
কোটি কোটি বছর ধরে প্রকৃতি জীবনের যে আদিম ভাষা তৈরি করেছে, তা একটি কঠোর ব্যাকরণে বাঁধা। আদিম পৃথিবীর উত্তপ্ত মহাসাগরে প্রাণের প্রথম স্ফুরণ থেকে শুরু করে আজকের যেকোনো জীব একই নিয়মে চলছে। জীবজগতের প্রতিটি প্রাণীর দেহকোষ প্রোটিন তৈরির জন্য মাত্র ২০টি প্রাকৃতিক অ্যামিনো অ্যাসিড এবং ৬৪টি জেনেটিক কোডনের ওপর নির্ভর করে। এই ২০টি অ্যামিনো অ্যাসিড হলো জীবনের বর্ণমালা, যা দিয়ে পৃথিবীর সব প্রোটিনের রূপরেখা লেখা হয়।
কোষের ভেতরে প্রোটিন তৈরির মূল কারখানাটিকে আমরা বলি রাইবোজোম। সৃষ্টির শুরু থেকেই এটি বেশ রক্ষণশীল আচরণ করে আসছে। জীববিজ্ঞানে এতদিন ধারণা করা হতো, রাইবোজোম কেবল সেই টি-আরএনএ অণুগুলোই গ্রহণ করবে, যাদের শেষে থ্রি-প্রাইম সিসিএ (3' CCA) নামে একটি নির্দিষ্ট সিকোয়েন্স যুক্ত থাকে। এটি মূলত কোষের একটি ছাড়পত্র হিসেবে কাজ করে। অন্য কোনো সিকোয়েন্স থাকলে রাইবোজোম তা ত্রুটিপূর্ণ বলে সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করে দিত।
যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞানীরা ভেবেছেন, শত শত কোটি বছর ধরে অপরিবর্তিত থাকা জীবনের এই আণবিক সীমানা হয়তো পরম এবং অলঙ্ঘনীয়। প্রকৃতি যেন তার এই নকশায় কোনো ধরনের মানুষের হস্তক্ষেপ বা পরিবর্তন সহ্য করতে প্রস্তুত নয়। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এই সীমানা পেরিয়ে নতুন অক্ষর যোগ করে কৃত্রিম প্রোটিন বানানোর স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু জীবন্ত কোষে এত বড় পরিবর্তন আনার সবচেয়ে বড় বাধা ছিল কোষের টিকে থাকা। কারণ, জিনোমে বড় কোনো রদবদল করলে কোষ সাধারণত মারা যায়।
জীববিজ্ঞানে এতদিন ধারণা করা হতো, রাইবোজোম কেবল সেই টি-আরএনএ অণুগুলোই গ্রহণ করবে, যাদের শেষে থ্রি-প্রাইম সিসিএ নামে একটি নির্দিষ্ট সিকোয়েন্স যুক্ত থাকে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল এবং উইস ইনস্টিটিউটের একদল গবেষক এই ধারণার মূলে আঘাত করে নতুন এক দিগন্ত খুলে দিয়েছেন। বিখ্যাত জিনতত্ত্ববিদ জর্জ চার্চ এবং প্রধান গবেষক ফেলিক্স র্যাডফোর্ডের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণার ফলাফল গত ২৬ আগস্ট বিখ্যাত নেচার বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রথম বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির বেঁধে দেওয়া নিয়মের বাইরে গিয়ে কাস্টম প্রোটিন তৈরির ঐতিহাসিক এক মাইলফলক স্থাপন করলেন।
এই অসাধ্য সাধনের পেছনে রয়েছে এজেন্টেক্স (AGENTEX) নামে একটি অটোমেটেড রোবটিক প্ল্যাটফর্ম। গবেষকেরা তাঁদের পরীক্ষার জন্য বেছে নেন পরীক্ষিত অণুজীব ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়াকে। কোষের ভেতরে থাকা রাইবোজোমের মূল কাঠামোর ওপর বিজ্ঞানীরা এক ধরনের সূক্ষ্ম আণবিক অস্ত্রোপচার চালান। তাঁরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রাইবোজোমাল আরএনএর নির্দিষ্ট স্থানে ‘জি২২৫১সি’ এবং ‘জি২৫৫৩সি’ নামের দুটি সুনির্দিষ্ট মিউটেশন ঘটান।
সাধারণ চোখে এটি সামান্য কয়েকটি অক্ষর বদল মনে হতে পারে, কিন্তু আণবিক স্তরে এটি ছিল প্রকৃতির কঠোর নিয়মের বিরুদ্ধে এক সফল বিদ্রোহ। এই পরিবর্তনের ফলে রাইবোজোম তার চেনা নিয়ম ভেঙে বিকল্প সিজিএ (সাইটোসিন, গুয়ানিন, অ্যাডেনিন) প্রান্তযুক্ত non-CCA-3 টি-আরএনএ গ্রহণ করতে শুরু করে। এতদিন যে উপাদানগুলো ত্রুটিপূর্ণ বলে বাতিল হতো, এই জাদুকরী মিউটেশনের কারণে তা এখন কোষের কাছে সম্পূর্ণ কার্যকর বলে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে মোট ৬৪টি কোডন মিলে ২০টি অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করে। এখানে একাধিক কোডন একই অ্যামিনো অ্যাসিডকে নির্দেশ করতে পারে।
এই গবেষণায় বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে কোষের অন্যান্য প্রোটিনের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। প্রোটিন তৈরিতে রাইবোজোম একা কাজ করে না; এর সঙ্গে কোষের অন্যান্য এনজাইমও যুক্ত থাকে। রাইবোজোমের এই নতুন আচরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোষের স্বাভাবিক এনজাইমগুলোও নিজেদের কাজের ধরন বদলে ফেলে। তারা কোনো বাধা ছাড়াই এই নতুন নিয়মের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়। সেই সঙ্গে পরিবর্তিত টি-আরএনএগুলো সফলভাবে অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে পরিপূর্ণ করতে সক্ষম হয়। এই নিখুঁত সমন্বয় প্রমাণ করে, কোষের ভেতরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আমরা পুরো একটি নতুন জৈবিক ইকোসিস্টেম তৈরি করতে পারি।
