গত ফেব্রুয়ারিতে সাভারের একটি মাদরাসায় সাত বছর বয়সী এক শিশুটিকে ভর্তি করা হয়েছিল। কিছু দিন যেতে না যেতেই সেখানে বয়সে বড় এক সহপাঠীর মাধ্যমে তার ওপর শুরু হয় ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন।
সেই ঘটনাটি ওই মাদরাসার আরেক শিক্ষার্থী জেনে যাওয়ার পর সে নিজেও শিশুটিকে ধর্ষণ করে। এভাবে মাদরাসাটির অন্তত তিন শিক্ষার্থী (তিনজনই বয়সে কিশোর) শিশুটিকে বিভিন্ন সময়ে ধর্ষণ করে। যা চলে প্রায় ছয় মাস ধরে।
ঘটনা জানাজানির একপর্যায়ে শিশুটির বাবা বাদী হয়ে গত ২৩ আগস্ট ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন।
সাত বছরের ওই শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের মামলায় গ্রেফতার পাঁচ আসামিকে আদালতে হাজির করা হলে তাদের মধ্যে মক্তব বিভাগের সহকারী শিক্ষক হাফেজ মাওলানা জাবের হোসেন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। একই মামলার আসামি আরেক শিক্ষক কামরুল ইসলামকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বয়স কম হওয়ায় অন্য তিন আসামিকে পাঠানো হয়েছে গাজীপুরের টঙ্গী কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার এসআই সামরুল হোসেন আসামিদের আদালতে হাজির করেন। তিনি জাবের হোসেন ও দুই শিশুর জবানবন্দি রেকর্ড এবং কামরুল ইসলাম ও অন্য শিশুকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।
আরও পড়ুন
সাভারে মাদরাসাছাত্রকে বলাৎকার, গ্রেফতার ৫
পরে ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্নার আদালতে জাবের হোসেন ও দুই শিশুকে জবানবন্দি দেওয়ার জন্য নেওয়া হয়। জাবের হোসেন আদালতে জবানবন্দি দিলেও দুই শিশু তা দিতে রাজি হয়নি। এরপর তাদের টঙ্গী কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। আর কামরুল ইসলামকে কারাগারে পাঠান আদালত।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আবুল কালাম জাগো নিউজকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মামলার তদন্তে এরই মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বরগুনা, ভোলা, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
এদিকে, মামলা করার পর থেকেই ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শিশুটির বাবা অভিযোগ করেছেন, মামলা তুলে না নিলে তাকে গুম করার হুমকি দিয়ে ফোন করা হচ্ছে। এ কারণে পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বলে অভিযোগ তার।
সাভারের কাশেমীনগর পূর্ব শাহীবাগের মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসার পরিচালক মুহতামিম জিয়া ইবনে কাসেমসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে গত ২৩ আগস্ট ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করার আবেদন করেন শিশুটির বাবা।
আদালত অভিযোগটি সাভার মডেল থানায় এজাহার হিসেবে নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে ২৭ আগস্ট থানার পক্ষ থেকে মামলার এজাহার আদালতে পাঠানো হয়। ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর আহমদ এজাহার গ্রহণ করে আগামী ১৩ অক্টোবরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শিশুটিকে ওই মাদরাসায় ভর্তি করা হয়। সেখানে ফজরের নামাজের পর থেকে এশার নামাজের আগ পর্যন্ত পড়াশোনা চলতো। সপ্তাহে একদিন তার বাবা মাদরাসায় গিয়ে ছেলের সঙ্গে দেখা করতেন। শুক্রবার ছুটির দিনে শিশুটিকে বাড়িতে নিয়ে যেতেন তিনি।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার প্রায় তিন সপ্তাহ পর থেকে কয়েকজন আসামি শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করতে শুরু করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি তৃতীয় রোজার দিন সন্ধ্যায় এক শিক্ষার্থীর মাধ্যমে প্রথমবার ধর্ষণের শিকার হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি কাউকে জানালে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
লুঙ্গিতে শুক্রাণু ফেলেন বোনের শ্বশুর হিটু শেখ, ডিএনএতে প্রমাণিত
পরবর্তী সময়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশুটিকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এজাহারে বলা হয়, ৬ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এসব ঘটনা ঘটে। এমনকি নির্যাতনের বিষয়টি কয়েকজন শিক্ষকের কাছে জানাতে গিয়ে শিশুটি আবারও যৌন নির্যাতনের শিকার হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনাগুলো মাদরাসায় জানাজানি হওয়ার পর অভিযোগ ওঠা এক শিক্ষার্থীকে ‘বড় হুজুর’ মারধর করেন। পরে ১২ আগস্ট শিশুটি তার মাকে পুরো ঘটনা জানায়।
এরপর ১৫ আগস্ট রাতে শিশুটির বাবা মাদরাসার পরিচালক জিয়া ইবনে কাসেমের কাছে বিষয়টি জানান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, এসময় জিয়া ইবনে কাসেম ৯৯৯-এ ফোনকল করে অভিযুক্তদের পুলিশের কাছে তুলে দেওয়ার কথা বললেও একই সঙ্গে পুলিশ ও সাংবাদিকদের বিষয়টি জানাতে নিষেধ করেন।
শিশুটির বাবার অভিযোগ, মাদরাসাটিতে আরও শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনাতেও একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। মামলার অভিযোগে জিয়া ইবনে কাসেমসহ কয়েকজনের নাম সেই চক্রের সদস্য হিসেবে উঠে এসেছে।
এমডিএএ/এমকেআর