১০ বছরে দুই শতাধিক প্রাণহানি
নৌকায় নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা
লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই চলছে নৌযান
দুর্ঘটনার পর তৎপরতা, নেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা
পদ্মার পাড়ে ঘুরতে গিয়ে কেউ আর ফেরেন না। নৌকায় চড়ে নদী পাড়ি দিতে গিয়ে হারিয়ে যান কেউ। আবার গোসল করতে নেমে স্রোতের টানে তলিয়ে যান অনেকে। একেকটি দুর্ঘটনার পর নদীর বুকে শুরু হয় মরদেহ উদ্ধারের তৎপরতা। কিন্তু থামে না মৃত্যু। বরং একই ঘাটে, একই নদীতে বারবার ঘটছে প্রাণহানি।
রাজশাহীর পদ্মায় গত পাঁচ বছরে নৌদুর্ঘটনা, নৌকাডুবি ও পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় প্রাণ গেছে অন্তত ৫৭ জনের। ফায়ার সার্ভিসের হিসাব অনুযায়ী, রাজশাহীসহ চার জেলায় পাঁচ বছরে ৬১টি নৌদুর্ঘটনায় মারা গেছেন প্রায় ৭০ জন। স্থানীয়দের হিসাবে, গত এক দশকে শুধু রাজশাহীর পদ্মাতেই প্রাণহানির সংখ্যা দুই শতাধিক।
পাঁচ বছরে ৬১ নৌদুর্ঘটনা
গত ২৮ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের চর-চাকলা গ্রামে পদ্মায় ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়। নিহতরা হলো- চর চাকলা গ্রামের নিজাউদ্দিনের দুই মেয়ে সুমাইয়া (১১) ও সুরাইয়া (৯), একই এলাকার মাসুদ আলীর দুই মেয়ে সুমাইয়া (১১) ও আরিবা (৮) এবং শরিফুল ইসলামের মেয়ে শরীফা (১১)।
এ ঘটনার পর স্বজনদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতা চালানো হলেও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ও স্থায়ী উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও নাটোরে পদ্মায় ৬১টি নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মারা গেছেন অন্তত ৭০ থেকে ৭১ জন। এর মধ্যে রাজশাহীতে ৪০টি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৩টি, পাবনায় পাঁচটি এবং নাটোরে তিনটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে।
আরও পড়ুন
পদ্মার পাড় ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক বলয়, বিনোদনের সঙ্গে চলছে জীবিকার লড়াই
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মতে, এসব দুর্ঘটনার বড় কারণ ছোট নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী বহন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম না থাকা, যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার না করা এবং বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে নদীতে চলাচল।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষায় পদ্মার পানি বাড়ার সঙ্গে স্রোত ও ঘূর্ণাবর্তের তীব্রতাও বেড়ে যায়। এ সময় ছোট নৌকা নিয়ে নদীতে চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সরকারি হিসাবের বাইরেও মৃত্যু
স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে শুধু রাজশাহীর পদ্মায় খেয়া পারাপার, নৌকাডুবি কিংবা গোসল করতে গিয়ে অন্তত ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গোসল করতে নেমে মারা গেছেন ১৪ জন। নৌকাভ্রমণ বা খেয়া পারাপারের সময় নৌকা ডুবে মারা গেছেন নয়জন। বিভিন্ন সময় পদ্মা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় অর্ধগলিত সাতটি মরদেহও উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রকৃত প্রাণহানি আরও বেশি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, নদীতে নিখোঁজ হওয়ার পর অনেকের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। ফলে এসব মৃত্যুর তথ্য সরকারি হিসাবের বাইরে থেকে যেতে পারে।
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে রাজশাহীর পদ্মায় প্রাণহানির সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও নদীটির ঝুঁকিপূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে। গত ৩০ জুলাই নৌকাডুবির দুই দিন পর বাবা ও ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রাজশাহী অঞ্চলের নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন জানান, কুষ্টিয়া থেকে বাবার এবং রাজশাহীর পবা উপজেলার পদ্মা নদী থেকে ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন কাটাখালী থানার শ্যামপুর শান্তিনগর এলাকার বাসিন্দা ও নৌকার মাঝি কাওসার আলী (৬০) এবং তার তিন বছর বয়সী ছেলে জিয়ারুল হক।
আরও পড়ুন
রাজশাহীর মিডলচরে বাড়ছে ভ্রমণপিপাসুদের ভিড়, ঝুঁকি নিয়ে নদী পারাপার
নদীর স্রোত ও ঘূর্ণাবর্তে নিখোঁজ হওয়ার পর দুই দিন ধরে তাদের সন্ধান চলে। পরে মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে পরিবারের অপেক্ষার অবসান হলেও স্বজনদের জীবনে নেমে আসে গভীর শোক।
এর আগে, গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর একই এলাকায় ডিঙি নৌকা ডুবে তিনজন নিখোঁজ হন। দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজি করেও তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