রাইবোজোমের এই রূপান্তরের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা জীবনের আদিম জিন কোড নতুন করে সাজিয়েছেন। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে মোট ৬৪টি কোডন মিলে ২০টি অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করে। এখানে একাধিক কোডন একই অ্যামিনো অ্যাসিডকে নির্দেশ করতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এজেন্টেক্স প্ল্যাটফর্মের সাহায্যে এই জটিল কোডকে সংকুচিত করে ফেলেন। তাঁরা ২০টি সাধারণ অ্যামিনো অ্যাসিডের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ২০টি কোডন বরাদ্দ করেন। ফলে বাকি ১৪টি কোডন সম্পূর্ণ নতুন বা নন-স্ট্যান্ডার্ড অ্যামিনো অ্যাসিড যুক্ত করার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। প্রকৃতির ২০ অক্ষরের বর্ণমালা যেন রাতারাতি ৩৪ কোডনের এক অত্যাধুনিক সিস্টেমে রূপান্তরিত হলো! এই নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম অ্যামিনো অ্যাসিডকে প্রোটিনের গঠনে সফলভাবে যুক্ত করেছেন। এটি প্রমাণ করে, ল্যাবরেটরিতে কাস্টম প্রোটিন ডিজাইন করা এখন কোনো কল্পনা নয়, প্রমাণিত বাস্তবতা।
রাইবোজোমের নতুন আচরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোষের স্বাভাবিক এনজাইমগুলো নিজেদের কাজের ধরন বদলে ফেলে। তারা কোনো বাধা ছাড়াই এই নতুন নিয়মের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়।
নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার প্রভাব মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎকে বদলে দিতে পারে। সম্পূর্ণ কোষবিহীন বা সেল-ফ্রি ব্যবস্থায় পরিচালিত এই প্রযুক্তি চিকিৎসা বিজ্ঞান ও শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। কোষের বাইরে একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রোটিন তৈরির ফলে বিজ্ঞানীরা এখন যেকোনো কল্পনীয় প্রোটিন কাঠামো তৈরি করতে পারবেন। এর সাহায্যে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের রাসায়নিক গঠন এবং জৈব পলিমার তৈরি করা সম্ভব হবে, যা প্লাস্টিক দূষণ রোধে বা টেকসই উপকরণ তৈরিতে বিপ্লব ঘটাতে পারে। সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো এর নিখুঁত বায়োকনটেইনমেন্ট বা সুরক্ষা ব্যবস্থা। যেহেতু এই কৃত্রিম উপাদানগুলো কেবল ল্যাবরেটরির কোষবিহীন পরিবেশেই কাজ করতে পারে। তাই সাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশে এগুলো সম্পূর্ণ অকার্যকর থাকে। ফলে ল্যাব থেকে বেরিয়ে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার বা কোনো বিপদ ডেকে আনার কোনো আশঙ্কা নেই।
কোষের বাইরে একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রোটিন তৈরির ফলে বিজ্ঞানীরা এখন যেকোনো কল্পনীয় প্রোটিন কাঠামো তৈরি করতে পারবেন।
তবে এই গবেষণার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর তাৎপর্য লুকিয়ে আছে এর চিকিৎসাসম্ভাবনায়। প্রচলিত কেমোথেরাপি ক্যানসার কোষের পাশাপাশি সুস্থ কোষেরও ক্ষতি করে। কিন্তু এই কাস্টম-ডিজাইন করা কৃত্রিম প্রোটিনগুলো ক্যানসার বা দূরারোগ্য ব্যাধির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতকৃত বা পার্সোনালাইজড চিকিৎসার নতুন যুগের সূচনা করবে। বিজ্ঞানীরা অদূর ভবিষ্যতে এমন সব ‘স্মার্ট প্রোটিন’ ডিজাইন করতে পারবেন, যা শরীরে প্রবেশ করে জিপিএস ট্র্যাকারের মতো নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষকেই খুঁজে বের করে ধ্বংস করবে এবং সুস্থ কোষগুলোকে অক্ষত রাখবে। জীবনের আদিম রহস্য খোঁজার পাশাপাশি বিজ্ঞান আজ নিজের হাতেই জীবনের এক উন্নত রূপরেখা আঁকতে শুরু করেছে, যা মানবজাতিকে রোগমুক্ত দীর্ঘায়ুর পথে নিয়ে যেতে পারে।