নব্বইয়ের দশক। তখন ফ্যাশন ট্রেন্ড ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ছিল না ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা পিন্টারেস্ট। কোনো তারকার নতুন লুক মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগও ছিল না। অথচ সেই সময়েই একজন নায়ক এমন কিছু স্টাইল সামনে এনেছিলেন, যা তরুণদের পোশাক, চুল ও অ্যাকসেসরিজ নিয়ে ভাবনাই বদলে দিয়েছিল। তিনি সালমান শাহ।
আজ তার মৃত্যুর তিন দশক পরও সেই ফ্যাশনকে খুব একটা পুরোনো মনে হয় না। বরং রেট্রো ও ওয়াই-টু-কে ট্রেন্ডের হাত ধরে নব্বইয়ের দশকের অনেক স্টাইলই আবার ফিরেছে নতুন প্রজন্মের পোশাকে। বলিউডের শাহরুখ খান থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পপ সংস্কৃতির পরিচিত মুখ বিটিএসের অনেকের লুকেই এমন কিছু উপাদান দেখা যায়, যার সঙ্গে সালমান শাহর পুরোনো স্টাইলের অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
কপাল ঢেকে ব্যান্ডানা পরা ছিল সালমান শাহর অন্যতম পরিচিত স্টাইল। কখনো ক্যাজুয়াল টি-শার্ট, কখনো ডেনিম, আবার কখনো ভিন্ন ধরনের পোশাকের সঙ্গে ব্যান্ডানাকে তিনি এমনভাবে ব্যবহার করতেন, যা তখনকার পুরুষ ফ্যাশনে বেশ আলাদা ছিল।
তিন দশক পরও মাথার এই ছোট্ট অ্যাকসেসরিজ হারিয়ে যায়নি। বিটিএসের ভির ফ্যাশনেও বিভিন্ন সময়ে ব্যান্ডানা, স্পোর্টস ব্যান্ড ও বেরেটের মতো হেড অ্যাকসেসরিজ দেখা গেছে।
ভির ক্ষেত্রে অবশ্য এগুলো তার নিজস্ব স্টাইলিংয়ের অংশ; তাকে সালমান শাহর অনুসারী বলা যাবে না। তবে দুজনের লুকে একই ধরনের মাথার অ্যাকসেসরিজ ব্যবহারের মিলটি চোখে পড়ার মতো।
সালমান শাহর ব্যাকব্রাশ হেয়ারস্টাইল নব্বইয়ের দশকে ছিল তার আলাদা পরিচয়ের অংশ। তার চুলের স্টাইল শুধু সিনেমার পর্দায় আটকে থাকেনি; তরুণরাও সেই লুক অনুকরণ করতেন। আজও তাঁর হেয়ারস্টাইলকে ‘সালমান শাহ স্টাইল’ হিসেবেই মনে করা হয়।
বর্তমান পুরুষ ফ্যাশনে ভলিউম, টেক্সচার, পেছনে আঁচড়ানো ও যত্ন করে সাজানো চুল আবার জনপ্রিয়।
বিটিএসকে বিভিন্ন সময়ে রেট্রো ও ভলিউমিনাস হেয়ারস্টাইলে দেখা গেছে। ফলে সালমান শাহর পুরোনো চুলের স্টাইলের সঙ্গে আজকের কোরিয়ান পপ ফ্যাশনের কিছু লুকের মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়।
সালমান শাহর ফ্যাশনে সানগ্লাস ছিল শুধু চোখ রক্ষার উপকরণ নয়, বরং পুরো লুকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গোল ফ্রেম, এভিয়েটর, ক্লাবমাস্টার কিংবা ওয়েফেয়ারার-বিভিন্ন ধরনের ফ্রেমে তাকে দেখা গেছে।
শাহরুখ খানের ক্ষেত্রেও সানগ্লাস বহু বছর ধরে স্টাইল স্টেটমেন্টের অংশ। সিনেমার চরিত্র হোক কিংবা ব্যক্তিগত উপস্থিতি-বিভিন্ন সময় নানা ধরনের সানগ্লাসে দেখা গেছে তাকে। একইভাবে বর্তমান প্রজন্মের তারকারাও রেট্রো ফ্রেমকে নতুনভাবে ফিরিয়ে এনেছেন।
তাই আজকের ফ্যাশনে যখন গোল ফ্রেম বা পুরোনো ধাঁচের সানগ্লাস আবার জনপ্রিয়, তখন সালমান শাহর ছবিগুলো দেখলে মনে হয়, কয়েক দশক আগেই তিনি এই ট্রেন্ডের ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিলেন।
ফেড জিনস, স্ট্রেচ জিনস, টি-শার্ট, শার্ট-ডেনিম ছিল সালমান শাহর ক্যাজুয়াল স্টাইলের অন্যতম ভিত্তি। কখনো হাঁটুর কাছে রুমাল, কখনো ব্যান্ডানা, কখনো বড় বেল্ট- সাধারণ জিনসকেও তিনি নিজের মতো করে স্টাইল করতেন।
