সঙ্গীর সঙ্গে তুমুল ঝগড়া চলছে। দুজনের মধ্যে রাগ, অভিমান, উত্তেজনা- সবকিছুই তখন চরমে। মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলাটাই কঠিন। অথচ এমন পরিস্থিতিতেই কারও কারও মনে সঙ্গীর প্রতি হঠাৎ যৌন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে অদ্ভুত মনে হলেও, মনোবিজ্ঞান ও সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায় এর পেছনে শরীর ও মনের কয়েকটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে।
ঝগড়ার সময় শরীরে যে হরমোন ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তার সঙ্গে যৌন উত্তেজনার কিছু মিল রয়েছে। আবার সম্পর্কের বন্ধন হুমকির মুখে পড়লে কাছাকাছি আসার তাগিদও বাড়তে পারে। এ কারণেই কোনো কোনো দম্পতির ক্ষেত্রে ঝগড়ার পর যৌন ঘনিষ্ঠতা বা ‘মেকআপ সেক্স’ সম্পর্কের দূরত্ব কমানোর একটি উপায় হয়ে ওঠে।
ঝগড়ার সময় হরমোনের ভূমিকা
কোনো মানুষের সঙ্গে তীব্র বিরোধ বা ঝগড়ার সময় শরীরে টেস্টোস্টেরন, কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে, চাপ বা মানসিক উত্তেজনার সঙ্গে কর্টিসলের নিঃসরণ বাড়ে। একই সঙ্গে অ্যাড্রেনালিন শরীরকে উচ্চমাত্রার সতর্ক ও সক্রিয় অবস্থায় নিয়ে যায়।
এসময় হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয় ও শরীরে রক্তপ্রবাহ বাড়ে। অর্থাৎ ঝগড়ার সময় শরীর যে উত্তেজিত অবস্থার মধ্য দিয়ে যায়, যৌন উত্তেজনার সময়ও তার কিছুটা মিল পাওয়া যায়।
এই শারীরিক উত্তেজনা কখনো কখনো এক ধরনের অনুভূতি থেকে অন্য ধরনের অনুভূতিতে স্থানান্তরিত হতে পারে। ফলে যে উত্তেজনার শুরু রাগ, ভয়, উদ্বেগ বা মানসিক চাপ থেকে, সেটিই পরবর্তী সময়ে যৌন আকাঙ্ক্ষা হিসেবে অনুভূত হতে পারে।
ভয় ও যৌন উত্তেজনার মধ্যে সম্পর্ক
ঝগড়ার সময় শুধু রাগই কাজ করে না; সম্পর্ক হারানোর ভয়ও তৈরি হতে পারে। সঙ্গী দূরে সরে যাচ্ছেন, সম্পর্কটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে কিংবা নিজের প্রতি সঙ্গীর অনুভূতি বদলে যেতে পারে- এমন আশঙ্কা মানুষের মধ্যে তীব্র আবেগ তৈরি করতে পারে।
নিউইয়র্কের মনোবিজ্ঞানী মেগান ফ্লেমিংয়ের ব্যাখ্যায়, দম্পতির মধ্যে মতবিরোধ হলে তাদের ‘অ্যাটাচমেন্ট সিস্টেম’ বা ‘পারস্পরিক সংযুক্তির’ অনুভূতি সক্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ, ঝগড়ার সময় সম্পর্কের বন্ধন হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে হয়।
এই পরিস্থিতিতে শরীরের ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ বা ‘লড়াই-অথবা-পালানোর’ প্রতিক্রিয়াও সক্রিয় হতে পারে। হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস ও রক্তপ্রবাহ বেড়ে যাওয়ার মতো শারীরিক পরিবর্তন তখন ঘটে। ফলে ভয়, উত্তেজনা ও যৌন আকাঙ্ক্ষার শারীরিক অনুভূতিগুলো একে অন্যের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
ঝগড়ার পর কেন আরও কাছে আসতে ইচ্ছা করে?
