সবুজ পাহাড়ের ঢালে ঢালে এখন জুমের পাকা ধানে সোনালি আভা। কোথাও জুমের ধান কাটার ধুম পড়েছে, কোথাও আবার পাকা ধান পাহারা দিচ্ছেন জুমচাষিরা। পাকা ধানের পাশাপাশি জুমে আবাদ করা অন্যান্য ফসলও ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জুমিয়ারা।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউপির যামিনী পাড়া এলাকায় গিয়ে এ তথ্য জানা যায়।
প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে পাহাড়ের ঢালু ভূমিতে চাষ করা জুমের ধান কাটা শুরু হওয়ায় জুমিয়াদের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি। চোখের দৃষ্টি যতদূর যায়, বিশাল সবুজ পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাচ্ছে জুমের পাকা সোনালি ধান।
চলতি বছর সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় জুমের ধান বপনে খুব বেশি সময়ের ব্যবধান হয়নি। ফলে অনেক এলাকায় জুমের ফলনও তুলনামূলক ভালো হয়েছে। তবে পাহাড়ি অঞ্চলে সব জায়গায় বৃষ্টিপাত সমান না হওয়ায় জুমের ধানও একই সময়ে পাকে না। যারা বৈশাখ মাসের শুরুতে প্রথম বৃষ্টির পর ধান বপন করতে পেরেছেন, তাদের জুমের ধান আগে কাটার উপযোগী হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রিং লট ম্রো (৫৭) স্বপরিবারে এবং শ্রমের বিনিময়ে শ্রম নীতিতে কাজ করা আট নারী শ্রমিককে নিয়ে জুমের পাকা ধান কাটছিলেন।
রিং লট ম্রো জানান, চলতি বছর তিনি তিন আড়ি (প্রতি আড়ি ১০ কেজি) বীজের ধান দিয়ে প্রায় তিন একর পাহাড়ি জমিতে জুম চাষ করেছেন। এবারের জুমের ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় ধানের ফলন ভালো হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘আগে সময়মতো রোদ-বৃষ্টি হলে জুমের ধান ভালো হতো। এখন সময়মতো রোদ-বৃষ্টি হয় না। প্রকৃতিও যেন উল্টো হয়ে গেছে। তারপরও এ বছর জুমের ফলন নিয়ে সন্তুষ্ট তিনি।
রিং লট ম্রোর আশা, তিন একর জুম থেকে এবার প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ আড়ি ধান পাওয়া যাবে। ফলন আরও ভালো হলে আড়াইশ আড়ি পর্যন্ত ধান পাওয়া সম্ভব হতো বলেও জানান তিনি।
২৫ বছর পুলিশে চাকরি করার পর চলতি বছরের জুন মাসে অবসর নিয়েছেন রিং লট ম্রো। অবসরের পর বসে না থেকে বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী পেশা জুম চাষে ফিরেছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘জুমে শুধু ধান হয় না। বেগুন, মারফা, তিল, যব, ভুট্টা, চিনাল, মরিচ, রোজেলাসহ ৩০-৩৫ ধরনের সাথি ফসল হয়। বাজার থেকে শুধু লবণ আর নাপ্পি (এক ধরনের শুঁটকি) কিনলেই চলে। জুম যেন আমাদের জন্য একটি বাজারের মতো। প্রয়োজনীয় অনেক সবজি এখান থেকেই পাওয়া যায়।’
জুমের ধান কাটার কাজে ব্যস্ত নারী শ্রমিক সংডং ম্রো (১৯) বলেন, ‘জুম না করলে আমরা কী খাবো? জুম করতেই হবে। প্রতিবছর আমরা জুম চাষ করি। এটা আমাদের ঐতিহ্য।’
তিনি জানান, জুমে ধানের পাশাপাশি মিষ্টি কুমড়া, মারফা, বেগুন, ভুট্টা, তিল, মরিচ, ঢেঁড়সসহ ৩০-৩৫ ধরনের সাথি ফসল উৎপাদন করা হয়। এসব সাথি ফসল নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করে কিছু অর্থও আয় করেন জুমচাষিরা।
জুম চাষ মূলত প্রকৃতি ও মৌসুমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা একটি দীর্ঘ কৃষি প্রক্রিয়া। প্রতিবছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে পরবর্তী বছরের জুম চাষের জায়গা নির্বাচন করা হয়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধারিত পাহাড়ি এলাকায় জঙ্গল কাটা শুরু হয়।
কাটা জঙ্গল রোদে শুকানোর পর মার্চ-এপ্রিল মাসে নির্দিষ্ট জায়গায় ‘ফায়ারিং লাইন’ তৈরি করে আগুন দিয়ে জঙ্গল পোড়ানো হয়। এরপর পুরো এপ্রিল মাসজুড়ে জুমের জায়গা পরিষ্কার করে ধান ও সাথি ফসল বপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
প্রথম বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকেন জুমচাষিরা। বৈশাখের শুরুতে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি হলে জুমে ধানসহ বিভিন্ন সাথি ফসলের বীজ বপন করা হয়। যারা প্রথম বৃষ্টির পর দ্রুত বীজ বপন করতে পারেন, তাদের জুমের ধান আগে পাকে। আর যারা কিছুটা দেরিতে বপন করেন, তাদের ধানও দেরিতে কাটার উপযোগী হয়।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, জেলায় প্রতিবছরই জুম চাষের পরিমাণ বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জুম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ হাজার ১৬২ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৯৫৬ মেট্রিক টন। ওই বছর ৮ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে জুম আবাদ হয়ে উৎপাদন হয় ১০ হাজার ৪৮৯ দশমিক ৭১ মেট্রিক টন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে জুম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ৪৮৭ হেক্টর এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ হাজার ৬২৪ মেট্রিক টন। ওই বছর ৮ হাজার ২৬৭ হেক্টর জমিতে জুম আবাদ হয় ১২ হাজার ৪৯৯ দশমিক ৪১ মেট্রিক টন চাল।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একই পরিমাণ জমিতে আবাদ হয়েছে। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৩৮৭ দশমিক ৯৩ মেট্রিক টন চাল। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় জুমের পাকা ধান কাটা চলছে।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ তৌফিক আহমেদ নূর বলেন, ‘চলতি বছর বান্দরবানে প্রায় ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। জুমে ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সাথি ফসলও উৎপাদন হয়ে থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ বছর জুমের ফলন ভালো হওয়ার আশা করা যাচ্ছে। তবে পার্বত্য অঞ্চল হওয়ায় সব জায়গায় সমানভাবে বৃষ্টিপাত হয় না। ফলে একেক এলাকার ফলন একেক রকম হয়।’
তিনি জানান, বান্দরবানের রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি ও আলীকদম উপজেলার দুর্গম এলাকায় ইতোমধ্যে জুমের পাকা ধান কাটা শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য উপজেলাতেও ধান কাটা শুরু হবে। জুমের উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়ে থাকে।
পাহাড়ের ঢালে ঢালে এখন চলছে ধান কাটার উৎসব। বছরের দীর্ঘ শ্রমের ফসল ঘরে তোলার আনন্দে ব্যস্ত পাহাড়ের মানুষ। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা জুমচাষিদের কাছে এই ধান শুধু খাদ্য নয় এটি তাদের জীবন, জীবিকা ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্যের অংশও।
নয়ন চক্রবর্তী/কেজে/এএসএম