স্বপ্ন ছিল নারী থেকে পুরুষ হবেন। পরে প্রিয়জনকে বিয়ে করবেন। সেই স্বপ্ন পূরণের আশায় অস্ত্রোপচার করেন রোজি আক্তার লিজা (৩১) নামের ওই তরুণী। তবে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। অস্ত্রোপচারের কয়েক ঘণ্টা পরে তার মৃত্যু হয়েছে।
লিজা বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাসিন্দা। রোববার (৬ সেপ্টম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকার পান্থপথ গ্রীণ রোডের ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালে লিজার মৃত্যু হয়।
এর আগে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে তার অস্ত্রোপচার হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ নিয়ে এলাকায় এলে তোলপাড় শুরু হয়। পরবর্তীতে তড়িঘড়ি করে সন্ধ্যার মধ্যেই লিজাকে দাফন করা হয়।
আরও পড়ুন
রাজশাহীতে এইচআইভি আক্রান্তদের ৬৬ শতাংশই সমকামী
সরেজমিন এলাকাবাসী ও মৃতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, লিজা মেয়ে হলেও ছেলেদের মতো আচরণ করতেন। ছেলেদের মতো চুল কাটাতেন। তার বাড়িতে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা জেমিনি ওরফে জেনিফা আক্তার নামের এক তরুণীর আনাগোনা ছিল। তাকে স্ত্রী হিসেবে মনে করতেন লিজা। স্থানীয়দের ধারণা, লিজার সঙ্গে সমকামিতার সম্পর্ক ছিল জেনিফার।
সূত্রমতে, প্রায় তিন বছর আগে একই সম্পর্কে লিজা তার আপন ভাইয়ের স্ত্রীকে নিয়ে নিরুদ্দেশ হন। পরবর্তীতে তারা পুনরায় বাড়িতে ফিরে আসেন। এরপর জেনিফার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিজার পরিচয় হয়। এরপর থেকে জেনিফা প্রায়ই লিজাদের বাড়িতে এসে মাসের পর মাস একসঙ্গে বসবাস করতেন।
জেমিনি ওরফে জেনিফা আক্তারের ভাষ্যমতে, তারা একে অপরের বাসায় বেড়াতেন। একসঙ্গে থাকতেন। লিজা ঢাকায় হরমোনের চিকিৎসা করাতেন। লিজার মা, বাবা ও বোন অস্ত্রোপচারের জন্য দেড় লাখ টাকা দিয়েছেন। ওই টাকা দিয়ে ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার পান্থপথের ইউনিহেলথ স্পেশাইলজড হাসপাতালে সরফরাজ নাম দিয়ে লিজাকে ভর্তি করা হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের আগে সম্মতিপত্রে লিজার স্ত্রী হিসেবে তিনি (জেনিফা) সই করেন।
মেয়ে হয়ে আরেকজন মেয়ের স্ত্রী পরিচয়ে সম্মতিপত্রে সইয়ের বিষয়ে জেনিফা দাবি করেন, লিজার মা ও বাবার সম্মতি নিয়ে সই করা হয়েছে।
তবে মৃত রোজীর বাবা বলেন, ‘সে (জেনিফা) যে সই করবে, তার সইয়ে যে অপারেশন হবে; সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এমনকি লিজার নাম যে সরফরাজ রাখা হয়েছে তা আজই কেবল জেনেছি।’
আরও পড়ুন
ফরিদপুরে সমকামিতার অভিযোগে ছাত্রাবাস থেকে আটক ৩
তিনি আরও বলেন, ‘লিজা অপারেশন করে পুরুষ হয়ে জেনিফাকে বিয়ে করবে, এমনটা ওর (লিজা) মায়ের কাছে শুনেছি।’
এ বিষয়ে লিজার মা বলেন, ‘আমার মেয়ে লিজা ছোটবেলা থেকেই কোনো ছেলেকে পছন্দ করতো না। তাকে জোর করে দুইবার বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কোনোখানেই সে (লিজা) সংসার করেনি। ছেলেদের সঙ্গে সঙ্গ দেওয়া কিংবা ঘর সংসার করার কোনো মনমানসিকতাই তার ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে জেনিফা আমাদের বাড়িতে এসে লিজার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী হিসেবে বেড়াতো। যে কারণে লিজার অপারেশনের দায়িত্ব আমরা জেনিফার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম।’
এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইসলাম সমর্থন করে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইসলাম সমর্থন করে না জানি। তবে মোবাইলে এসব ঘটনা এখন শত শত দেখা যায়।’
অন্যদিকে ইউনিহেলথ স্পেশাইলজড হাসপাতাল থেকে দেওয়া মৃত্যু সনদে দেখা গেছে, ৩ সেপ্টেম্বর তাকে (লিজা) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সনদপত্রে লিজার নাম সরফরাজ এবং পুরুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে মৃত্যু সনদপত্রে দেওয়া হাসপাতালের নম্বরে যোগাযোগ করা হলে লিমন নামের এক ব্যক্তি নিজেকে অ্যাডমিন পরিচয় দেন। তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জিএমের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
আরও পড়ুন
পাবনায় সমকামী ১৬১৫ জন, পুরুষ যৌনকর্মী ৯০৮!
পরবর্তী সময়ে ইউনিহেলথ স্পেশাইলজড হাসপাতালের জিএম বিশ্বজিত বৈদ্যের কাছে সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কৌশলে দায় এড়িয়ে যে চিকিৎসকের অধীনে রোগী ভর্তি হয়েছেন, তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক মাহমুদুল হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ততার অজুহাতে পরে ফোন করবেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
শাওন খান/এসআর/এএসএম