ঝগড়ার সময় সঙ্গীর কাছ থেকে মানসিকভাবে দূরে সরে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়। সেই দূরত্ব কাটিয়ে আবার আগের ঘনিষ্ঠতায় ফিরতে অনেকের মধ্যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হতে পারে। এখানেই ‘মেকআপ সেক্স’ বা ঝগড়ার পর যৌন ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি আসে। তর্কের কারণে যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, যৌনতা কখনো কখনো সেটিকে দ্রুত কমিয়ে আনতে পারে। দুজনের মধ্যে আবার ঘনিষ্ঠতা ও সংযোগের অনুভূতি তৈরি হয়।
দাম্পত্য ও পরিবারবিষয়ক থেরাপিস্ট মারিসা নেলসন বলেন, অনেক মানুষ দ্বন্দ্ব বা সংঘাত এড়িয়ে চলেন। ফলে ঝগড়ার পর কথা বলা, ক্ষমা চাওয়া বা নিজেদের অনুভূতি নিয়ে আলোচনা করার পরিবর্তে শারীরিক ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে সম্পর্ক পুনরায় জোড়া লাগানোর চেষ্টা করতে পারেন।
যৌনতার সময় অক্সিটোসিন নিঃসরণও দুজনকে কাছাকাছি অনুভব করতে সাহায্য করতে পারে। এই হরমোনকে অনেক সময় ‘লাভ হরমোন’ বলা হয়। যৌন ঘনিষ্ঠতার সময় এর নিঃসরণ সঙ্গীদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি বাড়াতে পারে এবং ঝগড়ার সময় উঠে আসা কিছু নেতিবাচক আবেগকে প্রশমিত করতে সহায়তা করতে পারে।
গবেষণায় কী ইঙ্গিত পাওয়া যায়?
২০০৮ সালে ইসরায়েলের বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা যায়, মানুষকে মানসিকভাবে হুমকির অনুভূতির মধ্যে রাখার পর তার সঙ্গীর প্রতি যৌন আগ্রহ বাড়তে পারে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের এমন পরিস্থিতি কল্পনা করতে বলা হয়েছিল, যেখানে তাদের সঙ্গী অন্য কারও প্রেমে পড়ছেন। অর্থাৎ সঙ্গীকে হারানোর আশঙ্কা বা সম্পর্কের নিরাপত্তা নিয়ে হুমকির অনুভূতি তৈরি করা হয়েছিল।
এ ধরনের ফলাফল থেকে বোঝা যায়, সম্পর্কের নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র আবেগ কখনো কখনো সঙ্গীর প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে দিতে পারে। ঝগড়ার সময়ও একই ধরনের মানসিক প্রক্রিয়া সক্রিয় হতে পারে। সঙ্গীর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার পর তাকে আবার কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা যৌন আকর্ষণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারে।
ঝগড়ার পর যৌনতা কেন বেশি উত্তেজনাপূর্ণ মনে হতে পারে?
