বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে এক মুমূর্ষু রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন।
এ ঘটনায় বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চিকিৎসকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। এর ফলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শত শত সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন।
হামলাকারীদের গ্রেফতার ও চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে কলেজ প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। সংবাদ সম্মেলনে ডা. রিতুল মণ্ডল স্নিগ্ধ চার দফা দাবি পেশ করেন।
দাবিগুলো হলো- হামলাকারী দুষ্কৃতকারীদের অনতিবিলম্বে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা এবং মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা; দেশের প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে ‘আর্মড আনসার’ বা সমমানের কঠোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা করা; শয্যা সংখ্যার সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশের বেশি অতিরিক্ত রোগী ভর্তি না করা এবং প্রয়োজনীয় লোকবল বৃদ্ধি ছাড়া ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি বন্ধ করা এবং হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে একাধিক স্বজন বা দর্শনার্থীর অবস্থান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ডা. রিতুল মণ্ডল স্নিগ্ধ ছাড়াও ডা. অর্পণ দত্ত, ডা. রিদোয়ান উদ্দিন, ডা. এ কে এম আহসান জারিফ এবং ডা. মেহেরুপ হোসেন পৃথিবী উপস্থিত ছিলেন। চিকিৎসক প্রতিনিধি ডা. জেরিন ও ডা. রিদোয়ান উদ্দিন জানান, হাসপাতালের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলমান থাকবে।
এদিকে আকস্মিক এই কর্মবিরতির কারণে ইনডোর ও আউটডোর সেবা ব্যাহত হওয়ায় সাধারণ রোগীরা দুর্ভোগে পড়েছেন। চিকিৎসাধীন ঝরনা বেগম ও নিতাই নামের দুই রোগী জানান, ঘটনার পর থেকেই হাসপাতালে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ইন্টার্ন ডাক্তাররা সেবা বন্ধ রাখায় ও ফাইল নিয়মিত না দেখায় রোগীরা চরম শারীরিক ও মানসিক অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মনজুর-এ-মোর্শেদ ঘটনার প্রতি ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ৬ জন চিকিৎসক জখম হয়েছেন। অবকাঠামো ও জনবলের সীমাবদ্ধতার মাঝেও জ্যেষ্ঠ ও মিড-লেভেলের চিকিৎসকদের দিয়ে জরুরি সেবা চালু রাখা হয়েছে। এই সংকট নিরসনে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ও প্রশাসন নিরবচ্ছিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এর আগে, মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাতে হাসপাতালে মেডিসিন ওয়ার্ডের ৭ম তলায় বগুড়া সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের মো. রাজিবুল ইসলামের ৫০ বছর বয়সী ছেলে মো. আব্দুল মালেক অ্যাজমা জটিলতা, তীব্র শ্বাসকষ্ট ও শক নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকদের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় তার মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে চিকিৎসকেরা জানান, সর্বাত্মক চিকিৎসা সেবা সত্ত্বেও রোগীর মৃত্যু হলে স্বজন ও সঙ্গে আসা বহিরাগতরা কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় আদনান ইসলাম অর্কসহ উপস্থিত ইন্টার্ন ও মিড-লেভেলের অন্তত ১৫ জন আহত হন, যাদের মধ্যে ৬ জন চিকিৎসকের অবস্থা গুরুতর এবং কয়েকজনের হাত ভেঙে গেছে বলে জানা গেছে।
মারামারির ঘটনার পর হাসপাতাল পরিচালকের কক্ষে দুই পক্ষকে নিয়ে মধ্যস্থতা বৈঠক বসে। রাত ১টার দিকে সিদ্ধান্ত হয় যে, চিকিৎসাধীন স্বজনদের চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। হামলা ও মারামারির ঘটনায় পুলিশ চারজন স্থানীয় ছাত্রদল নেতাসহ রোগীর আহত ও উপস্থিত ৬ স্বজনকে হেফাজতে নিয়েছে।
আটক ব্যক্তিরা হলেন- বগুড়া মহানগরীর নিশিন্দারা এলাকার মো. তানরিন (২৬), ফুলবাড়ী এলাকার মো. রাকিবুল হাসান (১৯), ফুলবাড়ী দক্ষিণপাড়ার ১৮ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. নাফিউল ইসলাম (২৬), যুগ্ম আহ্বায়ক মো. প্রান্ত (২২), এম এম মিনহাজ (১৮) এবং নামাজগড় ভান্ডারী মসজিদ এলাকার মো. বিপ্লব হোসেন (২৬)। তাদের মধ্যে মো. নাফিউল ও মো. প্রান্ত বর্তমানে শজিমেক হাসপাতালে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন আছেন এবং বাকি চারজনকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম আলী জানান, খবর পেয়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং জড়িত ৬ স্বজনকে পুলিশ হেফাজতে নেয়। এখন পর্যন্ত লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি, লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেএইচকে/এএসএম