দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। একদিনেই প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১০০ পয়েন্টের বেশি কমে গেছে। এতে সূচকের গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক স্তর ৬ হাজার পয়েন্টের সাপোর্টও ভেঙে পড়েছে।
বাজারের এই পতনের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা বা গুজবের চেয়ে অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা ও অতিরিক্ত প্রত্যাশার সংশোধন বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার পাশাপাশি মূল্যসূচকের বড় পতন হয়েছে। সেই সঙ্গে ডিএসইতে কমেছে লেনদেনের পরিমাণ।
এদিন ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার মাধ্যমে। ফলে লেনদেনের শুরুতে সূচকের উত্থান হয়। অবশ্য অল্প সময়ের মধ্যেই দাম কমার তালিকায় চলে আসে বেশি প্রতিষ্ঠান। আর প্রথম ঘণ্টার লেনদেন শেষ হওয়ার পর বাজারে রীতিমতো ধস নামে।
আরও পড়ুন
জ্বালানিতে ‘জ্বলছে’ শেয়ারবাজার
লেনদেনে অংশ নেওয়া একের পর এক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম কমতে থাকে। লেনদেনের শেষ পর্যন্ত চলে এই প্রবণতা। এতে বড় ধরনের ধস নামে বাজারে। একদিনেই ডেএসইর প্রধান সূচক ১০০ পয়েন্টের ওপরে কমে যায়। আর দাম কমার তালিকায় নাম লিখিয়েছে প্রায় সাড়ে ৩০০ প্রতিষ্ঠান।
দিনের লেনদেন শেষে ডিএসই সব খাত মিলে মাত্র ২০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে। বিপরীতে ৩৪৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। আর ২১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
ভালো কোম্পানি বা ১০ শতাংশ অথবা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৮টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে ১৬৮টির দাম কমেছে এবং ১১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মাঝারি মানের বা ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া কোনো কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়েনি। এই গ্রুপের ৭৪টি প্রতিষ্ঠানেরই শেয়ার দাম কমেছে।
বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে ‘জেড’ গ্রুপে স্থান হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১০৬টির এবং ১০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। আর ৭টি মিউচুয়াল ফান্ডের দাম বাড়ার বিপরীতে ১৯টির দাম কমেছে এবং ৮টির অপরিবর্তিত রয়েছে।
আরও পড়ুন
শেয়ারবাজারে দরপতন চলছেই
দাম কমার তালিকা বড় হওয়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ১০৩ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫৫৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ২৪ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১১৬ পয়েন্টে নেমে গেছে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২২ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১১৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
মূল্যসূচক কমার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও কমেছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৫৪৫ কোটি ২৭ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৭২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এ হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন কমেছে ১৭৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
এই লেনদেনে সব থেকে বড় ভূমিকা রেখেছে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার। কোম্পানিটির ২০ কোটি ২১ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা মালেক স্পিনিংয়ের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ২০ কোটি ২০ লাখ টাকার। ১৮ কোটি ৩২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল।
এছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে- সায়হাম টেক্সটাইল, সায়হাম কটন, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, এনভয় টেক্সটাইল, লাভেলো আইসক্রিম এবং নিটল ইন্স্যুরেন্স।
অন্য শেয়ারবাজার সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২০৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩০টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ১৫৭টির দাম কমেছে এবং ১৭টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই কমেছে ১৭১ পয়েন্ট। লেনদেন হয়েছে ১৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ১৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