স্বজনদের ভাষ্য, তিন দিক থেকে পানির স্রোত এসে ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হলে ডিঙি নৌকাটি মুহূর্তের মধ্যে ডুবে যায়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা তাদের উদ্ধারে চেষ্টা চালালেও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশায় এখনও পদ্মার পাড়ে অপেক্ষা করছেন পরিবারের সদস্যরা।
অতিরিক্ত যাত্রী, নেই লাইফ জ্যাকেট
রাজশাহীর পদ্মা এখন শুধু নদী নয়, নগরবাসীর অন্যতম প্রধান বিনোদনকেন্দ্রও। জেলার প্রায় ১০০ কিলোমিটার পদ্মাপাড়জুড়ে রয়েছে মানুষের অবসর কাটানোর বিভিন্ন স্থান। নগরীতে উল্লেখযোগ্য পর্যটনকেন্দ্রের সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় পদ্মাপাড়ে প্রতিদিনই ভিড় করেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
স্থানীয়দের দাবি, পদ্মার বুকে প্রায় ৫০০টি ভ্রমণ নৌকা চলাচল করে। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে অনেকে এসব নৌকায় ঘুরতে যান। কেউ কেউ নদীর পানিতেও নামেন। কিন্তু পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় আনন্দের এই আয়োজন কখনো কখনো পরিণত হচ্ছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায়।
গত দুই বছরে রাজশাহী নগরীর শ্রীরামপুর এলাকায় পদ্মায় গোসল করতে নেমে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। ডুবুরিরাও এলাকাটিকে পদ্মার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর আগে ২০২০ সালে একই শ্রীরামপুর এলাকায় নৌকা ডুবে নববধূসহ নয়জনের মৃত্যু হয়।
আরও পড়ুন
নতুন পানিতে প্রাণ ফিরেছে পদ্মায়, নদীপাড়ে ভিড় দর্শনার্থীদের
পদ্মার পাড়ে ঘুরতে আসা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজশাহীর পদ্মাপাড়কে নগরবাসীর বিনোদনের নিরাপদ স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান চালালেই হবে না, দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি ভ্রমণ নৌকায় নির্ধারিত সংখ্যার বেশি যাত্রী বহন বন্ধ করা, বাধ্যতামূলকভাবে লাইফ জ্যাকেট সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা, ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌকা চলাচল নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষিত মাঝি নিয়োগ, নিয়মিত নৌ-পুলিশের নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপন এবং গোসলের নির্ধারিত স্থান ছাড়া নদীতে নামা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দা সুমনের অভিযোগ, বড় নৌকার তুলনায় ছোট ছোট নৌকাই বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, অনেক নৌকায় লাইফ জ্যাকেট থাকে না। আবার কোনো কোনো নৌযানে তা থাকলেও যাত্রীরা পরতে চান না। ফলে নৌকা ডুবে গেলে যাত্রীদের নিরাপদে থাকার সুযোগ থাকে না।
তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে পদ্মায় পানির পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি ঘূর্ণাবর্তও বৃদ্ধি পায়। এ সময় ছোট নৌকা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বড় ও নিরাপদ নৌযানের ব্যবস্থা করা হলে দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
পরিবার ও আত্মীয়স্বজন নিয়ে পদ্মার টি-বাঁধে ঘুরতে আসা ওবায়দুল্লা রকি বলেন, নদীতে চলাচলকারী অনেক নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হচ্ছে। এতে ছোট নৌকাগুলো নদীতে চলাচল করায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পাশাপাশি নৌযানগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামও নেই। সরকারের পক্ষ থেকে নৌকায় কতজন যাত্রী বহন করা যাবে তা নির্ধারণ করে দেওয়া এবং লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
আরও পড়ুন
নতুন পানিতে প্রাণ ফিরেছে পদ্মায়, নদীপাড়ে ভিড় দর্শনার্থীদের
বন্ধুদের নিয়ে পদ্মায় ঘুরতে আসা আব্দুর রহিমের মতে, রাজশাহী শহরের সৌন্দর্য ও আবহাওয়ার সঙ্গে পদ্মা নদীর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক নৌকাডুবির ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তার মতে, দুর্ঘটনার জন্য যাত্রী ও নৌকার মাঝি—দুই পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে। যাত্রীদের নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে অচল নৌকা, ঝুঁকিপূর্ণ ছোট নৌকা কিংবা অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী নৌযানের বিরুদ্ধে নৌ-পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি থাকলে মাঝিরাও সতর্ক হবেন এবং দুর্ঘটনা কমে আসবে।
জেলেদেরও প্রতিদিনের ঝুঁকি
পদ্মায় নিয়মিত মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন শফিকুল ইসলাম। তার কাছে নদী যেমন জীবিকার উৎস, তেমনি প্রতিদিনই তা ঝুঁকির কারণ।
তিনি বলেন, নদীর মাঝখানে গিয়ে মাছ ধরার সময় হঠাৎ ঝড়, ঢেউ কিংবা প্রবল বাতাস শুরু হলে ছোট নৌকা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। এতে নৌকা ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। জেলেদের নিরাপত্তার জন্য সরকারি উদ্যোগে লাইফ জ্যাকেটসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা হলে তারা আরও নিরাপদে মাছ ধরতে পারবেন।
