মুহাম্মাদ রাহাতুল ইসলাম
ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম পরিণতি হয়তো বিস্মৃতি। যুদ্ধ শেষ হয়, সাম্রাজ্য ভেঙে যায়, শাসক বদলে যায়, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় সেই মানুষগুলোর নাম; যাঁদের আত্মত্যাগ একদিন ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। শতাব্দীপ্রাচীন ঢাকা এমনই অসংখ্য বিস্মৃত স্মৃতির শহর। এই নগরীর অলিগলি, পুরোনো রাস্তা, মসজিদ, কবর আর ধ্বংসপ্রায় স্থাপনাগুলোর বুকে আজও ছড়িয়ে আছে বহু অজানা ইতিহাসের চিহ্ন। যা অধিকাংশ মানুষের চোখ এড়িয়েই থেকে গেছে। ‘গোর-এ শহীদ মাজার’ তেমনই এক নীরব স্মৃতিচিহ্ন।
বর্তমানে লালবাগ কেল্লার উত্তর-পশ্চিমে, স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানার পাশের আজিমপুর রোডে এটি অবস্থিত। এখানকার আশপাশের পিচঢালা পথ ও দালান কোটার নিচে চাপা পড়ে আছে ঢাকার এক বিষাদময় ইতিহাস। প্রথম দর্শনে একে শহরের সাধারণ এক ব্যস্ত গলি মনে হতে পারে, কিন্তু এই মাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, হারিয়ে যাওয়া লড়াই আর রক্তে ভেজা আত্মত্যাগের করুণ কাহিনি। বহু নাম না-জানা শহীদের স্মৃতি বহন করে আজও দাঁড়িয়ে আছে এই ‘গোর-এ শহীদ মাজার’। যা স্থানীয়দের কাছে ‘ঘোড়া শহীদের মাজার’ নামে পরিচিত।
লালবাগ ও আজিমপুরকে বিভক্তকারী বিষ্ণুচরণ দাস স্ট্রিট ও আতশখানাসহ আশপাশের এলাকার কিছু অংশ মিলিয়ে একসময় এই জায়গার নাম ছিল ‘গৌড়ে-শহীদ’। সেই নামের পেছনে লুকিয়ে আছে উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৮৫৭ সালের এক করুণ ও রক্তাক্ত অধ্যায়।
আরও পড়ুন
কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে লালবাগ কেল্লা
লেখক নাজির হোসেনের বিখ্যাত ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ গ্রন্থে এই ভুলে যাওয়া ইতিহাসের একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, ‘১৮৫৭ সালে যখন সারা ভারতবর্ষে সিপাহি বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে; তখন ঢাকার বাতাস উত্তপ্ত হলেও বিদ্রোহ দেখা দেয়নি।’ তার দাবি অনুযায়ী, ‘এক দল হিন্দু সরকারী কর্মচারীদের উস্কানী, গুজব, বানোয়াট কাহিনী দ্বারা ঢাকার মানুষকে বিদ্রোহের মন্ত্র থেকে দ্বিধা বিভক্ত করে সিপাহীদের বিরুদ্ধে ঢাকার লোকজনকে বিষিয়ে তুলেছিল। এসব কাজে বড় বড় রইশ, জমিদার বিশেষ করে ঢাকার নবাব আব্দুল গণী ও বাবু রূপলাল দাস ইংরেজদের সর্বোতভাবে বিদ্রোহ দমনে সহায়তা করেছিলেন।’
তার বর্ণনায়, ‘এরপরও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে অল্পসংখ্যক ইংরেজ কলকাতা থেকে নৌ সেনা আনায়ন করে সেই সঙ্গে ঢাকার ইংরেজ সৈন্য ও স্বেচ্ছাসেবকগণ যৌথভাবে আকস্মিক আক্রমণ চালায় অতিপ্রত্যুষে লালবাগ দুর্গে। লালবাগ দুর্গের কালা তথা দেশী সিপাহীরা এই দুর্গে মুহূর্তে সাহসের সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধ করেও নেতৃত্বের অভাব, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, অস্ত্রের অভাব এবং শহরের সকল শ্রেণীর অধিকাংশ জনগণ এর সহযোগিতা ও সমর্থনের অভাবে পরাজয় বরণ করে।’
বইটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এই সংক্ষিপ্ত অথচ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বেশ কিছু দেশী সিপাহী শাহাদত বরণ করে। পর দিবস হতে ধৃত সিপাহী ও তাদের সমর্থকদের আন্টাঘর ময়দানের বৃক্ষরাজিতে প্রকাশ্যে ফাঁসির কাষ্ঠে হত্যা করে তাদের লাশ বহুদিন পর্যন্ত গাছের ডালেই ঝুলিয়ে রেখেছিল। সে লাশ পচে গেলে কাক, চিল, শকুনে খেয়েই শেষ করেছিল। তাদের কোথাও কবর দেওয়া হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’
আরও পড়ুন
আলোর মুখ দেখছে প্রাচীন ঐতিহাসিক শ্যামসুন্দর মন্দির
নাজির হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘কেল্লার ভেতরে যারা শহীদ হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকের লাশ কেল্লার ভেতরের পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। এবং গোকুলচর নিবাসী সোনা মিয়া পাঁচটি নৌকা দিয়ে সেসব লাশ তুলে বুড়িগঙ্গার স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়ার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। বাকিদের সমাহিত করা হয় ‘গোড়ে-শহীদ’ এলাকায়।’ তার মতে, ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলনের এই শহীদ সিপাহিদের দাফনের কারণেই এলাকাটি বহু বছর ধরে ‘গোড়ে-শহীদ’ নামে পরিচিত ছিল।
গোর-এ শহীদ যেভাবে ‘ঘোড়া শহীদ’ হয়
নাজির হোসেন লিখেছেন, ‘এ ঘটনার কিছুকাল পর থেকেই সিপাহী শহীদদের স্মৃতি মুছে ফেলার জন্য সাম্রাজ্যবাদী চক্র এ নামের বিকৃতি করে ‘ঘোড়া শহীদ’ বলে প্রচার করতে থাকে। সরলমতি মুসলমানগণও পরবর্তীকালে এ এলাকাকে ঘোড়া শহীদ নামে ডাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এই সিপাহীদের মধ্যে অনেক আল্লাওয়ালা অর্থাৎ বুজুর্গ ব্যক্তিও ছিলো।’
যেভাবে এলো ‘গৌর-এ শহীদ মাজার’
নাজির হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানার দক্ষিণ-পূর্বে দেখা যাওয়া কবর-মাজারগুলো ১৮৫৭ সালের শহীদ সিপাহিদের। রাস্তার সঙ্গে মিশে থাকা একটি কবরের কারণে অজান্তেই সেখানে অমর্যাদা হতো, এমনকি যানবাহন দুর্ঘটনাও ঘটতো। তার বর্ণনায়, ‘পরে তৎকালীন পিডব্লিউডি আজিমপুর কলোনির দায়িত্ব গ্রহণ করলে এর কর্মকর্তা মি. লেং কিন কবরটির কাছে কাজ বন্ধ করে স্থানটি চিহ্নিত করে দেন। এরপর থেকেই মানুষ কবরটিকে শ্রদ্ধা করতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে এটি সম্প্রসারিত হয়ে আজকের মাজারে পরিণত হয়। যেখানে নিয়মিত মিলাদ, ওয়াজ ও শিরনি-সালাত অনুষ্ঠিত হয়।’
আরও পড়ুন
ব্রহ্মপুত্রের তীরে নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জয়নুল সংগ্রহশালা
বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, মাজারের একটু পশ্চিমে রাস্তার দক্ষিণ পাশে আরেকটি পাকা কবর ছিল, যাকে ঘিরে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে শ্রদ্ধা ও ভয় দুই-ই পোষণ করে এসেছে। নাজির হোসেন লিখেছেন, ‘একসময় অনেকে শত্রুতা থেকে বাঁচতে বা শত্রুর ক্ষতি করার আশায় মাটির তৈরি একটি ঘোড়ার পা ভেঙে কবরের ওপর রেখে দিতেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, ঘোড়ার পা ভেঙে দিলে যেমন ঘোড়া দৌড়াতে পারবে না, তেমনি শত্রুও ক্ষতি করতে পারবে না।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘৩/৪ যুগ পূর্বে এ ধরনের মানতকারীর সংখ্যা ঢাকাবাসীর মধ্যে অনেক ছিলো।’ জানা যায়, এখানে আরও কয়েকটি কবর ছিল, যা বর্তমানে বিলীন হয়ে গেছে।
প্রবীণদের বরাতে নাজির হোসেন লিখেছেন, ‘গোরে-শহীদের উত্তর পাশে স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানার মেয়েদের আবাসিক ভবন ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের সময় মাটি খুঁড়ে পোড়ামাটির তৈরি ছোট ছোট ঘোড়া, হাতি, ছাগল, ভেড়া ও গরুর মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল।’ তার ধারণা, একসময় এখানে কুমারদের বসবাস ছিল। সম্ভবত তাদের তৈরি পা-ভাঙা ঘোড়াগুলোর কোনোটি পরে কবরের ওপর রাখা হয়েছিল, যেখান থেকে শত্রু বশ করার এই বিশ্বাসের উৎপত্তি ঘটে।
‘কিংবদন্তির ঢাকা’ বই থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪২-৪৩ সালে ঢাকা পৌরসভা গোরে-শহীদ মহল্লার নাম পরিবর্তন করে ‘বিষ্ণুচরণ দাস স্ট্রিট’ রাখে। বর্তমানে ‘গোর-এ শহীদ মাজার’ নামে আজিমপুর রোডে একটি মাজারই অবশিষ্ট আছে। মাজারটির পাশে স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানার ভেতরে আছে ‘গোর-এ শহীদ মসজিদ’। মসজিদের প্রবেশপথে থাকা ফার্সি ও উর্দুর মিশ্রণে লেখা একটি ফলক থেকে জানা যায়, ১৯৩৫ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার জেলা জজের নির্দেশে আলহাজ খান সাহেব চৌধুরী ফরিদউদ্দিন আহমদ সিদ্দিকী ‘গোর শহীদ মসজিদ’-এর মুতাওয়াল্লি (তত্ত্বাবধায়ক) নিযুক্ত হন এবং ১৯৩৮ সালে তিনি মসজিদটি সম্প্রসারণ করেন।
আরও পড়ুন
কবি ফররুখ আহমদের শেষ স্মৃতিচিহ্নও কি হারিয়ে যাবে?
এত সমৃদ্ধ ও রক্তাক্ত অতীত সত্ত্বেও আজিমপুর রোড দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করা স্থানীয় মানুষের অধিকাংশই এই মাজারের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আজিমপুর রোডের এই মাজারের ইতিহাস নিয়ে আরও গবেষণার সুযোগ আছে। নাজির হোসেনের বর্ণনা, পুরোনো দলিল, স্থানীয় ঐতিহ্য এবং বিদ্যমান নিদর্শন সবকিছু একসঙ্গে বিচার করেই হয়তো একদিন স্পষ্ট হবে গৌর-এ শহীদের প্রকৃত ইতিহাস। ততদিন পর্যন্ত এই মাজার শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি ঢাকার অতীতের এক অমীমাংসিত স্মৃতিচিহ্ন হয়েই টিকে থাকবে।
লেখক: তরুণ কলাম লেখক ও সেচ্ছাসেবী।
এসইউ