শাহরুখ খানের নব্বইয়ের দশকের বেশ কিছু ক্যাজুয়াল লুকেও জিনস, টি-শার্ট ও শার্টের সহজ কম্বিনেশন দেখা গেছে। তবে সালমান শাহর স্টাইলিংয়ে ডেনিমের সঙ্গে
অ্যাকসেসরিজ ব্যবহারের যে স্বতন্ত্রতা ছিল, সেটিই তাকে আলাদা করে চিনিয়েছে।আজকের রেট্রো ও ওয়াই-টু-কে ফ্যাশনে ডেনিম আবার সামনে এসেছে। ফলে সালমান শাহর পুরোনো ডেনিম লুক এখনকার ফ্যাশনবোর্ডে রাখলেও খুব একটা বেমানান লাগবে না।
পুরুষের কানে দুল, হাতে ব্রেসলেট, আঙুলে আংটি কিংবা গলায় চেইন-নব্বইয়ের দশকে এসব ছিল বেশ সাহসী ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। সালমান শাহ সেগুলোকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিজের লুকের অংশ করেছিলেন।
শাহরুখ খানও বিভিন্ন সময় চেইন, ব্রেসলেট ও অন্যান্য অ্যাকসেসরিজ দিয়ে নিজের লুককে আলাদা মাত্রা দিয়েছেন। আর বর্তমান পুরুষ ফ্যাশনে কানের দুল, আংটি, ব্রেসলেট ও চেইন এখন আর অস্বাভাবিক কিছু নয়।
কোরিয়ান পপ তারকাদের লুকেও এসব অ্যাকসেসরিজ নিয়মিত দেখা যায়। অর্থাৎ তিন দশকের ব্যবধানেও পুরুষের গয়না ব্যবহারের সেই সাহসী প্রবণতাটি হারিয়ে যায়নি; বরং আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
সালমান শাহর সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিল বাংলাদেশের তরুণদের ওপর। তবে তার স্টাইল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলিউডের পুরুষ তারকাদের রেট্রো ও ক্যাজুয়াল লুকের সঙ্গেও তুলনা আসে।
শাহরুখ খানের নব্বইয়ের দশকের অনেক লুকেও ছিল জিনস, টি-শার্ট, শার্ট, সানগ্লাস ও অ্যাকসেসরিজের ব্যবহার। আবার পরবর্তী সময়ে আদিত্য রায় কাপুরের ‘আশিকি টু’ ছবির রোমান্টিক ক্যাজুয়াল লুকের সঙ্গেও সালমান শাহর কিছু পুরোনো স্টাইলের দৃশ্যগত মিল নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে এসব মিলকে সরাসরি সালমান শাহর প্রভাব বা অনুসরণ বলা ঠিক হবে না। কারণ নির্ভরযোগ্য নির্মাতা বা স্টাইলিস্টের বক্তব্য ছাড়া এমন দাবি করা যথাযথ নয়। বরং বলা যায়, ভিন্ন সময়ে ভিন্ন তারকা একই ধরনের রেট্রো ও ক্যাজুয়াল ফ্যাশন উপাদানকে নিজেদের মতো করে জনপ্রিয় করেছেন।
তাহলে সালমান শাহ এতটা আধুনিক ছিলেন কীভাবে? সম্ভবত উত্তরটা তার পোশাকের চেয়েও বড়-ছিল নিজের স্টাইল নিয়ে আত্মবিশ্বাস। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সালমান শুধু পরিচালকের পছন্দের পোশাক পরে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতেন না; নিজের পোশাক নিজেই বেছে নিতেন, দোকানে গিয়ে কাপড় কিনতেন, এমনকি টেইলারের সঙ্গে বসে ডিজাইন নিয়েও কাজ করতেন।
এই কারণেই তার ফ্যাশনকে শুধু ‘নব্বইয়ের দশকের ফ্যাশন’ বললে কম বলা হয়। ব্যান্ডানা, ব্যাকব্রাশ চুল, ডেনিম, সানগ্লাস, কানের দুল কিংবা ব্রেসলেট-এসব তিনি পরেছিলেন নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিলিয়ে।
তাই আজ বিটিএসের ভির মাথায় ব্যান্ডানা, শাহরুখ খানের কোনো পুরোনো লুকে রেট্রো সানগ্লাস কিংবা নতুন প্রজন্মের ছেলেদের হাতে ব্রেসলেট দেখলে সালমান শাহর কথা মনে পড়তেই পারে। কারণ তিনি আজকের ট্রেন্ড দেখে পোশাক পরেননি; বরং তিন দশক আগে এমন কিছু স্টাইল করে গেছেন, যেগুলো আজও ট্রেন্ড হওয়ার ক্ষমতা রাখে।
এসএকেওয়াই