকা ছিল না, ছিল না আধুনিক প্রযুক্তির ছড়াছড়ি। কিন্তু আমাদের শৈশব ছিল রঙিন, প্রাণবন্ত, স্মৃতিতে ভরা। আজকের অনেক ছেলে-মেয়ের শৈশব যেন সেই রঙগুলো হারিয়ে ফেলছে। তারা জোনাকি পোকা ধরার আনন্দ চেনে না। নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার উচ্ছ্বাস বোঝে না। কলাপাতায় পরিবেশিত বনভোজনের খাবারের স্বাদ তাদের অজানা। তারা জানে না, জোছনার রাতও মানুষের জীবনে এক অমূল্য উৎসব হতে পারে।
আমরা যারা বড় হয়েছি, আমাদের দায়িত্ব অন্তত বছরে একবার হলেও সন্তানদের গ্রামে নিয়ে যাওয়া। আমাদের শৈশবের গল্প তাদের শোনানো। যতটুকু সম্ভব, সেই জীবনটা তাদের সামনে তুলে ধরা। যেন তারা শুধু বইয়ের পাতায় নয়, বাস্তবেও মাটি, নদী, গাছ, জোছনা, জোনাকি আর পাখির সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।
হয়তো তখনই তারা বুঝবে, মানুষের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলো অনেক সময় দামি খেলনা বা প্রযুক্তির মধ্যে নয় লুকিয়ে থাকে এক মুঠো কাদায়, একফালি জোছনায়, একঝাঁক জোনাকির আলোয়, আর গ্রামের মাটি ও মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়।
কেএসকে