নৌকাডুবিতে স্বামী ও একমাত্র সন্তানকে হারানো জাহেরা বেগম বলেন, ‘নৌকাডুবিতে আমার স্বামী ও একমাত্র ছেলেকে হারিয়েছি। মুহূর্তেই আমার সংসার শূন্য হয়ে গেছে। এই দুঃসময়ে উপজেলা প্রশাসন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমার পিতৃহারা নাতি-নাতনিদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আল্লাহ তাদের উত্তম প্রতিদান দিন।’
বাবা ও দাদাকে হারানো ছোট্ট তামিমের কণ্ঠেও ফুটে ওঠে সেই শূন্যতা। সে বলে, ‘পদ্মা নদীর পানিতে আমার দাদা আর বাবা হারিয়ে গেছে। দাদা-বাবা বাড়ি এলে আমাদের জন্য মজা নিয়ে আসত। এখন আর কেউ মজা নিয়ে আসবে না।’
উদ্ধার তৎপরতা আছে, প্রতিরোধ কতটা?
পদ্মায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলেই স্থানীয় প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি, নেওয়া হয় বিভিন্ন সুপারিশ। কিন্তু দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেলে এসব উদ্যোগের অনেকটাই আর দৃশ্যমান থাকে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, নৌযানের ধারণক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ, লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার এবং নিয়মিত নজরদারির মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে কার্যকর না থাকায় একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রাজশাহীসহ চার জেলায় গত পাঁচ বছরে ৬১টি নৌদুর্ঘটনার কল পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৭০ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে রাজশাহী জেলাতেই প্রাণহানির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
আরও পড়ুন
ফারাক্কার পর বদলে গেছে পদ্মা, বিলুপ্তির পথে ইলিশসহ দেশীয় মাছ
তিনি বলেন, এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ অসাবধানতা ও অসচেতনতা। লাইফ জ্যাকেট থাকলেও অনেকে তা ব্যবহার করেন না। পদ্মা বিশাল নদী হওয়ায় মাছ ধরা বা চলাচলের কাজে ব্যবহৃত ছোট নৌকায় অনেক সময় ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী ওঠানো হয়। গোসল করতে নেমেও মানুষ মারা যাচ্ছে। ফলে নদীতে চলাচলকারী প্রত্যেককে নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে আরও সতর্ক হতে হবে।
রাজশাহীর নদী বিশেষজ্ঞ মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, পদ্মায় প্রাণহানির অন্যতম কারণ পানির ঘূর্ণাবর্ত, তীব্র স্রোত, সাঁতার না জানা এবং অভিভাবকদের অসচেতনতা। শিশুদের নদীতে নামানোর ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও সতর্ক হতে হবে। একই সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের সাঁতার শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
তার মতে, প্রশাসনের উচিত পদ্মার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে চিহ্নিত করে সেখানে দৃশ্যমান সাইনবোর্ড স্থাপন করা। নৌপথে চলাচলের সময় জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে চলাচলকারী নৌকার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারিও জোরদার করা প্রয়োজন।
রাজশাহী অঞ্চলের নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, পদ্মার যেসব স্থান ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে মাঝি ও নৌ-ভ্রমণকারীদের সচেতন করতে কাজ করছে নৌ-পুলিশ। নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ নৌযান চলাচল ও ছোট নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী বহন বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, সাঁতার না জানা শিশুরা নদীতে নামলেও অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি খেয়াল করেন না। পরিবারের অসচেতনতার কারণেও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
সম্প্রতি নৌকাডুবিতে বাবা-ছেলের মৃত্যুর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নৌকার ধারণক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণেই ওই দুর্ঘটনা ঘটে। পরে ওই নৌকাসহ অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী নৌকার বিরুদ্ধে জরিমানা করা হয়েছে। যেসব নৌকায় লাইফ জ্যাকেট নেই, সেসব নৌকার বিরুদ্ধেও জরিমানার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নদীতে চলাচলের সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে এক-দুই দিনের অভিযান দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। ধারাবাহিক অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত রাখলে নদীপথে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব
রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, নৌদুর্ঘটনা রোধে মাঝি ও বিনোদনপ্রেমীদের সচেতন করতে পদ্মাপাড়জুড়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং নৌযানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এমওএইচএম/কেএইচকে/এএসএম