ইতালির ভেনিসে স্টেজ শো শেষে বর্তমানে সুইডেনের স্টকহোমে অবস্থান করছেন দেশের ব্যান্ড সংগীতের জনপ্রিয় তারকা ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস। আজ ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় স্টকহোমের নাকার মঞ্চে গান পরিবেশন করবেন তিনি। কনসার্টের আগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগীতজীবন, নতুন গান, লাইভ মিউজিক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে কথা বলেন জেমস।
বর্তমান সময়ে সংগীত তৈরিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে এআই দিয়ে তৈরি গান নিয়ে বিশ্বজুড়েই চলছে নানা আলোচনা। বিষয়টি নিয়ে নিজের ভাবনা জানিয়ে জেমস বলেন, নতুন প্রজন্মের অনেক মেধাবী শিল্পী সংগীতে আসছেন। তবে প্রযুক্তির কারণে বর্তমানের সংগীত অনেক বেশি নিখুঁত হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
জেমস বলেন, ‘নতুন অনেক শিল্পী আসছে, অনেক মেধা নিয়ে। কিন্তু এ মুহূর্তে মিউজিক খুব পারফেক্ট হয়ে যাচ্ছে। খুবই পারফেক্ট। যেমন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সও আসছে।’
তার মতে, অতিরিক্ত নিখুঁত সংগীত একসময় শ্রোতাদের কাছে একঘেয়ে হয়ে উঠতে পারে। তখন স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত লাইভ মিউজিকের আবেদন আরও বাড়বে। জেমস বলেন, ‘এত পারফেকশন মানুষকে একসময় বোরড করে দেবে। তখন এই যে লাইভ ব্যাপারটা, এটাই সারা জীবন থেকে যাবে। লাইভটা হচ্ছে জীবনের মতো আরকি। ডায়নামিকস থাকে লাইভে।’
এআই দিয়ে তৈরি গান নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন জেমস। তিনি বলেন, ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়ে যে মিউজিকগুলো এখন হচ্ছে, স্পটিফাইসহ বিভিন্ন জায়গায়—এসব একসময় বোরড লাগবে মানুষের কাছে। প্রথমে একটু ভালো লাগবে, এরপর বোরড হয়ে যেতে হবে। লাইভ যেটা, সত্যিকারের মিউজিক, ওইটা মনে হয় আবার ফিরে আসবে। আসতে হবে। এটা থাকবেই।’
নিয়মিত কনসার্টে ব্যস্ত থাকার কারণে নতুন গান প্রকাশের জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করতে পারছেন না বলেও জানান জেমস। তিনি বলেন, ‘মঞ্চে গান করতে করতে সময় খুব কম পাই। তবু চেষ্টা করছি খুব নতুন গান আবার আনার জন্য।’
আরও পড়ুন
সাবিনা ইয়াসমীনের যে গান শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি লতা মঙ্গেশকর
দীর্ঘ সংগীতজীবনে একাধিক প্রজন্মের শ্রোতাদের ভালোবাসা পেয়েছেন জেমস। মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেই ভালোবাসার অনুভূতি কেমন-জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ভালোবাসা তো সব সময় ভালো লাগার একটা জিনিস। যখনই মঞ্চে দাঁড়াই, তখন মনে হয়, সব আগেরই শ্রোতা। এর মধ্যে যে সময় বয়ে যাচ্ছে, চেঞ্জ হচ্ছে প্রজন্ম, এটা খেয়ালই করিনি। এখন মনে হয়, অনেকগুলো প্রজন্ম পার করে এসেছি।’
অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে চান না জেমস। বরং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়েই ভাবতে চান তিনি। তার ভাষায়, ‘ফিরে যেতে চাই না, আমি বর্তমান নিয়ে বিশ্বাসী। যেমন এই মুহূর্তটাই। অতীত নিয়ে ভাবতে চাই না। সামনের দিকে তাকাতে চাই।’
সংগীতকে কোনো কিছু অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেন না জেমস। তার কাছে গান করা প্যাশন ও নেশার বিষয়। তিনি বলেন, ‘কোনো কিছু পাওয়ার জন্য মিউজিক করলে আমার মনে হয় এখনই বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কোনো কিছু পাওয়ার জন্য সংগীত করার কোনো মানে হয় না। সংগীত করতে হবে জাস্ট প্যাশন থেকে, নেশা থেকে। এর বাইরে কোনো কিছু চাওয়ার জন্য মিউজিক করাটা আমি মনে করি ঠিক নয়।’
নিজের জন্য সংগীতচর্চা চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান এই শিল্পী। তিনি বলেন, ‘মিউজিক করতে হবে নিজের জন্য, চর্চা করে যেতে হবে। যদি এর মধ্যে কিছু আসে, সেটা ভিন্ন কথা। আমি যদি সংগীত থেকে কোনো কিছু না- ও অর্জন করতাম, আমি সংগীতই করতাম।’
সংগীত নিয়ে ভবিষ্যতের নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই জেমসের। যত দিন সম্ভব গান করে যেতে চান তিনি। জেমস বলেন, ‘মিউজিক নিয়ে আমার ভবিষ্যৎ কোনো পরিকল্পনা নেই। মিউজিক করে যাব। শেষে যদি দেখি একটা দর্শক আছে, তবু মিউজিকই করে যাব।’
আরও পড়ুন
সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠ নিয়ে যা বললেন কনকচাঁপা
দেশের নতুন ব্যান্ডগুলোর প্রতিও আগ্রহ দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন জেমস। তিনি বলেন, ‘নতুন অনেক ব্যান্ড এসেছে, তারা অনেক ভালোও করছে। নতুন ব্যান্ডগুলো শোনা উচিত। সবারই শোনা উচিত।’
প্রবাসে বাংলা গান ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আয়োজক ও পৃষ্ঠপোষকদের ভূমিকারও প্রশংসা করেন জেমস। তার ভাষায়, ‘বিদেশে যে অনুষ্ঠান হচ্ছে, এর পেছনে যারা যুক্ত থাকেন, তাদের মধ্যে পৃষ্ঠপোষকদের ধন্যবাদ দিতে চাই, যাদের জন্য এই বাংলা গান বা বাংলা সংস্কৃতি বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে।’
বিদেশে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতির সম্পর্ক তৈরিতেও এসব আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। জেমস বলেন, ‘দ্বিতীয় প্রজন্মের বাচ্চারা বিদেশে বেড়ে উঠছে। সম্ভবত ওরা বাংলা অনেক সময় ঠিকমতো বুঝতেও পারে না। কিন্তু স্পনসররা যেভাবে বাংলা সংস্কৃতিকে প্রবাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে, এটা ভীষণ ইতিবাচক একটা দিক।’
প্রবাসীদের দেশের সংস্কৃতির প্রতি টান নিয়েও কথা বলেন জেমস। তিনি বলেন, ‘দেশের বাইরে যারা থাকেন, তাদের মধ্যে আগ্রহ বা উদ্যম অনেক বেশি থাকে। কারণ, তারা দেশের বাইরে থাকেন। তারা দেশের সংস্কৃতিকে মিস করেন। এটা একটা বড় ব্যাপার। প্রবাসের মানুষের আবেগটা একটু বেশি।’
স্টকহোমের কনসার্ট শেষে দেশে ফেরার কথা রয়েছে জেমসের। আয়োজকদের পোস্টার অনুযায়ী, একই আয়োজনে সংগীত পরিবেশন করবেন শিল্পী রাহুল আনন্দও।
এমএমএফ/জেআইএম