
রোজকার সালাদে কিংবা দুপুরের তরকারির ঝোলে টুকটুকে লাল টমেটো ছাড়া অনেকেরই চলে না। রসনাবিলাসের এই সাধারণ অনুষঙ্গটি যে নীরবে আমাদের শরীরের ভেতরে কত বড় এক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, তা হয়তো আমরা টেরই পাই না। আমাদের শরীর নামে কারখানার সবচেয়ে পরিশ্রমী অথচ নীরব অঙ্গটি হলো লিভার বা যকৃৎ। দিনের পর দিন অস্বাস্থ্যকর খাবারের ভার, অতিরিক্ত চিনি ও শর্করার ধকল সইতে সইতে এই লিভার যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন তার চারপাশে জমতে থাকে ক্ষতিকর চর্বি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ফ্যাটি লিভার। বছরের পর বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা এই সমস্যাটি একসময় নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আপনার রান্নাঘরের ওই অতি পরিচিত টমেটোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর উপাদান, যা এই ভয়ংকর ফ্যাটি লিভারের হাত থেকে আপনার শরীরকে পরম মমতায় আগলে রাখতে পারে।
দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, টমেটোর আসল উপকারিতা লাইকোপেনে। এই রঞ্জক পদার্থটিই টমেটোকে অমন লাল রং এনে দেয়। লিভার সুরক্ষায় লাইকোপেনের সুনামের কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত টাফটস ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো এক নতুন তথ্য সামনে এনেছেন। মলিকিউলার নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, টমেটোর ভেতরে থাকা ফাইটোইন নামে একটি বর্ণহীন উপাদান ফ্যাটি লিভারের বিরুদ্ধে এক বিশাল ও শক্তিশালী বর্ম হিসেবে কাজ করে।
ফ্যাটি লিভার বর্তমান সময়ের এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যসংকট। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ১০ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই রোগে ভুগছেন। যাদের স্থূলতা বা ডায়াবেটিস আছে, তাদের ৭৫ শতাংশই এই রোগের শিকার।
মজার ব্যাপার হলো, পাকা লাল টমেটো হাতে নিলে এই ফাইটোইন আপনার চোখে পড়বে না। এটি মূলত এমন একটি প্রাকৃতিক আদি উপাদান, যাকে ভেঙে গাছপালা পরবর্তীতে লাইকোপেন বা অন্যান্য ক্যারোটিনয়েড তৈরি করে। এই ক্যারোটিনয়েডগুলোই বিভিন্ন ফল ও সবজিকে লাল, হলুদ ও কমলা রঙে রাঙিয়ে তোলে। অর্থাৎ, ফাইটোইন হলো সেই পর্দার আড়ালের কারিগর, যে নীরবে নিজের কাজটুকু করে যায়।
ফ্যাটি লিভার বর্তমান সময়ের এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যসংকট। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ১০ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই রোগে ভুগছেন। যাদের স্থূলতা বা ডায়াবেটিস আছে, তাদের ৭৫ শতাংশই এই রোগের শিকার। লিভারকে যদি একটি গুদামঘর হিসেবে কল্পনা করেন, তবে অতিরিক্ত চিনি ও শর্করা সেই গুদামে চর্বির বস্তা হিসেবে জমতে থাকে। জমতে জমতে একসময় লিভারে মারাত্মক প্রদাহ তৈরি হয়, যা শেষমেশ সিরোসিসের মতো ভয়ংকর রূপ নেয়। ফলে লিভারের টিস্যুগুলো স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
