পাকিস্তানি নাটক একসময় মূলত প্রেম, পারিবারিক দ্বন্দ্ব আর আবেগঘন গল্পের বিনোদন হিসেবেই দর্শকের কাছে পরিচিত ছিল। তবে গত কয়েক বছরে সেই চিত্রে পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেক নাটক শুধু বিনোদন দিচ্ছে না, বরং পরিবার, বিয়ে, সামাজিক কুসংস্কার, মানসিক আঘাত ও সম্পর্কের জটিলতা নিয়েও দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করছে।
সম্প্রতি ডন-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি নাটকের গল্পে এখন মানুষের মনস্তত্ত্ব, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলা মানসিক ক্ষত এবং সামাজিক নানা গোঁড়ামি উঠে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব নাটককে গল্পের আড়ালে এক ধরনের ‘সাইকো-এডুকেশন’ বা মানসিক সচেতনতার মাধ্যম হিসেবেও দেখা যায়।
আরও পড়ুন
মৃত্যুর আগের দিনটি কীভাবে কাটিয়েছিলেন সালমান শাহ
বিশ্লেষণটিতে ছয়টি নাটকের উদাহরণ দিয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে।
বিয়ের পরই একজন নারীর জীবন শেষ হয়ে যায় নাসমাজে এখনো বিধবা বা বিচ্ছিন্ন নারীর দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে নানা কুসংস্কার ও নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। অথচ ধর্মীয়ভাবে এতে বাধা নেই। ‘ডোবার’ নাটকে বিধবা মেহরু নিজের চেয়ে বয়সে ছোট মাহিরকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি নিজের জীবনের নতুন অধ্যায় বেছে নেন।
‘কার্জ-ই-জান’ নাটকেও বিধবা মায়ের নতুন করে ভালোবাসা ও সংসার করার অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মেয়ে নাশওয়া তার মায়ের পুরোনো ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করে। পরে নাশওয়া নিজেও এমন একটি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পান, যেখানে তাকে পারিবারিক সম্পত্তি রক্ষার জন্য বিয়েতে বাধ্য করা হয়েছিল।
‘কাফিল’-এ জেবার গল্পেও দ্বিতীয় বিয়েকে নতুন জীবনের সুযোগ হিসেবে দেখানো হয়েছে। একটি অসুখী দাম্পত্য থেকে বেরিয়ে তিনি সাবেক প্রেমিক জামালের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করেন।
ডন-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত নারীর দ্বিতীয় বিয়েকে ঘিরে যে লজ্জা বা সামাজিক চাপ রয়েছে, সেটি মূলত সাংস্কৃতিক; ধর্মীয় নয়।
পরিবার ভালোবাসার জায়গা, নিয়ন্ত্রণের নয়যৌথ পরিবার দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু পরিবারের বড়দের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, পুরোনো নিয়ম আঁকড়ে থাকা এবং নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিতে না চাওয়া অনেক সময় সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে।
আরও পড়ুন
শাকিব খানই কি বুবলীর মেয়ের বাবা, যা বললেন অঞ্জলি সাথী
‘জামা তাকসিম’ নাটকে লায়লা নিজের পছন্দের মানুষ কায়েসকে বিয়ে করতে চান। কিন্তু বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে তার পোশাক, রান্না জানা এবং চাকরি করা- সবকিছু নিয়েই তাকে বিচার করা হয়।
নাটকটি দেখিয়েছে, পরিবারের সঙ্গে থাকা মানেই নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া নয়। ভালোবাসার বিয়ে কিংবা আলাদা করে থাকার ইচ্ছাকে বিদ্রোহ হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে যৌথ পরিবারও নিরাপদ ও আনন্দের জায়গা হতে পারে।
প্রতিটি শিশুরই পরিবারের অংশ হওয়ার অধিকার আছেঅনাথ বা বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের অনেক সময় পরিবারের মধ্যেই বৈষম্যের শিকার হতে হয়। এতে তাদের আত্মসম্মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তাবোধও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
‘বাস তেরা সাথ হো’ নাটকের আনাস এবং ‘জবত’-এর আওনের গল্পে এমন বাস্তবতাই তুলে ধরা হয়েছে। পরিবারের অন্যদের মতো ভালোবাসা পাওয়ার জন্য তাদের বারবার নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়।
এই নাটকগুলো মনে করিয়ে দেয় কোনো শিশুর মাথার ওপর ছাদ থাকলেই তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শিশুকে বুঝতে দিতে হবে যে সে পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, ভালোবাসার যোগ্য এবং নিরাপদ।
সম্মানের চেয়ে মানবিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ‘সম্মান’ রক্ষার নামে অনেক পরিবারে নারীর ওপর চাপ, নীরবতা ও অন্যায় চাপিয়ে দেওয়া হয়। পাকিস্তানি কয়েকটি নাটক সেই ধারণাকেই প্রশ্ন করছে।
