‘ঘটনার দিন সকাল থেইক্যাই আমার কেমন জানি অস্থির অস্থির লাগতেছিল। তাই পোলার নম্বরে ফোন দিছিলাম। প্রথমে কইলো, অ্যাক্সিডেন্ট করছে। প্রায় এক ঘণ্টা পর আবার জানাইলো- আমার পোলা আর নাই।’
কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মোরুড়া গ্রামের আবদুল হাই। সাত বছর পর সৌদি আরব থেকে একমাত্র ছেলে আলিফ আহমেদ চন্দন (২৪) দেশে আসবেন- এমন আনন্দের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। ছেলেকে বিমানবন্দরে গিয়ে বরণ করার কথা ছিল তার। অথচ সেই বিমানবন্দরেই এখন ছেলের মরদেহ গ্রহণের অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাকে।
গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে বাবার সঙ্গে ফোনে শেষ কথা হয় আলিফের। বলেছিলেন, ‘আব্বা, বৃহস্পতিবার দুপুরে বিমানে উঠমু। শুক্রবার সকাল ৭টায় ঢাকায় নামমু। তুমি এয়ারপোর্টে আইসো।’
কিন্তু দেশে ফেরার সেই যাত্রা আর শেষ করতে পারেননি আলিফ।
আরও পড়ুন
ফেনীতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাস উল্টে কাস্টমস কর্মকর্তা নিহত
পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় সাত বছর ধরে সৌদি আরবে ছিলেন আলিফ। দেশটির আবহা শহরে ‘মিনিস্টারি ভলোদিয়া কোম্পানি’তে ক্লিনার হিসেবে কাজ করতেন তিনি। এবার প্রবাসজীবনের ইতি টেনে স্থায়ীভাবে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে থাকবেন, নিজের মাটিতে নতুন করে জীবন শুরু করবেন- এমনই স্বপ্নই ছিল তার।
গত বৃহস্পতিবার আবহা শহর থেকে বিমানবন্দরের দিকে যাওয়ার পথে আলিফকে বহনকারী প্রাইভেটকার ও একটি মালবাহী লরির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে আলিফসহ কয়েকজন নিহত হন। খবরটি পাওয়ার পর থেকেই শোকে স্তব্ধ মোরুড়া গ্রাম। দুই বোনের একমাত্র ভাই আলিফের এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা।
আবদুল হাই বলেন, ‘আমার তো একটাই পোলা। সাত বছর পর এবার বাড়িত আইতেছিল। কইছিল, শুক্রবার সকালে ঢাকায় নামমু, তুমি এয়ারপোর্টে আইসো। আমি মাইক্রোবাস নিয়ে পোলারে বরণ করতে যামু- এই আনন্দেই আছিলাম। এখন পোলার লাশের লাইগ্যা বইসা আছি।’
তিনি বলেন, ‘সকাল থেইক্যাই মনডা কেমন জানি করতেছিল। পোলারে ফোন দেওনের পর শুনলাম অ্যাক্সিডেন্ট করছে। পরে আবার ফোন আইয়া কইলো, আমার পোলা মারা গেছে। এই কথা আমি কেমনে বিশ্বাস করি কন?’
আরও পড়ুন
সাভারে পুলিশ সদস্য হত্যায় মুন্সিগঞ্জ থেকে চারজন গ্রেফতার
ছেলের শেষবারের মতো মুখ দেখতে চান এই বাবা। তার আকুতি, ‘আমার পোলাডারে শেষবারের মতো দেখতে চাই। নিজের জমির মইধ্যে পোলারে কবর দিতে চাই। সরকার যেন তাড়াতাড়ি আমার পোলার লাশডা দেশে আনার ব্যবস্থা করে।’
আলিফের ভগ্নিপতি ইব্রাহিম মিয়া বলেন, শুক্রবার সকালে আলিফের দেশে ফেরার কথা ছিল। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর তার মোবাইলে ফোন দিলে অন্য একজন ফোন ধরেন। পরে দুর্ঘটনার খবর জানায়। মরদেহ দেশে আনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।
চাচাতো ভাই কাদির মিয়া বলেন, ‘আলিফ বাড়িত আইব, সবাই মিইলা তারে বরণ করবাম- এমনই চিন্তাই আছিল আমরার। কে জানতো, যেই দিন বাড়ি ফেরার কথা, সেই দিনই তার জীবনের শেষ দিন হইয়া যাইবো।’
পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। মরদেহ দেশে আনার ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারের পাশে থেকে সহযোগিতা করা হবে।এসকে রাসেল/কেএসআর