টাফটস ইউনিভার্সিটির এই গবেষণার প্রধান লেখক না ইয়ুন লি জানান, ‘আগের গবেষণাগুলো থেকে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, শরীর লাইকোপেনের চেয়ে ফাইটোইনকে অনেক দ্রুত ও সহজে শুষে নিতে পারে।’ এটি আসলেই কতটা কাজ করে, তা নিশ্চিত হতে গবেষকরা ইঁদুরের ওপর টানা ছয় মাস একটি নিবিড় পরীক্ষা চালান। ইঁদুরগুলোকে এমন সব পরিশোধিত শর্করা ও চিনিযুক্ত খাবার দেওয়া হয়, যা মানুষের ফ্যাটি লিভার তৈরির প্রধান কারণ। এরপর অর্ধেক ইঁদুরকে আলাদা করে ফাইটোইন দেওয়া হয়। মানুষের রোজকার খাবারের মাপে হিসাব করলে এই ফাইটোইনের পরিমাণ দিনে ৩ থেকে ৪টি মাঝারি আকারের কাঁচা টমেটোর সমান।
টাফটস ইউনিভার্সিটির এই গবেষণার প্রধান লেখক না ইয়ুন লি জানান, ‘আগের গবেষণাগুলো থেকে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, শরীর লাইকোপেনের চেয়ে ফাইটোইনকে অনেক দ্রুত ও সহজে শুষে নিতে পারে।’
ফলাফল ছিল অভাবনীয়! যেসব ইঁদুর ফাইটোইন পেয়েছিল, সেগুলোর লিভারে চর্বি জমার পরিমাণ ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিজ্ঞানীরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন, এই উপাদানটি অন্য কোনো ঘুরপথে কাজ করে না। বরং এটি সরাসরি লিভারের বিপাক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণকারী গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনগুলোকে জাগিয়ে তোলে। সোজা কথায়, লিভারে জমে থাকা চর্বিকে অলস বস্তার মতো পড়ে থাকতে না দিয়ে, সেগুলোকে পুড়িয়ে শরীরে শক্তি জোগাতে বাধ্য করে এই ফাইটোইন।
এই উপাদানের কাজ করার পেছনে নিজস্ব কিছু শর্ত আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ফাইটোইন সরাসরি কাজ করে না। শরীরের ভেতরে ফাইটোইনকে ভেঙে ছোট ছোট উপাদানে পরিণত করার জন্য বিশেষ কিছু এনজাইমের প্রয়োজন হয়। গবেষকেরা এমন কিছু ইঁদুর পরীক্ষা করেন, যেগুলোর শরীরে ওই নির্দিষ্ট এনজাইমগুলো ছিল না। দেখা গেল, সেগুলোর শরীরে ফাইটোইন জমলেও তা ফ্যাটি লিভারের বিরুদ্ধে ঢাল তৈরি করতে পারেনি। অর্থাৎ, জিনগত কারণে মানুষের শরীরেও এই এনজাইমের ভিন্নতা থাকতে পারে এবং একেকজনের শরীরে টমেটোর এই গুণ একেকভাবে কাজ করতে পারে।
আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার গবেষকদের নজরে এসেছে। পুরুষ ইঁদুরের তুলনায় নারী ইঁদুরের লিভারে ফাইটোইন বেশি মাত্রায় শোষিত ও জমা হয়েছে। মানে, লিঙ্গভেদে এই উপাদানের কার্যকারিতায় বেশ কিছু জৈবিক পার্থক্য রয়েছে, যা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও সুনির্দিষ্ট গবেষণার প্রয়োজন।
গবেষণায় দেখা গেছে, ফাইটোইন সরাসরি কাজ করে না। শরীরের ভেতরে ফাইটোইনকে ভেঙে ছোট ছোট উপাদানে পরিণত করার জন্য বিশেষ কিছু এনজাইমের প্রয়োজন হয়।
টাফটস ইউনিভার্সিটির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী জিয়াং-ডং ওয়াং অবশ্য বেশ আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এর মানে এই নয় যে আপনাকে প্রতিদিন শুধু টমেটোই খেতে হবে। ফাইটোইন প্রকৃতির আরও অনেক উপাদানে ছড়িয়ে আছে। গাজর, লাল ক্যাপসিকাম, গোলাপি আঙুর এবং তরমুজের মতো চিরচেনা ফল ও সবজিতেও এটি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।’
যাদের লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি রয়েছে, তাদের জন্য এই প্রাকৃতিক উপাদানগুলো হতে পারে পরম আশীর্বাদ। হয়তো আপনার রোজকার খাবারে থাকা এই ছোটখাটো পরিবর্তনগুলোই আপনার ক্লান্ত লিভারকে নতুন জীবন দিতে পারে।