পচেফস্ট্রমে দ্বিতীয় চারদিনের ম্যাচ খেলতে নেমেই ট্রিপল সেঞ্চুরির ইতিহাস গড়া। বাংলাদেশের কোনো ব্যাটার যে কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি, এবার দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সে অধরা কৃতিত্ব দেখালেন তাওহীদ হৃদয়। সে সাফল্যের পিছনের গল্পটা কী? ভক্ত-সাপোর্টার সবাই তা জানতে মুখিয়ে আছেন।
তাৎক্ষণিকভাবে হৃদয় পচেফস্ট্রমে কিছু কথা বললেও ট্রিপল সেঞ্চুরির পিছনের কাহিনী এখনো অজানা সবার। আজ রোববার জাগো নিউজের সাথে একান্ত আলাপে সে গল্পই শুনিয়েছেন তাওহীদ হৃদয়।
বাংলাদেশ দলের এই ব্যাটার বলেন, ‘শুরুতেই অকপট স্বীকারোক্তি, ট্রিপল সেঞ্চুরিতো বহুদূরে, আসলে সেঞ্চুরি করব কি করব না, কী হবে, না হবে? এসব আমি ভাবিনি। ওসব নিয়ে কোনো চিন্তাও করিনি। আর খেলা শুরুর পর আমরাও যে খুব ভালো অবস্থায় ছিলাম তাও না। খানিক ব্যাকফুটেই ছিলাম। ওই পরিস্থিতিতে ট্রিপল সেঞ্চুরি অলীক কল্পনা, শতরানের চিন্তাও আসেনি মাথায়।’
‘তারপরও আমি আমার ইনিংসটা একটু অ্যাটাকিং মুডেই স্টার্ট করেছিলাম। একটু চালিয়ে খেলেই পৌঁছে যাই পঞ্চাশের ঘরে। আমার মনে আছে, আমার হাফ সেঞ্চুরি হয়েছিল সম্ভবত ৪০ বলে।’
‘আমি দেখছিলাম যে প্রোটিয়া বোলাররা ডমিনেট করছিল। ওরা যখন ডমিনেট করছিল তখন, আমি অ্যাটাক করেছি। ফিফটি হওয়ার পর মনে হলো খেলাটা মোটামুটি ধরে ফেলেছি। তখন আমি আবার ছন্দ বদলে ফেলি। চালিয়ে খেলা বাদ দিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করি। তখন চেষ্টা করেছি সিলি মিস্টেক না করতে এবং বাড়তি ও অহেতুক ঝুঁকি নিয়ে কোনো উচ্চাভিলাষী শট না খেলতে। এভাবে রিস্কলেস ব্যাটিং করেই প্রথম দিন ৭৫ রানে অপরাজিত থাকলাম।’
‘পরের দিন সকালের সেশনটা বেশ টাফ কাটল। দক্ষিণ আফ্রিকান এ দলের বোলাররা বেশ কন্ট্রোলড বোলিং করতে শুরু করলেন। সে সকালে তারা অনেকটা সময় ধরে ক্রমাগত ভালো জায়গায় বল ফেলে গেলেন। আমার জন্য সেঞ্চুরি করাটা তাই সহজ ছিল না। বলতে পারেন, ব্যাপারটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে গেল।’
‘তারপরও আমি একাগ্রতা নিয়ে ব্যাট করে শতকে পৌঁছে যাই। শতরান পূরণের পর প্রাথমিকভাবে ডাবল সেঞ্চুরি বা ট্রিপল সেঞ্চুরির চিন্তা মাথায় আসেনি। শুধু ভেবেছি সারা দিন কিভাবে টিকে থাকা যায়। পুরো দিন কেমন করে ব্যাট করা যায়?’
