একসময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ত্রিদেশীয় সিরিজ। তিন দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টগুলো ক্রিকেটপ্রেমীদের দিত ভিন্ন স্বাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নতুন সমীকরণ এবং বাড়তি উত্তেজনা। একটি দলের জয়-পরাজয় যেমন নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করত, তেমনি প্রভাব ফেলত অন্য দুই দলের ভাগ্যেও।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচি, বাণিজ্যিক বাস্তবতা এবং দ্বিপাক্ষিক সিরিজের আধিপত্যের কারণে ত্রিদেশীয় ও বহুজাতিক সিরিজ প্রায় হারিয়ে গেছে। একসময় যে আয়োজন ক্রিকেটের ক্যালেন্ডারের নিয়মিত অংশ ছিল, এখন তা পরিণত হয়েছে বিরল ঘটনায়।
তবে সেই পুরোনো রোমাঞ্চ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আগামী ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর দুবাইয়ে আইসিসির ফিউচার ট্যুর প্রোগ্রাম (এফটিপি) নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৭ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সূচি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে আয়োজিত এ বৈঠকে বিভিন্ন পূর্ণ সদস্য দেশের পাশাপাশি শীর্ষ সহযোগী দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও অংশ নেবেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত থাকবেন।
ক্রিকেট বোর্ডগুলোর মধ্যে ক্রমেই এমন ধারণা জোরালো হচ্ছে যে শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আগের মতো আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় নয়। বরং একাধিক দল নিয়ে আয়োজিত বহুজাতিক টুর্নামেন্ট বা ত্রিদেশীয় সিরিজ দর্শক, স্পন্সর এবং সম্প্রচারস্বত্বের দিক থেকে বেশি লাভজনক হতে পারে। ফলে আগামী এফটিপিতে এমন আয়োজনের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে ত্রিদেশীয় সিরিজের আয়োজন খুবই সীমিত। ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর মাত্র একটি ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাকিস্তান অংশ নেয়। অন্যদিকে নামিবিয়ায় বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে একটি টি-টোয়েন্টি ত্রিদেশীয় সিরিজ চলছে।
ভারতের মতো বড় ক্রিকেট শক্তির ক্ষেত্রেও এমন সিরিজ এখন বিরল। ২০১১ বিশ্বকাপের পর ভারত মাত্র কয়েকটি ত্রিদেশীয় সিরিজে অংশ নিয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশও ২০১৯ সালে আয়ারল্যান্ডে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও স্বাগতিকদের বিপক্ষে একটি ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলেছিল। একই বছরে আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে ঢাকায় টি-টোয়েন্টি ত্রিদেশীয় সিরিজ আয়োজন করে বিসিবি। এরপর ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডে পাকিস্তান ও স্বাগতিকদের সঙ্গে আরেকটি ত্রিদেশীয় সিরিজে অংশ নেয় বাংলাদেশ।
বিসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দ্বিপাক্ষিক সিরিজের তুলনায় ত্রিদেশীয় সিরিজ বাণিজ্যিকভাবে বেশি লাভজনক। কারণ সময়ের ব্যবধান খুব বেশি না হলেও দর্শক আগ্রহ, টিকিট বিক্রি, স্পন্সরশিপ এবং সম্প্রচারমূল্য তুলনামূলক বেশি হয়। একাধিক দলের উপস্থিতি পুরো আয়োজনকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও আকর্ষণীয় করে তোলে।
তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে না। আগামী কয়েক বছরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, ওয়ানডে বিশ্বকাপ এবং বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ব্যস্ত সূচির মধ্যে ত্রিদেশীয় সিরিজের জন্য জায়গা বের করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
তারপরও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বহুজাতিক সিরিজের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আভাস মিলছে। এ ক্ষেত্রে শুধু আয়োজক দেশ নয়, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যেও সম্প্রচারস্বত্ব ও বাণিজ্যিক আয় ভাগাভাগির নতুন মডেল চালু হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে ক্রিকেটপ্রেমীরা আবারও ত্রিদেশীয় সিরিজের সেই পুরোনো রোমাঞ্চ ফিরে পেতে পারেন।