যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর প্রায় সর্বাত্মক নজরদারি চালাতে সক্ষম বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, ইরানে কী ঘটছে, দেশটির সামরিক বাহিনী কী প্রস্তুতি নিচ্ছে, সবকিছুই যুক্তরাষ্ট্রের নজরে রয়েছে। এমনকি, ইরানের কেউ ‘বাথরুমেও যেতে পারে না’ যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি এড়িয়ে- এমন মন্তব্যও করেছেন তিনি।
হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে সর্বশেষ উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে তিনি মনে করেন না। তবে প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো সময় ইরানে আবারও হামলা চালাতে প্রস্তুত বলেও সতর্ক করেন তিনি।
Trump on Iran: We see everything they are doing. They can’t go to the bathroom without us seeing it. pic.twitter.com/VJfaHh9JAr
— Channel 8 English (@Channel8English) September 2, 2026
ট্রাম্পের এসব মন্তব্যের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে জুলাইয়ের পর সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ইরানে অন্তত ১৮ জন নিহত ও প্রায় ১০৮ জন আহত হয়েছেন।
তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণ উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালির কাছের এলাকাও রয়েছে। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, কুহেস্তাক শহরের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
মার্কিন হামলার পর ট্রাম্প বলেন, আমরা তাদের খুব জোরে আঘাত করেছি। তার দাবি, এখন যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি গত ছয় মাস ধরে ইরান কার্যত বন্ধ করে রেখেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি।
ট্রাম্প বলেন, প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় বিপুলসংখ্যক জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বের হচ্ছে ও এর মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছে। তার ভাষ্য, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব কার্যক্রম কোনো বড় ধরনের বাধা ছাড়াই চলছে। তবে মাঝেমধ্যে ইরান ড্রোনে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র তা ভূপাতিত করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, আমাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। খুব শক্ত নিয়ন্ত্রণ।
হরমুজে ইরানের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে ট্রাম্পের দাবি
ইরান হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে রাডার ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও মাইন ফেলার সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা করছে বলেও দাবি করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরান প্রণালির আশপাশে যে নতুন সরঞ্জাম ও সামরিক ব্যবস্থা তৈরি করার চেষ্টা করেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে।
ট্রাম্প আরও বলেন, হরমুজ প্রণালিতে থাকা সব মাইন সরিয়ে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাঁর দাবি, ইরান এমন একটি রকেট তৈরির চেষ্টা করছিল, যেটি দিয়ে সমুদ্রে মাইন ফেলা যায়।
ট্রাম্প বলেন, কে এমন কাজ করে? আপনি কি কখনো এমন রকেট তৈরি হতে শুনেছেন, যা মাইন ফেলে? আমি কখনো শুনিনি। কিন্তু তারা সেটিই করছিল।
তিনি দাবি করেন, ওই রকেটটি তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র সেটিকে ধ্বংস করে দেয়।
‘তারা বাথরুমেও যেতে পারে না’
ইরানের সামরিক প্রস্তুতি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র কতটা তথ্য জানে, তা বোঝাতে ট্রাম্প বলেন, ইরান কী করছে, তা যুক্তরাষ্ট্র দেখতে পাচ্ছে। ট্রাম্প দাবি করেন, আমরা দেখেছি তারা এটি তৈরি করছে। তারা যা করছে, তার সবই আমরা দেখি। তারা আমাদের নজরদারি এড়িয়ে নড়াচড়া করতে পারে না, এমনকি টয়লেটেও যেতে পারে না।
এরপর তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করেছে ও আরও কিছু স্থাপনাও হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র শুধু সামরিক পদক্ষেপেই থেমে নেই। ওয়াশিংটন ইরানের অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে দেশটির বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে।
এর মাধ্যমে ইরানের অর্থনৈতিক কার্যক্রম, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও তেল রপ্তানি থেকে আয় কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের পাল্টা হামলা
এদিকে ট্রাম্পের আরও হামলার হুমকির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, তারা কুয়েত, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে চলমান যুদ্ধের অচলাবস্থা আরও গভীর হয়েছে। একদিকে, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানির প্রধান পথটিতে শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা অবরোধ জোরদার করার চেষ্টা করছে।
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধে তেহরান নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে। তার দাবি, এই নতুন কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভিত্তি ভেঙে দেবে’।
এদিকে, বৃহস্পতিবার কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের ভাষ্য, মার্কিন বাহিনীর হামলার জবাব হিসেবে ও ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপরাধের’ প্রতিক্রিয়ায় এসব হামলা চালানো হয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি
এসএএইচ