‘নিজেই ভেবে ঠিক করলাম, আমাকে সারাদিন উইকেটে টিকে থাকতে হলে বাজে ও উচ্চাভিলাষী শট খেলা চলবে না। অযথা ঝুঁকি নিয়ে না খেলে সতর্ক, সাবধানে খেলব। তারপর ওভাবে মানে রিস্কমুক্ত খেলেই আলহামদুলিল্লাহ ডাবল সেঞ্চুরি হয়ে গেল।’
ডাবল সেঞ্চুরির পর কি ট্রিপল সেঞ্চুরির চিন্তা মাথায় এসেছিল? হৃদয়ের কথা, ‘সেটা আরও বেশ খানিকটা সময় পর। আগের দিন পড়ন্ত বিকেলে দুইশ করার পর আবার পরদিন সকালে ফ্রেশ হয়ে ফ্রেশ চিন্তা নিয়ে মাঠে নামলাম। তিনশোর চিন্তা আসলে কখনোই মাথায় আসেনি। আসার সুযোগও ছিল না।’
‘এর মধ্যে কিছু উইকেটও পড়ে গেল আমাদের। এক সময় ৮টা উইকেটও পড়ে গেল। ওই অবস্থায় ট্রিপল সেঞ্চুরির চিন্তা আসলে মাথায় আসার কথাও না।’
‘তবে পেস বোলার রেজাউর রহমান রাজার সাপোর্ট আমাকে আরও সামনে এগোতে দারুণ সহায়তা করল। রাজা আমাকে ট্রেমেন্ডাস সাপোর্ট দিয়েছে। সে অত নিচে ১০ নম্বরে নেমেও ১০০ বল (আসলে ১১০ বল) খেলে ফেলেছে। আমি মনে করি, রাজার ওই ১০০ বল খেলে ফেলাটাই আমার ট্রিপল সেঞ্চুরি পূর্ণ করায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমি বলব, আমার ট্রিপল সেঞ্চুরির টার্নিং পয়েন্টই ছিল রাজার আস্থার সাথে দীর্ঘক্ষণ ব্যাট করা ও ১০০ বল খেলা।’
পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করতে হৃদয় ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন মাত্র ১টি। আর ৩০০-তে ছয়ের মার ছিল ৬টি। শেষ পর্যন্ত তার ব্যাট থেকে এসেছে ১০টি ছয়ের মার। শেষ দিকে গিয়ে হঠাৎ একটু বেশি মারমুখি হয়ে ছক্কা হাঁকাতে যাওয়া কেন? এর কারণ ব্যাখ্যা করে হৃদয় জানান, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই আছে।’
২০০’র পর থেকে আমার বাউন্ডারির চেয়ে ছক্কার মার বেশি হয়েছে। কারণ একটাই। আমার ডাবল সেঞ্চুরির পরপরই প্রোটিয়ারা ফিল্ডারদের অনেক বেশি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়। ৯ জন ফিল্ডার ছিল সীমানার আশপাশে। তখন চার হাঁকানো কঠিন হয়ে পড়ে। আমি বাধ্য হয়েই তখন ওই সীমানার আশপাশে ও ঠিক দড়ির ওপরে থাকা ফিল্ডারদের মাথার ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে রান করার চেষ্টা করি।
ট্রিপল সেঞ্চুরির চিন্তা মাথায় আসল ঠিক কখন? হৃদয়ের জবাব, দু’শো থেকে ২৫০ পর্যন্ত চালিয়ে খেলে ঠিক আড়াইশো পেরিয়ে ২৭০-এর ঘরে পা রেখে সতর্ক হয়ে যাই। খুব সাবধানে ওই অংশটা পার করি। তখনই ট্রিপল সেঞ্চুরির চিন্তা মাথায় আসে।
আমি তিনশোর কথা ভেবেই খেলতে মনোযোগী হই। কারণ তখন কিপার আর বোলার ছাড়া বাকি ৯ জন ফিল্ডারই ছিল সীমানার আশপাশে ও সীমানার ওপর। তখন তুলে মেরে ছক্কা হাঁকাতে যাওয়াটা বিপদের কারণ হতে পারে।
ওই চিন্তায় আর ওভার বাউন্ডারি হাঁকানোর ঝুঁকি নিইনি। প্ল্যান করে খেলি। বাউন্ডারি আর ফিল্ডারের পজিশন দেখে সিঙ্গেলস, ডাবলস আর তিন নিয়ে খেলার চেষ্টা করি। এভাবেই ৩০০-তে পৌঁছে যাই।
আইএইচএস/