
আজ রোববার সকাল থেকে নগরে থেমে থেমে বৃষ্টি। দুপুরে যেন আকাশ ভেঙেই নামল বৃষ্টির ধারা। আজ নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী। এমন বৃষ্টিমুখর দিনে প্রিয় নায়কের স্মৃতির সঙ্গে মিলেমিশে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘বৃষ্টিরে বৃষ্টি আয় না জোরে’ গানটি। সকাল থেকেই ইউটিউবে অনেকে গানটি শুনছেন। কেউ আবার সালমান শাহ ও শাবনূর অভিনীত জনপ্রিয় গানটির ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করে ফিরে যাচ্ছেন তিন দশক আগের স্মৃতিতে।
‘স্বপ্নের পৃথিবী’ চলচ্চিত্রের এই গান মুক্তির তিন দশক পরও আবেদন হারায়নি। বৃষ্টি নামলে এখনো অনেক বাংলা সিনেমাপ্রেমী গুনগুন করে গেয়ে ওঠেন গানটি। সময় পেরিয়েছে; গানের গীতিকার, সুরকার ও পর্দার নায়ক চলে গেছেন। কিন্তু তাঁদের সৃষ্টি এখনো বৃষ্টির দিনে শ্রোতা-দর্শকের মনে নতুন করে প্রাণ পায়।
গানটির ভিডিও দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিল। একটি গানের দৃশ্যায়নের জন্যই পরিচালক বাদল খন্দকার ছুটেছিলেন বেশ কয়েকটি লোকেশনে। শুরুর দৃশ্যগুলো ধারণ করা হয় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (এফডিসি) তৈরি কৃত্রিম বৃষ্টিতে। গানের অন্তরায় দৃশ্যপট বদলে চলে যায় খোলা প্রকৃতিতে। কক্সবাজারসহ বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থানে হয় শুটিং।

গানের সঙ্গে মানানসই কোরিওগ্রাফিও ছিল নজরকাড়া। সালমান শাহ ও শাবনূর দৃষ্টিনন্দন নাচের ভঙ্গিতে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন গানের আবেগ। তাঁদের রসায়নের পাশাপাশি স্টাইলিশ পোশাকও গানটিতে যোগ করেছিল ভিন্ন মাত্রা। একটি গানকে পর্দায় যথাযথভাবে তুলে ধরতে টানা ১২ থেকে ১৩ দিন শুটিং করতে হয়েছিল।
গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন সাবিনা ইয়াসমীন ও তাঁর ভাগনে আগুন খান। গানের কথা লিখেছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুর করেছিলেন আলাউদ্দিন আলী। তাঁরা দুজনই প্রয়াত। তবে রয়ে গেছে তাঁদের সৃষ্টি।
গানটির সুরকার আলাউদ্দিন আলী ২০১৮ সালে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদককে শুনিয়েছিলেন এর সৃষ্টির গল্প। ‘স্বপ্নের পৃথিবী’ চলচ্চিত্রের শুটিং তখন পুরোদমে চলছে। ছবির দুই অভিনয়শিল্পী সালমান শাহ ও শাবনূর শুটিং নিয়ে ব্যস্ত। এর মধ্যেই পরিচালক বাদল খন্দকার তাঁদের জানান, সেদিন মগবাজারের শ্রুতি স্টুডিওতে ছবির একটি গানের রেকর্ডিং হবে। সঙ্গে এটুকুও জানিয়ে রাখলেন, গানটি রোমান্টিক।
আর যায় কোথায়! বাদল খন্দকারের সঙ্গে রেকর্ডিং স্টুডিওতে হাজির হলেন সালমান শাহ ও শাবনূর। সারা রাত ধরে চলল সেই রোমান্টিক গানের রেকর্ডিং। গানটির শিরোনাম—‘বৃষ্টিরে বৃষ্টি আয় না জোরে’।

রেকর্ডিং শেষ হতে হতে ভোর। এরপর অভিনয়শিল্পী, সংগীতশিল্পীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই বাড়ির পথ ধরেন। ২০১৮ সালে সেই রাতের স্মৃতি মনে করে পরিচালক বাদল খন্দকার প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘আমার সব ছবিতেই একটা বৃষ্টির গান রাখার চেষ্টা করি। এটাও তেমনই গান ছিল। গাজী ভাইকে বলার পর তিনি লিখে দিলেন। সুর করলেন আলাউদ্দিন ভাই। গাইতে এসে সাবিনা আপা ও আগুন মনপ্রাণ উজাড় করে গাইলেন। আর টানা ১২ থেকে ১৩ দিন সেই গানের শুটিং হলো এফডিসি, কক্সবাজারসহ বেশ কিছু জায়গায়।’

সুর করার সময় গানটি এতটা জনপ্রিয় হবে, তা ভাবেননি আলাউদ্দিন আলী। তাঁর ভাবনাজুড়ে ছিল কাজটি ঠিকঠাকভাবে শেষ করার পরিকল্পনা। পরে যখন গানটি মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল, তখন তাঁর মনে হয়েছিল, রাতভর পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। এ কথা বললে বাড়াবাড়ি হবে না, সেই সার্থকতার প্রমাণ মিলছে তিন দশক পরও। সালমান শাহ নেই, চলে গেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার এবং আলাউদ্দিন আলীও। কিন্তু বৃষ্টি নামলেই তাঁদের সৃষ্টি আবার ফিরে আসে মানুষের কণ্ঠে ও স্মৃতিতে। আজ সালমান শাহর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে নগরের বৃষ্টিভেজা আবহে তাই ইউটিউব ও ফেসবুকে আবারও বাজছে—‘বৃষ্টিরে বৃষ্টি আয় না জোরে’।