এক ভবনেই মিলবে মাছ, মাংস, কাঁচাবাজার ও মুদি মালামাল-ক্রেতাদের এমন সুবিধা দিতে ভোলার দৌলতখান পৌর এলাকায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় সরকারি আধুনিক মাল্টিপারপাস (কিচেন) মার্কেট। তবে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো চালু হয়নি মার্কেটটি। ফলে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার ভবনটি এখন মাদকসেবীদের নিরাপদ আশ্রয়, জেলেদের জাল মেরামত এবং কামারদের মালামাল রাখার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল বাজার থেকে দূরে আবাসিক এলাকায় কিচেন মার্কেটটি নির্মাণ করায় ব্যবসায়ীরা সেখানে যেতে আগ্রহী হননি। তাদের দাবি, বাজার থেকে দূরে মার্কেট নির্মাণের কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোলার দৌলতখান পৌর এলাকার মূল সড়কের দুই পাশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, মাছ, মাংস, সবজি ও মুদি মালামাল বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই চলছে বাজার। সড়কে দ্রুতগতির যানবাহন চলাচল করলেও বাধ্য হয়ে সড়কের পাশেই বেচাকেনা করছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। এতে যে কোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
নির্মাণের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও চালু হয়নি দৌলতখানের কিচেন মার্কেট-/ ছবি: জাগো নিউজ
অথচ দৌলতখান বাজার থেকে কিছু দূরে কামারপট্টি এলাকার একটি আবাসিক এলাকায় কয়েক বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছে কিচেন মার্কেট। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের ভেতরে জেলেরা জাল মেরামত করছেন। স্থানীয় কামাররা সেখানে রেখেছেন তাদের মালামাল। পুরো ভবনের বিভিন্ন স্থান অপরিষ্কার ও ময়লায় পরিপূর্ণ।
২০১৯ সালের মে মাসের দিকে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ২০২১ সালের শেষের দিকে। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পার হয়েছে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার তাও এখনও চালু হয়নি সেটি। পৌরসভা থেকে বার বার দরপত্র আহ্বান করলেও আগ্রহী হয়নি কেউ। ফলে ভবনটি অব্যবহৃত অবস্থায় পরে আছে
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাতের আঁধারে সেখানে মাদকসেবীরা মাদক সেবন করেন। তাদের দাবি, রাতে পুরো ভবন অন্ধকার থাকায় এটি মাদকসেবীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।
পাঁচ বছরেও চালু হয়নি
দৌলতখান পৌরসভা সূত্র জানায়, সিটিআইপি প্রকল্পের আওতায় তিন কোটি ৪৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে দৌলতখান পৌর এলাকার কামারপট্টিতে আধুনিক চারতলা মাল্টিপারপাস (কিচেন) মার্কেটটি নির্মাণ করা হয়। ২০১৯ সালের মে মাসের দিকে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ২০২১ সালের শেষের দিকে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো চালু হয়নি মার্কেটটি।
পৌরসভা থেকে বারবার দরপত্র আহ্বান করা হলেও মার্কেটটি ইজারা নিতে আগ্রহী হননি কেউ। ফলে ভবনটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
বাজারের মধ্যে হলে জমজমাট হতো
দৌলতখান পৌর এলাকার মাছ বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল মন্নান বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি দৌলতখান পৌর এলাকার মাছ বাজারে নিয়মিত মাছ বিক্রি করছেন। বাজারটি মূল সড়কের পাশে হলেও সেখানে কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। বৃষ্টি হলে ভিজতে হয়, মাথার ওপর কোনো ছাউনিও নেই।
তিনি আরও বলেন, দৌলতখানে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কিচেন মার্কেট করা হয়েছে। তাও আবার মূল বাজার থেকে দূরে একটি আবাসিক এলাকায়। সেখানে কোনো ব্যবসায়ী যেতে চান না।
রাস্তার ওপর গড়ে ওঠা বাজার থেকে কোকাটা করছে স্থানীয়রা-/ ছবি: জাগো নিউজ
আব্দুল মন্নান আরও বলেন, ভোলা পৌরসভার কিচেন মার্কেট তিনি দেখেছেন। আগের বাজার যেখানে বসত, সেখানেই কিচেন মার্কেট স্থাপন করা হয়েছে। অথচ দৌলতখানে এর উল্টো- বাজার থেকে দূরে এমন জায়গায় মার্কেট করা হয়েছে, যেখানে যেতে ১০ টাকা রিকশাভাড়া লাগে। কিচেন মার্কেটটি বাজারের মধ্যে হলে এতদিনে জমজমাটভাবে ব্যবহার হতো। কিন্তু দূরে হওয়ায় সেটি ব্যবহার হচ্ছে না।