শেয়ারবাজারের এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকীর জাগো নিউজকে বলেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই বাজার দ্রুত বেড়েছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশার বাস্তব প্রতিফলন না থাকায় বাজারে এখন সংশোধন দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, গত আড়াই বছরে বাজারে নতুন কোনো আইপিও আসেনি। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। বরং বিদ্যমান শিল্পগুলোই জ্বালানি সংকটসহ নানা সমস্যায় ভুগছে। একদিকে জ্বালানি সংকটে কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না, অন্যদিকে ব্যাংকঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানিগুলোর অর্থের ব্যয়ও বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, একদিকে জ্বালানি সংকটে ভুগছে, তার ক্যাপাসিটি রান করতে পারছে না, অন্যদিকে আপনার যে লোনটা দিচ্ছে ব্যাংক থেকে, সেটা হয়তো ১৪-১৫ শতাংশ হারে সুদ দিতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ার দ্বৈত চাপে অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত লভ্যাংশের ওপরও। এ অবস্থায় বাজার ধারাবাহিকভাবে বাড়বে এমন প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না।
আরও পড়ুন
এক বছরের মধ্যে বদলে যাবে পুঁজিবাজার: বিএসইসি চেয়ারম্যান
তবে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক একদিনে ১০০ পয়েন্টের ওপরে কমে যাওয়াকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন বিএসইসি সাবেক এই চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, এত বড় পতনের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কারণ আছে কি না আমি জানি না। এটা অস্বাভাবিক, তবে এটার কারণ হতে পারে যে এই বাজারে নানারকম ইন্টারফেয়ারেন্স (হস্তক্ষেপ) হচ্ছে।
ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, মূলত গ্যাস ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক থেকেই আজকের বড় পতন হয়েছে। পাশাপাশি বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতার ঘাটতি রয়েছে, যা দেশের পুঁজিবাজারের একটি মৌলিক দুর্বলতা।
একদিনে ১০০ পয়েন্টের ওপরে পড়ে যাওয়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা কি না? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ঘটনা আমাদের জানা মতে কিছু না। গুঞ্জনও কিছু না। যেটা হচ্ছে, মানুষ একটু প্যানিক করছে, আমাদের এই ওয়েল (তেল) অ্যান্ড গ্যাস সিচুয়েশনটা নিয়ে। এটা একটা ফ্যাক্টর।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই নেতিবাচক আলোচনা চলছে। গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত এ সংক্রান্ত নেতিবাচক খবর প্রকাশিত হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বেও এর প্রভাব পড়ছে। পেপার-পত্রিকা, টিভি খুললে তো একটাই নেগেটিভ জিনিস। এটা একটু সমস্যা ক্রিয়েট করছে।
সাইফুল ইসলাম বলেন, একদিনে ১০০ পয়েন্টের বেশি পতন কিছুটা অপ্রত্যাশিত। গ্যাস ও জ্বালানি সংকট বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেললেও আজকের মতো বড় পতনের জন্য এটিকে এককভাবে যৌক্তিক কারণ হিসেবে দেখা যায় না। বিনিয়োগকারীরা কিছুটা প্যানিক হয়ে গেছে। এটা আনএক্সপেক্টেড (অপ্রত্যাশিত)। এটা হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ আমরা দেখি না। কিন্তু হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, বাজারে যখন বিক্রির চাপ তৈরি হয়, তখন তা সামাল দেওয়ার মতো শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা না থাকায় পতন দ্রুত বড় আকার ধারণ করে। আমাদের যেহেতু ইনস্টিটিউশনাল বায়ার থাকে না মার্কেটে, সেজন্য যখন পড়ে, তখন ম্যাসিভলি মার্কেট ফল করে। এইটাই হচ্ছে আমাদের বাজারের একটা ফান্ডামেন্টাল উইকনেস। ইনস্টিটিউশনাল বায়ার নাই, যারা মার্কেটটাকে কারেক্ট ওয়েতে সাপোর্ট দিতে পারে।
৬ হাজার পয়েন্টকে সূচকের একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক সাপোর্ট হিসেবে দেখা হচ্ছিল। আজ সেটি ভেঙে গেল, এতে বিনিয়োগকারীরা আরও আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়বেন কি না? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটা ঠিক ৬ হাজার পয়েন্টকে বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক স্তর হিসেবে দেখা হচ্ছিল। আজকের বড় দরপতনে সেই স্তরও ভেঙে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তবে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হবে না। কারণ আজকের ব্যাপারটাই একটা ধারাবাহিকতা ধরে নেওয়াটা ঠিক হবে না। অবশ্য বাজারে কিছুটা আস্থা সংকট রয়েছে, আস্থা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন।
এমএএস/ইএ