‘জামা তাকসিম’-এ কিশোরী সিদ্রার সঙ্গে এক আত্মীয়ের যৌন হয়রানির ঘটনা দেখানো হয়েছে। শুরুতে পরিবার বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে তার দাদা-দাদি ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ান। তাকে হয়রানিকারীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার মতো প্রচলিত ‘সমাধান’ও প্রত্যাখ্যান করা হয়।
‘জবত’-এও আয়লার গল্পে সামাজিক অপমানের বিরুদ্ধে মানবিক অবস্থান দেখা যায়। অন্যদিকে ‘বাস তেরা সাথ হো’-তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি একটি ভুয়া আপত্তিকর ভিডিওকে কেন্দ্র করে আনসা সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়। নাটকটি দেখায়, গুজবের কারণে একজন নারীকে দোষী না বানিয়ে তার পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবিকতা।
ডন-এর বিশ্লেষণের ভাষ্যে, পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য দুর্বল ব্যক্তিকে বলি দেওয়ার বদলে তার নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই প্রকৃত সম্মানের পরিচয়।
ছেলে মায়ের সম্পত্তি নয়‘জবত’ নাটকে শামি তার মায়ের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বড় হয়। মায়ের প্রতি আনুগত্য এতটাই বেশি যে বিয়ের পরও স্ত্রী ও মায়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পারে না। এ ধরনের সম্পর্ককে শুধু সাংস্কৃতিক সমস্যা হিসেবে নয়, মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার দৃষ্টিতেও দেখা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মা নিজের অপূর্ণ আবেগ বা একাকিত্বের জায়গা পূরণ করতে ছেলেকে অতিরিক্ত আঁকড়ে ধরেন। ফলে ছেলে স্বাধীনভাবে নিজের সম্পর্ক ও জীবন পরিচালনা করতে শেখে না।
সমাধান হিসেবে নাটকটি দেখায়, মাকে ছেলেকে নিজের সম্পত্তি হিসেবে না দেখে স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে ছেলেকেও ভালোবাসা বজায় রেখে প্রয়োজনের জায়গায় নিজের সীমা নির্ধারণ করতে শিখতে হবে।
প্রজন্মের পর প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে মানসিক ক্ষতশিশুরা শুধু পরিবারের কথা শোনে না, তারা পরিবারের আচরণও শেখে। তারা যদি দেখে সম্মানের নামে অন্যায় চাপা দেওয়া হচ্ছে, তাহলে তারা শিখবে সত্য বলা বিপজ্জনক। তারা যদি দেখে পুত্রবধূকে সবসময় অনুমোদনের জন্য লড়তে হচ্ছে, তাহলে তারা ভাববে ভালোবাসা শর্তসাপেক্ষ। আবার মাকে ছেলের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে দেখলে তারা সম্পর্ককে ভালোবাসার বদলে সংঘাতের জায়গা হিসেবে দেখতে পারে। তবে এই চক্র ভাঙা সম্ভব।
নীরব সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার নাটকডন-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি নাটকের এই পরিবর্তনকে শুধু সাময়িক প্রবণতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। মূলধারার টেলিভিশন এখন এমন সব মানসিক ও সামাজিক ক্ষত নিয়ে কথা বলছে, যেগুলো পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করা হয়েছে।
পাকিস্তানে পেশাদার মানসিক চিকিৎসা বা থেরাপি অনেকের নাগালের বাইরে এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সংকোচও রয়েছে। সেই জায়গায় নাটক তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য একটি মাধ্যম। লাখো দর্শক নাটকের চরিত্র ও গল্পের মধ্যে নিজেদের জীবন, সম্পর্ক ও সমস্যার প্রতিচ্ছবি দেখতে পান।
আরও পড়ুন
একাত্তরে বাবা কেন শান্তি কমিটিতে ছিলেন, জানালেন আসিফ আকবর
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাটক নিয়ে দর্শকদের আলোচনা ও মন্তব্যও এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করছে। ফলে নাটক এখন শুধু ‘কোন নাটক দেখব’- এই প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ‘এই নাটক থেকে আমরা কী শিখছি’ সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি নাটক শুধু পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকছে না, ধীরে ধীরে পরিবর্তন তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে। একটি মেয়ে হয়তো মায়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নতুন করে ভাবছে, কোনো স্বামী হয়তো বুঝতে পারছেন স্ত্রীর ওপর কতটা চাপ রয়েছে, আবার কোনো অভিভাবক হয়তো নিজের আচরণ নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন।
এলআইএ