বাজার থেকে দূরে আবাসিক এলাকায় নির্মাণ করা হয় কিচেন মার্কেট। যার ফলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বাজার থেকে দূরে হওয়ায় সরকারি টাকা অপচয় ও লুটপাটের প্রকল্প আখ্যা দিয়েছেন তারা
তার ভাষ্য, কিচেন মার্কেটের টাকা দিয়ে বর্তমান মাছ বাজারে দু-একটি টিনের ঘর বা ছাউনি করে দিলেও মাছ বিক্রেতা ও ক্রেতাদের অনেক উপকার হতো।
রাস্তার পাশেই চলছে ব্যবসা
মুদি মালামাল বিক্রেতা মো. মনির হোসেন বলেন, ব্যবসার আয়েই তার সংসার চলে। তিনি ১৫-২০ বছর ধরে এই বাজারে ব্যবসা করছেন। কিন্তু দৌলতখান বাজারে মুদি ও কাঁচামাল বিক্রেতাদের কোনো সুব্যবস্থা নেই। বছরের পর বছর ধরে সবাই রাস্তার পাশে বসেই মালামাল বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, রাস্তায় বড় ও ছোট অনেক যানবাহন চলাচল করে। মাঝে-মধ্যে দুর্ঘটনাও ঘটে। তারপরও বাধ্য হয়ে এখানেই বসে ব্যবসা করতে হচ্ছে।
বাজারের মুদি ব্যবসায়ী মো. ইউসুফ ফরাজি ও মা. জামাল বলেন, বহু বছর ধরে তারা দৌলতখান বাজারে মুদি ব্যবসা করছেন। সরকারি টাকায় একটি কিচেন মার্কেট করা হলেও সেটি দূরে হওয়ায় কোনো ব্যবসায়ী সেখানে যেতে আগ্রহী হননি।
তারা আরও বলেন, দৌলতখান বাজারে পৌর এলাকাসহ আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষের প্রতিদিন যাতায়াত থাকে। কিন্তু কিচেন মার্কেটটি যেখানে করা হয়েছে, সেখানে পৌর এলাকা ও বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াত নেই। সেখানে মুদি দোকান বসালে ব্যবসা ধ্বংস হওয়া ছাড়া আর কিছু হবে না।
তাদের দাবি, বাজারের মধ্যে কিচেন মার্কেট হলে ব্যবসায়ীরা দোকান ভাড়া নিয়ে সেখানে ব্যবসা করতেন। তখন বরং দোকান পাওয়াই কঠিন হয়ে যেত এবং মার্কেটটি সবসময় জমজমাট থাকত।দূরে গিয়ে মাংস কিনবে না মানুষ
আরও পড়ুন
মিডিয়া গণতন্ত্রের স্তম্ভ: তথ্যমন্ত্রী
মাংস বিক্রেতা মো. মিরাজ ও রাশেদ বলেন, বহু বছর ধরে তারা বাজারে একই স্থানে মুরগি, হাঁস, গরু ও খাসির মাংস বিক্রি করছেন। বাজারের মধ্যে মাংসের দোকান থাকায় পৌর এলাকা ও বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষ যাতায়াতের সময় মাংস কিনে নেন। এতে তাদের বেচাকেনাও ভালো হয়।
তারা আরও বলেন, কিচেন মার্কেটে গিয়ে মাংস বিক্রি করলে পৌর এলাকার মানুষ অতি প্রয়োজন ছাড়া সেখানে মাংস কিনতে যাবে না। কারণ মার্কেটটি মূল বাজার থেকে দূরে।
২০ টাকা রিকশাভাড়ার বোঝা
মো. ফারুক ও ফিরোজা বেগমসহ একাধিক ক্রেতা বলেন, দৌলতখান বাজার থেকে কখনো অল্প, কখনো বেশি টাকার মুদি সদাই, কাঁচাবাজার, মাছ ও মাংস কেনেন তারা। কিন্তু কিচেন মার্কেটে যেতে-আসতে ২০ টাকা রিকশাভাড়া দিতে হবে। অল্প টাকার বাজার করতে এসে অতিরিক্ত ২০ টাকা রিকশাভাড়া দেওয়া সম্ভব নয়।
তারা আরও বলেন, বাজারের মধ্যে মার্কেট না করে আবাসিক এলাকায় কিচেন মার্কেট করা হয়েছে। কী যুক্তিতে এটি করা হলো, তা তাদের বোধগম্য নয়।
রাতে মাদকসেবীদের আশ্রয়
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মোসলেহ উদ্দিন লাভু বলেন, বাজারের জায়গায় কিচেন মার্কেট না করে বাজার থেকে দূরে কামারপট্টিতে করার কোনো মানে হয় না। এ কারণে এখন সেখানে কেউ যায় না। প্রায় পাঁচ বছর ধরে কিচেন মার্কেটটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
তিনি আরও বলেন, রাতে সেখানে মাদকসেবীদের নিরাপদ আশ্রয় হয়েছে। আর দিনের বেলা জেলেরা জাল মেরামত করেন এবং কামাররা তাদের মালামাল রাখেন। অথচ মানুষের সুবিধার জন্য সাড়ে ৩ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে কিচেন মার্কেটটি নির্মাণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লুট হওয়া পিস্তলসহ ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
এটি সরকারি টাকার অপচয় ও লুটপাটের একটি প্রকল্প বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা পৌরসভার
দৌলতখান পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল মতিন খান বলেন, কিচেন মার্কেটটি বাজার থেকে কিছুটা দূরে হওয়ায় ব্যবসায়ীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এ কারণে এটি চালু হয়নি।
তিনি আরও বলেন, পৌরসভা থেকে বারবার ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আগ্রহী কাউকে পাওয়া যায়নি। এ বছরের মধ্যে কিচেন মার্কেটটি চালু করতে আবারও ইজারার বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। এরপরও কেউ আগ্রহী না হলে ভবনটি অন্য কোনো কাজে ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
জুয়েল সাহা বিকাশ/এসজেডএইচ/জেআইএম