সম্প্রতি এক দ্বীনি আলোচনা অনুষ্ঠানে এক ব্যক্তি শায়খ আহমাদুল্লাহকে প্রশ্ন করেন, দ্বীনে ফেরার আগে যে বিষয়গুলোকে খুব স্বাভাবিক মনে করতাম, দ্বীনে ফেরার পর সেগুলোর অনেক কিছুই এখন হারাম বা সীমাবদ্ধ মনে হয়। গান-বাদ্যযন্ত্র, সিনেমা, নাটক, সুদভিত্তিক ব্যাংকের চাকরি, ঘুষ, এমনকি প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রেও নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় হালাল বিকল্প বেশ কম। এত কিছু ছাড়তে গিয়ে মাঝেমধ্যে মনে প্রশ্ন জাগে, আল্লাহ কি একজন মুসলিমকে মুমিন বানানোর জন্য এত বিধিনিষেধ ও পরীক্ষার মধ্যে ফেলেছেন? এটা কি জুলুম? নাকি এর পেছনে এমন কোনো হিকমত বা প্রজ্ঞা লুকিয়ে রয়েছে যা আমরা বুঝতে পারি না?
উত্তরে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন:
ভাইয়েরা আমার, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের ভালোবাসেন। তিনি আমাদের যে কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে চান, আর সে কারণেই তিনি আমাদের জন্য এসব বিধিনিষেধ নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
আমরা যদি আল্লাহর বিধিনিষেধ মেনে চলি, তাতে আল্লাহর নিজের কোনো লাভ নেই; আর যদি তাঁর বিধান না মানি, তাতেও তাঁর কোনো ক্ষতি বা লোকসান নেই। আমাদের কিসে কল্যাণ আর কিসে অকল্যাণ, তা তিনি সবচেয়ে ভালো জানেন।
আমি প্রায়ই একটি সহজ উপমা দিয়ে থাকি। দেড় বা দুই বছর বয়সী ছোট্ট একটি বাচ্চার কথা চিন্তা করুন। সে যদি একটি ধারালো ও চকচকে ছুরি দেখে, দেখতে ভীষণ সুন্দর হওয়ায় সে কিন্তু সেটি হাত দিয়ে ধরতে চায়। কিংবা যদি একটি মোমের মাথায় টুকটুকে লাল আগুন জ্বলতে দেখে, সেটিও সে হাতে পেতে চায়। বাচ্চাটির মন চায় পানিতে লাফ দিতে। কিন্তু বাবা-মা তাকে কোনোভাবেই আগুনে বা পানিতে যেতে দেন না, ছুরি ধরতেও বাধা দেন।
আরও পড়ুন
নোমান আলী খান / জীবনের সংকট পরীক্ষা নাকি শাস্তি কীভাবে বুঝবো?
এই বাধা পাওয়ার পর শিশুটির প্রতিক্রিয়া কী হয়? সে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। সেই বাচ্চার কান্নার যদি একটি অনুবাদ করা যেত, তবে হয়তো তা এমন হতো, ‘আমার বাবা-মা পৃথিবীর সবচেয়ে পাষাণ ও শক্ত হৃদয়ের মানুষ। আমি একটুখানি ধরতে চাইছি, তাতে কী এমন ক্ষতি হতো? কিন্তু তাদের মন গলল না। একবারের জন্যও আমাকে ধরতে দিল না!’
কিন্তু বাস্তবে কি তাই? বাবা-মা কি সন্তানের শত্রুতা বা প্রতি হিংসা থেকে পাষাণ হৃদয় হয়ে এমনটা করছেন? নিশ্চয়ই নয়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বাবা-মার চেয়েও আমাদের অনেক বেশি ভালোবাসেন। আমাদের কিসে ক্ষতি রয়েছে, তা তিনি ভালোভাবে জানেন বলেই সৃষ্টি হিসেবে আমাদের সতর্ক করেছেন, ‘এই পথে যেয়ো না, এটা কোরো না; করলে তোমার বিনাশ অনিবার্য।’
আমরা নিজের চোখেও তো দেখি, যারা ভুল পথে পা বাড়ায়, তাদের পরিণতি কী হয়। এই যেমন মাদকের কথাই ধরা যাক; মানুষ সুখে থাকার আশায় মাদকে হাত বাড়ায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার পুরো জীবনটাই দুঃখে ভরে যায়। তাই আমরা বলি, হারামে কোনো আরাম নেই। যেখানে আল্লাহ তাআলা শান্তি রাখেননি, সেখানে আরাম আসবে কোথা থেকে? বাহ্যিক কিছু আরাম সাময়িকভাবে মনে হলেও চূড়ান্ত বিচারে তা বড় রকমের ব্যাধি ও কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তাই মনে এই জাতীয় সংশয় বা প্রশ্ন আসলে আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করা উচিত। তিনি আমাদের যে নির্দেশ বা নিষেধ দিয়েছেন, তার সবই আমাদের মঙ্গলের জন্য দিয়েছেন। দ্বীনে ফেরার পরও যদি কারও মধ্যে সেই হারাম বিষয়গুলোর প্রতি আকর্ষণ থেকে যায়, তবে বুঝতে হবে তিনি দ্বীনকে এখনো সঠিকভাবে বুঝতে পারেননি। দ্বীনকে যদি কেউ অনুধাবন করতে পারেন, তবে কোনো হারাম জিনিস তাঁকে আর আকৃষ্ট করতে পারে না।
আরও পড়ুন
মুফতি মেন্ক / জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে \'রেড ফ্ল্যাগ\' কী?
আমাদের অনন্তকালের সুখের আশায় দুনিয়ার এই সাময়িক ও সীমিত সময়ের ভোগ-উপভোগকে ত্যাগ করতে হচ্ছে। যে হারাম সম্পর্ক কিংবা হারাম আনন্দগুলো আমরা স্যাক্রিফাইস করছি, তা কেবল জান্নাতের চিরন্তন শান্তির আশাতেই করছি। এই অনুভূতি একজন মানুষকে আরও বেশি আশাবাদী ও মানসিকভাবে সুখী করে তোলে, অন্তরের কষ্ট দূর করে দেয়। আল্লাহ আমাদের পরিপূর্ণভাবে দ্বীনের ও ইবাদতের স্বাদ আস্বাদন করার তৌফিক দান করুন।
সূত্র: শায়খ আহমাদুল্লাহর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল
ওএফএফ