পৃথিবীর অধিকাংশ উপাদান নিজের স্বভাবেই স্থির। শিলা কঠিন, বাতাস গ্যাসীয়। কিন্তু পানির চরিত্র ভিন্ন। সমুদ্রে পানি তরল, মেরু অঞ্চলে বরফ। আবার বায়ুমণ্ডলে এটি জলীয় বাষ্প হয়ে থাকে। পরে মেঘে ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টি হয়ে নামে। পানি ছাড়া কোনো প্রাণীরই বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। এ কারণেই মানুষ যুগের পর যুগ নদী উপত্যকা ও পানিসমৃদ্ধ সমভূমিতে বসতি গড়েছে।
কিন্তু যে পানি জীবন দেয়, সেটিই কখনো মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে। নেপাল ও তিব্বতে সাম্প্রতিক বন্যা তারই ভয়াবহ উদাহরণ।
হিমালয়ে প্রকৃতির শক্তি অন্য রকম
পাহাড়ি এলাকায় বসবাসের অভিজ্ঞতা প্রকৃতির শক্তিকে কাছ থেকে বোঝার সুযোগ দেয়। ইতালির অ্যাপেনাইন পর্বতমালা হিমালয়ের তুলনায় অনেক ছোট। তারপরও শীতের কঠিন সময়ে সেখানকার তীব্র ঠান্ডা, তুষারঝড়, বরফে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং তুষারধস মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।
আরও পড়ুন
নেপালে আবারও ধসে পড়তে পারে হিমবাহ, চীনের সতর্কবার্তা
হিমালয়ে এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেশি। নেপালের লাংটাং হিমাল অঞ্চলের লাংটাং লিরুং পর্বতের আশপাশে প্রকৃতির এমন ভয়াবহ শক্তি খুবই স্পষ্ট।
সেখানে প্রায় ১০টি নিউইয়র্ক শহরের সমান আকারের একটি বিশাল বরফের খণ্ড ১ দশমিক ২ কিলোমিটার পর্যন্ত নিচে পড়ে যেতে পারে কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই। একজন সাধারণ মানুষের এই দূরত্ব হেঁটে যেতে প্রায় ১৫ মিনিট লাগে।
এমন উচ্চতা ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে হিমালয় পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশগুলোর একটি।
জলবায়ু পরিবর্তন কি একমাত্র কারণ
এ ধরনের দুর্যোগের পর জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করার প্রবণতা থাকে। জলবায়ু পরিবর্তন অবশ্যই অনেক প্রাকৃতিক ঘটনাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। তবে সব ঘটনা শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটে না।
যতদিন হিমবাহ থাকবে, ততদিন সেখান থেকে বরফের বড় খণ্ড ভেঙে পড়ার বা বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কাও থাকবে।
আরও পড়ুন
হিমালয় দিচ্ছে বিপদের সংকেত, নেপালের পরেই কি ভারত?
সমুদ্রে হিমবাহের বরফ ভেঙে পড়লে সেটি হিমশৈল তৈরি করতে পারে। কিন্তু স্থলভাগে এমন ঘটনা ভূপ্রকৃতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
বরফ বা পাথরের বিশাল স্তূপ উপত্যকার পথ আটকে দিতে পারে। এর ফলে তৈরি হতে পারে বন্যা।
প্রযুক্তি কীভাবে জীবন বাঁচাতে পারে
অতীতে পাহাড়ি অঞ্চলে এ ধরনের অনেক ঘটনা হয়তো ঘটেছে। কিন্তু দুর্গম এলাকা এবং দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে সেসব ঘটনা নথিবদ্ধ হয়নি।
এখন পরিস্থিতি বদলেছে। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম পাহাড়ি এলাকাতেও নজর রাখা সম্ভব।
লাংটাং লিরুং এলাকায় কী ঘটেছে, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সেটিও শনাক্ত ও ছবিতে ধারণ করা হয়েছে। তাই ভবিষ্যতে একই ধরনের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
আরও পড়ুন
নেপালে বন্যা / সব ভেসে গেলেও সবুজ বাড়িটি টিকে যাওয়ার রহস্য কী?
এর পরের ধাপ হলো নজরদারি। ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ ও পাহাড়ি এলাকায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালানো যেতে পারে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও আগাম বার্তা দেওয়ার প্রযুক্তিও গড়ে তোলা সম্ভব।
এতে নিচের দিকে বসবাসকারী মানুষ বন্যা বা ভূমিধসের আগে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সময় পেতে পারেন।
তবে এর জন্য অর্থ ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন। সব দেশের পক্ষে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা সহজ নয়।
পূর্বপুরুষের অভিজ্ঞতা কেন গুরুত্বপূর্ণ
দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রযুক্তির পাশাপাশি আরেকটি শিক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, পূর্বপুরুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া।
বন্যার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগের প্রজন্ম অনেক সময় বসতি স্থাপন করত না। কারণ তারা জানত, কোন জমি বন্যার সময় পানিতে ডুবে যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতা উপেক্ষিত হয়।
ফ্রান্সের একটি বন্যার ঘটনাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ১৯৯২ সালে দক্ষিণ ফ্রান্সে রোন নদীর একটি শাখায় ভয়াবহ বন্যায় ৪০ জন নিহত হন। সাম্প্রতিক নেপালের বিপর্যয়ের তুলনায় সেটি অনেক ছোট ঘটনা ছিল।
আরও পড়ুন
নেপালে পাহাড়ধসে আটকে গেছে নদী, যে কোনো সময় নামতে পারে বন্যা
তবে দুটি ঘটনার মধ্যে একটি মিল ছিল। ফ্রান্সে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাটি ছিল নতুন করে গড়ে ওঠা একটি আবাসিক এলাকা। আগের প্রজন্ম বন্যার ঝুঁকি বুঝে যে জায়গাটি ফাঁকা রেখেছিল, সেখানেই পরে বসতি গড়ে ওঠে।
স্বল্পমেয়াদি লাভের কাছে হারছে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা
প্রকৃতির ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও মানুষ অনেক সময় সেখানে বসতি গড়ে তোলে। কারণ তাৎক্ষণিক লাভ দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিকে আড়াল করে দেয়। নিয়মকানুন থাকলেও অর্থনৈতিক লাভের আকর্ষণ অনেক সময় সেই নিয়মকে দুর্বল করে।
নেপালের মতো তুলনামূলক কম নিয়ন্ত্রিত দেশে এই ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে। নদীর তীর, বন্যাপ্রবণ এলাকা বা পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিত স্থাপনা দুর্যোগের ক্ষতি বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রকৃতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, সেখানে বসতি নিয়ন্ত্রণ করা, আগাম সতর্কতা চালু করা এবং মানুষের নিরাপদে সরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব।
নেপালের বন্যা তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের গল্প নয়। এটি প্রকৃতির শক্তি বোঝার গল্প। এটি প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তার গল্প।
আর সবচেয়ে বড় কথা, স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি উপেক্ষা না করার সতর্কবার্তা।
পাথর পাথরই, বাতাস বাতাসই থাকে। পানি জীবনও দেয়, মৃত্যুও ডেকে আনে। কিন্তু মানুষের লোভ— সেটি মানুষেরই তৈরি।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্টকেএএ/