তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে বিপাকে পড়েছেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের রোগী ও চিকিৎসকরা। বিদ্যুৎ চলে গেলে হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে অস্ত্রোপচার কার্যক্রমে। জেনারেটর থাকলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় প্রয়োজনের সময় সেগুলো সচল রাখা যাচ্ছে না।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শেবাচিমে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫টি অস্ত্রোপচার হয়ে থাকে। তবে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বর্তমানে এ সংখ্যা কমে প্রায় ১০ থেকে ১২টিতে নেমেছে। ফলে অস্ত্রোপচারের জন্য অপেক্ষায় থাকা রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
জানা গেছে, হাসপাতালের কার্যক্রম সচল রাখতে চারটি জেনারেটর রয়েছে। সেই চারটি জেনারেটর দিয়ে হাসপাতালটির নতুন ও পুরোনো ভবনের প্রায় সব কার্যক্রম সচল রাখা হয়। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানান, আইসিইউ, সিসিইউ এবং অপারেশন থিয়েটারগুলো মূল ভবনে অবস্থিত। সেখানে তিন হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ রোগী মূল ভবনেই অবস্থান করেন। বিদ্যুৎ চলে গেলে এই বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন
শনিবার সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়েছে ঢাকায়
লোডশেডিংয়ের সময় লিফটও বন্ধ থাকে। এতে পাঁচতলা পর্যন্ত রোগী ওঠানো-নামানোসহ স্বজনদের চলাচলেও চরম ভোগান্তি তৈরি হয়। সিঁড়ি ব্যবহার করেই এসব কাজ করতে হয়।
অন্যদিকে জেনারেটর চালু করা গেলেও আইসিইউ, সিসিইউ ও অপারেশন থিয়েটারের আলো জ্বালানো সম্ভব হয়; কিন্তু শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালানো যায় না। ফলে গরমের মধ্যে চিকিৎসকদের অস্ত্রোপচার করতে হচ্ছে। একই সময়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডও অন্ধকারে পড়ে থাকে।
বিশেষ করে ইউরোলজি বিভাগের অস্ত্রোপচার সপ্তাহে মাত্র এক দিন করা হয়। ওই দিন বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অস্ত্রোপচার বাতিল হলে রোগীকে পরবর্তী সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এতে চিকিৎসা পেতে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হচ্ছে।
হাসপাতালে দুটি বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন থাকা সত্ত্বেও পুরোনো ভবনটিও সম্প্রতি ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের আওতায় পড়ছে। ফলে বিদ্যুৎনির্ভর চিকিৎসা কার্যক্রমের পাশাপাশি রোগীদের স্বাভাবিক চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
আরও পড়ুন
এক উপজেলার চাহিদার সমান বিদ্যুৎ গিলছে ১২ হাজার অটো
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা বরগুনার জয়নাল আবেদিন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে রোগীদের পাশাপাশি তাদের স্বজনদেরও নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। লিফট বন্ধ থাকায় অসুস্থ রোগীকে একতলা থেকে অন্য তলায় নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় রোগীর কিছু টেস্ট করানোর জন্য হাসপাতালের বাহিরে নিয়ে যেতে হয়। তখন ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। বিদ্যুৎ না থাকলে লিফট চলে না তখন পুরো সিঁড়ি বেয়ে রোগীকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যেতে হয়। আবার নিয়ে আসতে হয়।
পটুয়াখালীর গলাচিপা থেকে আসা আরেক রোগীর স্বজন হারুন অর রশিদ বলেন, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দক্ষিণাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল। বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা ছাড়াও ঢাকা বিভাগের মাদারীপুর ও শরীয়তপুরের মানুষও এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু এতো বড় হাসপাতালে বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও তা কাজে আসে না, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ও সংরক্ষণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, এই হাসপাতালের ওপর লাখ লাখ মানুষ নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে জেনারেটরসংক্রান্ত সমস্যা থাকলেও এখনো এর স্থায়ী সমাধান হয়নি।
হাসপাতাল ক্যাম্পাসের বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী এস এম মাহবুব হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, নতুন ভবনের জন্য ২৫০ কেভিএ ক্ষমতার একটি নতুন জেনারেটর রয়েছে। তবে তেলের অভাবে সেটি চালু করা যাচ্ছে না।
তিনি জানান, মূল ভবনে আরও তিনটি জেনারেটর রয়েছে। এগুলোর সক্ষমতা যথাক্রমে ২৫০, ১২৫ ও ৬০ কেভিএ। হাসপাতাল থেকে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হয়, তা দিয়ে একসঙ্গে সব জেনারেটর চালানো সম্ভব হয় না, সর্বোচ্চ এক থেকে দুটি জেনারেটর চালানো যায়।
আরও পড়ুন
লোডশেডিংয়ে মোমবাতির আলোয় চলে শ্রীমঙ্গল হাসপাতালের জরুরি সেবা
এ ব্যাপারে গণপূর্ত অধিদপ্তর বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সল আলম বলেন, জেনারেটরগুলো চালাতে প্রতি ঘণ্টায় আনুমানিক ১১০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। ফলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে জ্বালানির চাহিদাও দ্রুত বেড়ে যায়।
শেবাচিম হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নাজমুল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, নতুন ভবনে বিদ্যুতের আরও একটি সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেনারেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় তেল বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। দ্রুত জ্বালানি ও বিদ্যুৎসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হলে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।
এফএ/এএসএম