তীব্র আবেগ যৌন অভিজ্ঞতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ঝগড়ার সময় শরীর ও মন যখন আগে থেকেই উত্তেজিত থাকে, তখন সেই উত্তেজনা যৌন ঘনিষ্ঠতার সময়ও প্রভাব ফেলতে পারে।
থেরাপিস্ট ডগলাস ব্রুকসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যৌনতার ক্ষেত্রে শুধু শারীরিক উদ্দীপনাই গুরুত্বপূর্ণ নয়; তার আগে তৈরি হওয়া তীব্র আবেগ ও মানসিক উত্তেজনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে আবেগপ্রবণ একটি ঝগড়ার পর যৌন ঘনিষ্ঠতা কারও কাছে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি তীব্র বা আনন্দদায়ক বলে মনে হতে পারে।
অন্যদিকে, ঝগড়ার পর যৌনতা কোনো কোনো সম্পর্কে নতুনত্বও আনতে পারে। দীর্ঘদিনের একই যৌন রুটিনের বাইরে তীব্র আবেগের পর ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কের যৌন জীবনে ভিন্ন ধরনের উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।
মারিসা নেলসনের মতে, যৌনতার সময় মানুষ একটি নির্দিষ্ট মানসিক ভূমিকা বা অবস্থায় প্রবেশ করে। তাই ঝগড়ার পর যদি দুজনের মধ্যে নিরাপত্তা ও সম্মতি থাকে, তাহলে সেই সময়ের ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কের যৌন জীবনে নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।
বিবর্তনগত ব্যাখ্যাও আছে
ঝগড়ার পর যৌন আকাঙ্ক্ষার পেছনে বিবর্তনগত একটি ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়। তীব্র বিরোধের সময় মানুষ নিজেকে হুমকির মধ্যে মনে করতে পারে। পরে সেই হুমকি কেটে গেলে স্বস্তি ও উত্তেজনার অনুভূতি তৈরি হয়।
অর্থাৎ একদিকে ছিল ভয়, রাগ বা সংঘাত; অন্যদিকে আসে স্বস্তি, নিরাপত্তা ও সঙ্গীর কাছে ফিরে আসার অনুভূতি। এই তীব্র আবেগের পরিবর্তন শরীর ও মনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং যৌন আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র বলে মনে হতে পারে।
তবে ‘মেকআপ সেক্স’ সব সমস্যার সমাধান নয়
ঝগড়ার পর যৌন ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কের জন্য সবসময় ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে- এমন নয়। বরং সমস্যা দেখা দিতে পারে যদি দম্পতি প্রতিবার মূল বিরোধের সমাধান না করে শুধু যৌনতার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝগড়ার পর ঘনিষ্ঠতা তখনই সম্পর্কের জন্য বেশি ইতিবাচক হতে পারে, যখন দুজনের মধ্যে যে সমস্যা তৈরি হয়েছিল, সেটি সমাধানের চেষ্টা করা হয়। শুধু সমস্যাটি এড়িয়ে গিয়ে যৌনতার মাধ্যমে সাময়িকভাবে কাছাকাছি এলে মূল দ্বন্দ্ব থেকে যেতে পারে।
আর সম্পর্কের মধ্যে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের কোনো বিষয় থাকলে পরিস্থিতিটি একেবারেই আলাদা। এমন ক্ষেত্রে ঝগড়ার পর যৌন ঘনিষ্ঠতাকে সম্পর্কের স্বাভাবিক সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়।
গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, ঝগড়ার সমাধান করতে হবে
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, তীব্র আবেগের সময় গুরুত্বপূর্ণ কোনো সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা না করাই ভালো। কারণ রাগ ও উত্তেজনার সময় মানুষ স্বাভাবিকভাবে যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারে না। মস্তিষ্কের আবেগনির্ভর অংশ তখন বেশি সক্রিয় থাকে, ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
সেক্স থেরাপিস্ট মেগান ফ্লেমিং তাই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করার ক্ষেত্রে ‘লোহা যখন গরম’ তখন আঘাত করার পরিবর্তে পরিস্থিতি ঠান্ডা হওয়ার পর কথা বলার পরামর্শ দেন। অর্থাৎ আবেগ যখন কিছুটা কমে আসবে, তখন দুজনেরই শান্তভাবে সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা করা উচিত।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি শুধু যৌন আকাঙ্ক্ষার নয়; সম্পর্কের নিরাপত্তা, মানসিক সংযোগ, শারীরিক উত্তেজনা এবং একে অন্যের কাছাকাছি থাকার প্রয়োজন- সবকিছু মিলিয়েই এই অনুভূতি তৈরি হতে পারে। তাই তুমুল ঝগড়ার মধ্যেও সঙ্গীর প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়া অনেকের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, হাফপোস্ট
এসএএইচ